ছেলেটা নিজেও যে অনেক ভালো ভালো কথা শিখেছে তার পরিচয় দিতে নিজেই ফুলঝুরির ঝুরি ছড়ায়, দেশ কোথায় যাচ্ছে বলুন! রুচি নেই, সভ্যতা নেই, সৌন্দর্যবোধ নেই, গভীরতা নেই, চিন্তাশীলতা নেই, কেবলমাত্ৰ কথার স্রোত ভাসছে। তাই স্যার আমাদের শশাঙ্কদা বলে দিতে বলেছেন, আপনাদের ভাষণগুলো একটু সংক্ষিপ্ত করবেন। ভারী মজার কথা বলেন উনি–, ছেলেটা একসার দাঁত বার করে নিঃশব্দে হেসে বলে, বললেন, ভাষণ সংক্ষিপ্ত না হলে শ্রোতারা সম্যকরূপে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আরো একটা কথা, আর্টিস্টদের গুমোর জানেন তো-একটু বসে থাকতে হলেই, অন্যত্র কাজ আছে বলে উঠে চলে যাবেন। একজন বিখ্যাত গায়িকা তো আবার গানের সময় সভায় কেউ একটি কথা বললেই উঠে চলে যান। শিল্পী তো! ভীষণ মুডি। বিগলিত হাস্যে ছেলেটি বলে, শেষ পর্যন্ত থাকবেন তো স্যার? শেষের দিকে ভালো আর্টিস্টদের রাখা হচ্ছে।
কিন্তু তোমাদের সভানেত্রী?
এসে গেছেন স্যার। মেয়েছেলে হলে কি হবে, খুব পাংচুয়াল। তা ওনাকে নিয়ে পড়েছে একদল কলেজের মেয়ে, অটোগ্রাফ খাতা এনেছে সঙ্গে করে। এই যে উইংস-এর ওদিকে। এসে বসে যাবেন, আপনি শুরু করে দিন না।
চক্ৰপাণি বিরক্তভাবে বলেছিলেন, তাই কি হয়? সভার একটা কানুন আছে তো?
আপনি তো বলছেন স্যার, এদিকে আমাদের যে মিনিটে মিনিটে মিটার উঠছে।
মিটার উঠছে!
অধ্যাপক–সাহিত্যিক সভয়ে এদিক–ওদিক তাকান।
মিটার উঠছে? কিসের মিটার?
আজ্ঞে এই হল-এর। ছেলেটি তার গুজগুঁজে কথার মধ্যেই একটু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বলে, অনেক ধরে–করে কনসেশনেই পাঁচশো টাকা! ধরুন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত দশটা। দশটা বেয়ঙ্ক গেলেই–ঘণ্টা পিছু একস্ট্রা একশো টাকা। তা হলেই বলুন মিটার ওঠাটা ভুল বলেছি কিনা! আপনাদের এই সাহিত্যের কচকচি না থামতেই যদি আর্টিস্টরা কেউ কেউ এসে পরেন, কী অবস্থা হবে?
ছেলেটা একদা চক্ৰপাণির ছাত্র ছিল, তাই এত অন্তরঙ্গতার সুর! কিন্তু ওই শিশুজনসদৃশ সরল অথচ গোঁফদাড়ি সম্বলিত দীর্ঘকায় প্রাক্তন ছাত্রটিকে দেখে চক্ৰপাণির স্নেহধারা উথলে উঠছে বলে মনে হল না। নীরস গলায় প্রশ্ন করেছিলেন, কেন, কী অবস্থা হবে?
কী হবে সে কি আর আমি আপনাকে বোঝাবো স্যার? সময় নষ্ট হতে দেখলে অডিয়েন্স ক্ষেপে যাবে। কী রকম দিনকাল পড়েছে দেখছেন তো? ওই তো সভানেত্রী এসে গেছেন। তবে আর কি!
তবে আর কি করা!
মাইকের প্রথম বলি চক্ৰপাণি চট্টোপাধ্যায় যুগসাহিত্যে সত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলেন।
বলছিলেন, কিন্তু বার বার সামনের ওই শূন্য আসনের সারির দিকে তাকাচ্ছিলেন।…আর ভাবছিলেন, এ যুগের স্পষ্ট চেহারা কি তবে এই শূন্যবক্ষ প্রেক্ষাগৃহের মতো?
