কোথায় সেই পূর্ণতার সমারোহ?
আজকের সম্মেলনের প্রধান বক্তা সুবিখ্যাত অধ্যাপক চক্তপানি চট্টোপাধ্যায় তার বক্তৃতার মাঝখানে একবার দম নিয়ে হল-এর শেষপ্রান্ত অবধি তাকিয়ে দেখলেন। না, মানুষ নেই, শুধু চকচকে ঝকঝকে গদি আটা মূল্যবান আসনগুলি শূন্য হৃদয় নিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে।
কেবলমাত্র সামনের কয়েকখানি আসন, যাতে নাকি অতিথি ছাপমারা, তারা জনাকয়েক বিশিষ্ট অতিথিকে হৃদয়ে ধারণ করে বসে আছে। এদের হয়তো গাড়ি করে আনা হয়েছে, তাই এর সভার শোভা হয়ে বসতে বাধ্য হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য সাংবাদিক, বাকি সব বিশিষ্ট নাগরিক। এরা এরা সভায় উপস্থিত ছিলেন বলে কাগজে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়, এরা হচ্ছেন তারা।
চক্ৰপাণি এদের অনেককেই বেশ চেনেন, অনেকের মুখ চেনেন।
কিন্তু এঁদের কাউকেই তো নবযুগের বাহক বলে মনে হচ্ছে না, তবে যুগের বাণী কাদের শোনাবেন চক্ৰপাণি?
অথচ তার ভাষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যুগসাহিত্যে সত্য। অবশ্য সত্যি বলতে, ওই শিরোনামটার প্রকৃত অর্থ তাঁর কাছে তেমন প্রাঞ্জল মনে হয়নি, খুব ভালো বুঝতে পারেননি উদ্যোক্তারা আসলে ওই শব্দটা দিয়ে কী বোঝাতে চেয়েছেন, অথবা জনা তিন-চার মহা মহা সাহিত্যরথীদের ডেকে এনে তাদের কাছে কী শুনতে চেয়েছেন।
তবু অধ্যাপকদের ভাষণের জন্য আটকায় না, যে কোনো বিষয়বস্তু নিয়েই তারা ঘন্টার পর ঘণ্টা সারগর্ভ ভাষণ দিতে পারেন। চক্ৰপাণি আবার শুধু অধ্যাপক নন, অধ্যাপকসাহিত্যিক! প্রৌঢ়ত্বের কাছে ছুঁই ছুঁই বয়েস, ছাত্রমহলে বিশেষ প্রতিভাজন (যেটা নাকি এ যুগে দুর্লভ) এবং পাঠক-মহলে আজও অম্লানজ্যোতি নায়ক। অতি আধুনিকদের প্রবল কলকল্লোলেও চক্ৰপাণির জয়জয়কার অব্যাহতই আছে। অস্তুতঃ তাঁর রচিত গ্রন্থের বিক্রয়-সংখ্যা দেখে তাই মনে হয়।
কিন্তু বক্তৃতা-মঞ্চে দাঁড়ালে কেন সেই অগণিত ভক্ত-সংখ্যাকে দেখতে পাওয়া যায় না? কেন গোনাগুনতি কয়েকটা চেনা-মুখের পিছনে শুধু শূন্যতার অন্ধকার?
অথচ ওই চেয়ারগুলির ন্যায্য মালিক আছে।
এসেওছে তারা। শুধু ঝুটঝামেলা কতকগুলো বক্তৃতা শোনবার ভয়ে হল-এর বাইরে এদিক ওদিক ঘুরছে, ঝালমুড়ি অথবা আইসক্ৰীম খাচ্ছে, আড্ডা মারছে।
তাছাড়া আরো আকর্ষণ আছে, গায়ক-গায়িকার সঙ্গে কিছু নায়ক-নায়িকার নামও ঘোষণা করা হয়েছে, যাঁরা নাকি দুঃস্থদের কল্যাণে বিনা দক্ষিণায় কিছু শ্রমদান করতে স্বীকৃত হয়েছেন। তারা যে শুধু অভিনয়ই করেন না, কণ্ঠসঙ্গীতেও সক্ষম, সেটা স্পষ্ট তাদের সামনে বসে দেখা যাবে। এখন কথা এই–সেই নায়ক-নায়িকারা অবশ্যই আকাশপথে উড়ে এসে মঞ্চাবতরণ করবেন না। গাড়ি থেকে নেমে প্ৰকাশ্য রাজপথ দিয়েই আসতে হবে তাঁদের। সেই অনবদ্য দৃশ্যের দর্শক হবার সৌভাগ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাইবে, এমন মুর্খ কে আছে!
