আর সেই চুৰ্ণ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য থেকেই এই পরম শিক্ষাটি অর্জন করেছেন অনামিকা, মানুষ সম্পর্কে ভুল অঙ্ক কষতে বসেন না তিনি।
কী হলো অনামিকা দেবী? আপনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন যে? বললেন মানস হালদার। নতুন লেখকদের সম্পর্কে আপনার যেন বেশ মমতা রয়েছে মনে হচ্ছে। তা থাকতে পারে, তাদের মুখোমুখি তো হতে হয়নি কখনো?
অনামিকা দেবী বলেন, তাই হবে হয়তো। মুখোমুখি হতে হলে, বোধ হয় আপনাদের জন্যই মমতা হতো!
হ্যাঁ, তাই হতো।–, দৃঢ়স্বরে বললেন মানস হালদার। তারপর বললেন, তা ছাড়া আজকালকার কবিতার মাথামুণ্ডু কিছুই তো বুঝতে পারি না, ওর আর বিচার করবো কি? নির্বিচারে বাতিক করে দিই।
আপনার কাগজে কবিতা দেন না?
দেব না কেন? নিয়মমাফিক দুটো পৃষ্ঠা কবিতার জন্যে ছাড়া থাকে, যাঁদের নামটাম আছে তারা সাপ ব্যাঙ যা দেন চোখ বুজে ছেপে দিই।
অনামিকা ঈষৎ কৌতুকের গলায় বলেন, শুনে ভরসা পেলাম। ভবিষ্যতে যদি সাপ ব্যাঙ লিখতে শুরু করি, তার জন্যে একটা জায়গা থাকলো।
মানস হালদার নড়েচড়ে বসলেন, আপনার সম্পর্কে এটা বলা যায় না, আপনার লেখা কখনো হতাশ করে না।
কি জানি আপনাদের করে কি না-অনামিকা বলেন, তবে আমাকে করে-
আপনাকে করে? অর্থাৎ?
অর্থাৎ কোনো লেখাটাই লিখে শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতে পারি না। মনে হয় যা বলতে চেয়েছিলাম, তেমন করে বলতে পারিনি।
ওটাই তো আসল শিল্পীর ধর্ম-মানস হালদার বোধ করি মহিলাকে সান্ত্বনা দান করতেই সোৎসাহে বলেন, সত্যিকার শিল্পীরা কখনোই আত্মসন্তুষ্টির মোহে আপনি কবর খোড়েন না। আপনি যথার্থ শিল্পী বলেই–
আরো সব অনেক ভালো ভালো কথা বললেন মানস হালদার, যা নাকি অনামিকাকে প্রায় আকাশে তুলে দেওয়ার মত। অনামিকা অস্বস্তি অনুভব করেন, অথচ না না, কী যে বলেন গোছের কথাও মুখে যোগায় না, অতএব মানস হালদারের গন্তব্যস্থল এসে গেলে হাঁফ ফেলে বাঁচেন। বাকি পথটুকু একা হবেন, নিজেকে নিয়ে একটু একা থাকতে পাওয়া কী আরামের!
নমস্কার বিনিময়ের পর নেমে যান মানস হালদার।
অনামিকা পিঠ ঠেসিয়ে ভাল করে বসেন, আর আস্তে আস্তে নিজের মধ্যে হারিয়ে যান যেন।
কিন্তু শুধুই কি মায়ের প্রকৃতির দৃষ্টান্ত থেকেই অনামিকার প্রকৃতির গঠন? বকুলের কাছ থেকেও কি নয়? বকুলের মধ্যেও কি আবেগ ছিল না? ছিল না মোহ, বিশ্বাস, প্ৰত্যাশা? মার মত তীব্রভাবে না হোক, সুষমার মূর্তিতে?
বকুলের সে মোহ, সে বিশ্বাস, সে প্রত্যাশা টেকেনি।
বকুল অতএব অনামিকা হয়ে গিয়ে আবেগ জিনিসটাকে হাস্যকর ভাবতে শিখেছেন।
তবু সেই সুষমাটুকু?