তবে ভাবছিলেন বলে যে থেমে থেমে যাচ্ছিলেন তা নয়। একবারই শুধু থেমেছিলেন। তারপর আবার একটানা বলে চলেন–শিল্পী সাহিত্যিক কবি বুদ্ধিজীবী চিন্তাবিদ, এদের তাই আজ বিশেষ সঙ্কটের দিন। তাঁরাও আজ দ্বিধাগ্ৰন্ত। তারা কি চিরাচরিত সংস্কারের মধ্যেই নিমজ্জিত থেকে গতানুগতিক ভাবে সৃষ্টি করে যাবেন, যা নতুন নতুন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নতুন সত্য উদঘাটিত করবেন, এই প্রশ্ন আজ সকলের মধ্যে।
গুটিগুটি দুটি তরুণ এসে ঢুকে পিছনের সারিতে বসেছিল, চাপা গলায় হেসে উঠে একজন অপরজনকে বলে উঠলো, লে হালুয়া! ওই সত্যটা কি আজব চীজ বল দেখি? সত্য সত্য কবে এতো মাথা খুঁড়ে মরে কেন দাদুরা?
বাছাদের নিজেদের সব কিছুই ক্রমশঃ মিথ্যে হয়ে আসছে বলে বোধ হয়!
দূর বাবা, এতোক্ষণ পরে এসে ঢুকলাম, তাও বসে বসে বক্তিমে শুনতে হবে? কৰ্তারা মধু পরিবেশনের আগে খানিকটা করে নিমের পাঁচন গেলায় কেন বল দিকি?
ওই ফ্যাশান!
চক্ৰপাণি তখনও বলে চলেছেন, এই যুগকে তবে কোন নামে অভিহিত করবো? অনুসন্ধানী যুগ? যে যুগ তন্নভন্ন করে খুঁজছে, যাচাই করছে কোথায় সেই অভ্রান্ত সত্য, যা মানুষকে সমন্ত মিথ্যা বন্ধন থেকে মুক্ত করে-
আবার সেই সত্য! কালো রোগা ছেলেটা সাদা সাদা দাঁত বার করে হেসে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে ওঠে, সত্য মারা গেছে দাদু! তাকে খুঁজে বেড়ানো পণ্ডশ্রম!
চক্ৰপাণি ভালো বলছেন, তথাপি অপর বক্তারা ঘন ঘন হাত উল্টে উল্টে ঘড়ি দেখছিলেন। মানস হালদার বেজার মুখে পকেটে হাত দিয়ে টিপে টিপে নিজের লিখিত ভাষণটি অনুভব করছিলেন আর বিড়বিড় করছিলেন, নাঃ, লোকটা দেখছি, একাই আর সকলের বারোটা বাজিয়ে দিলো। উদ্যোক্তাদের উচিত প্রত্যেককে একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া। ওদেশে এরকম হয় না। সে একেবারে সামনে ঘড়ি রেখে কাজ! আমাদের দেশে? হুঁ!
তা উদ্যোক্তাদের আছে সে শুভবুদ্ধি, তাদের একজন আস্তে পিছন থেকে এসে সবিনয়ে জানালেন, একটু সংক্ষেপ করবেন স্যার!
সংক্ষেপ?
চক্ৰপাশি ক্ষুব্ধ বিস্ময়ে সামনের দিকে তাকালেন, সবে দুচারটি করে লোক এসে বসতে শুরু করেছে এবং সবে বক্তব্যের গোড়া বাঁধা হয়েছে, এখন কিনা সংক্ষেপের অনুরোধ?
তবে তিনি নাকি আদৌ রগচটা নন, বরং কৌতুকপ্ৰিয়, তাই কৌতুকের গলায় একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্য করে বক্তব্যের উপসংহার করে দিলেন। কিন্তু তাঁর সেই বুদ্ধিদীপ্ত তীক্ষ্ণ মন্তব্যটি মাঠেই মারা গেল।
বাইরে থেকে ঘরে তুমুল একটা হর্ষোচ্ছাসের ঢেউ খেলে গেল, এসে গেছেন! এসে গেছেন!