ওরা এসে প্রবেশ করলে উল্লাসধ্বনি দিয়ে তবে ভিতরে ঢোকা যাবে। টিকিটে সিট নম্বর আছে ভাবনা কি?
প্ৰথম বক্তা চক্ৰপাণি বুদ্ধিমান হলেও অবস্থাটা সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারেননি। বিরাট প্রেক্ষাগৃহের বিরাট শূন্যতার দিকে তাকিয়ে প্রতিষ্ঠানের সম্পাদককে ক্ষুব্ধ প্রশ্ন করেছিলেন, আরম্ভ তো করবো, কিন্তু শুনবে কে? ফাকা চেয়ারগুলো?
সম্পাদক সবিনয়ে বলেছিলেন, সবাই এসে যাবে স্যার।
কিন্তু ওই আশ্বাসবাণীর মধ্যে আশ্বাস খুঁজে পাননি চক্ৰপাণি। কাজেই আবারও বলেছিলেন, আর কিছুটা অপেক্ষা করলে হতো না?
শুনে সম্পাদক এবং স্থায়ী সহ-সভাপতি হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন, আর দেরি করলে চলবে না স্যার! আপনাদের এই চারজনের ভাষণ সাঙ্গ হতে-হতেই তো সভার বারোটা বেজে যাবে। মানে সকলেই তো স্যার-ধরলে কথা থামায় কে? আপনার বক্তৃতাই যা একটু শোনবার মতো। বাকি সবাই-
এ মন্তব্য অবশ্য খুবই নিম্নসুরে বলা হয়েছিল, উদ্যোক্তারা তো অভদ্র নয় যে চেঁচিয়ে কোনো মন্তব্য করে বসবেন।
চক্ৰপাণির সন্নিকটে বসেছিলেন সাহিত্যিক মানস হালদার। তিনি আবার বিশিষ্ট একটি সাপ্তাহিকের সম্পাদকও। বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস নেই বলে খানকয়েক ফুলস্ক্যাপ কাগজের দুপিঠে খুদে খুদে অক্ষরে তাঁর বক্তব্য লিখে এনেছেন। তিনি উসখুস করে বলেন, তা আপনাদের কার্ডে লেখা রয়েছে ছটা। এখন পৌনে সাতটা পর্যন্তও-
ব্যাপার কি জানেন স্যার-, সম্পাদক হাত কচলে বলেন, আর্টিস্টরা সব বড্ড দেরী করে আসেন কিনা। আর ওনাদের জন্যেই তো এত সেল। পয়সা খরচ করে সাহিত্য শুনতে কে অ্যাসে বলুন?
না, না, ছেলেটা সাহিত্য বা সাহিত্যিকবৃন্দকে অবমাননা করবে মনস্থ করে বলেনি কথাটা। নেহাতই সারল্যের বশে সহজ কথাটা বলে বসেছে।
মানস হালদার চাপা ক্রুদ্ধ গলায় বলেন, তা হলে এই সাহিত্য সম্মেলনের ফার্স কেন?
ছেলেটা এ প্রশ্নের উত্তরে সারল্যের পরাকাষ্ঠা দেখায়। অমায়িক গলায় বলে, তা যা বলেছেন। তবে কি জানেন, ফাংশানের খরচ তুলতে স্যুভেনির তো একটা বার করতেই হয়, আর তাতে নামকরা লেখকদের লেখা না থাকলে অ্যাডভার্টাইজমেণ্ট পাওয়া যায় না। কাজেকাজেই-মানে বুঝছেনই তো, আপনাদের লেখা নেবো। অথচ-ইয়ে একবার ডাকবো না এটা কেমন দেখায় না? তাই যাঁদের যাঁদের লেখা নেওয়া হয়েছে, বেছে বেছে শুধু তাদেরই ডাকা হয়েছে, দেখবেন লক্ষ্য করে। নচেৎ সাহিত্য নিয়েঃ বকবকানি শুনতে কার আর ভালো লাগে? কথা তো ঢের হয়েছে আমাদের দেশে, কাজের কাজ কিছু নেই, কেবল কথার ফুলঝুরি।