সেটুকু কি একেবারে হারিয়ে গেছে?
বকুলের সেদিনের সেই মূর্তিটা দেখলে তো তা মনে হয় না। বকুল যেন সব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সেই সুষমাটুকুকে মনের মধ্যে আগলে রেখেছিল।
সেই সেদিন, যেদিন পারুল ও–বাড়ি গিয়ে বলেছিল, মা নেই, বাবারও খেয়াল নেই, তাই আমিই বলতে এলাম জেঠাইমা, বিয়েটার আর দেরি করবার দরকার কি?
নির্মলের জেঠাইমা আকাশ থেকে পড়ে বলেছিলেন, কার বিয়ের কথা বলছিস রে পারু?
পারুল জানতো এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হবে তাকে, তাই পারুল স্থির গলায় বলেছিল, আমি আর কার বিয়ের কথা বলতে আসবো জেঠাইমা, বকুলের কথাই বলছি!
জেঠাইমার পাশে নির্মলের মা বসেছিলেন, তার চোখমুখে একটা ব্যাকুল অসহায়তা ফুটে উঠেছিল, তিনি সেই অসহায়-অসহায় মুখটা নিয়ে প্রত্যাশার দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন বড় জায়ের দিকে। কিন্তু বড় জা তার দিকে তাকিয়ে দেখেননি। তিনি পারুলের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে উদাস গলায় বলেছিলেন, তা সে আর আমরা পাড়াপড়শীরা কী করবো বল মা? তোর বাবা তো আমাদের পোছেও না!
বাবা তো বরাবরই ওই রকম জেঠাইমা, দেখছেন তো এতকাল। কিন্তু তাই বলে তো চুপ করে বসে থাকলে চলবে না? মা নেই, বৌদিদের কথাও না বলাই ভালো, বকুলটাকে আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমি শান্ত হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যেতে পারি।
হ্যাঁ, এইভাবেই বলেছিল পারুল।
বোধ হয় নিজের বুদ্ধির আর বুদ্ধি-কৌশলের উপর বেশ আস্থা ছিল তার, ভেবেছিল একেবারে এইভাবেই বলবো, আবেদন-নিবেদনের বিলম্বিত পথে যাবো না। কিন্তু কতো ভুল আস্থাই ছিল তার!
জেঠাইমা এবার বোধ করি আকাশেরও ঊর্ধ্বতর কোনো লোক থেকে পড়লেন। সেই আছড়ে পড়ার গলায় বললেন, তোর কথা তো আমি কিছু বুঝতে পারছি না পারুল! আমাদের কাছে রেখে যাবি বকুলকে? তোর মানী বাবা সে প্রস্তাবে রাজী হবে? নচেৎ আমাদের আর কি, মা-মরা সোমত্ত মেয়েরা যেমন মাসী পিসির কাছে থাকে, থাকতো আমাদের কাছে।
পারুল তথাপি উত্তেজিত হয়নি, পারুল বরং আরো বেশী ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, এ ধরনের কথা কেন বলছেন জেঠাইমা? আপনি কি সত্যিই বুঝতে পারেননি, বকুলের বিয়ের কথা আপনার কাছে বলতে এসেছি কেন?
জেঠাইমা বিরস গলায় বলেছিলেন, এর আবার সত্যি-মিথ্যে কি তা তো বুঝছি না পারু! হেঁয়ালি বোঝবার চেষ্টার বয়েসও নেই। তোমাদের মা আমাকে বড় বোনের তুল্য মান্যভক্তি করতো, আমাদের কাছে একটা পরামর্শ চাইতে এসেছে এটাই বুঝছি। এ ছাড়া আর কি তা তো জানি না।
নির্মলের মা এই সময় একটুখানি চাপা ব্যাকুলতায় অস্ফটে বলে উঠেছিলেন, দিদি!
দিদি সেই অস্ফুটের প্রতি কান দেননি।
