কে এসে গেছেন?
যার জন্যে এই তুমুল হর্ষ?
আঃ, জিজ্ঞেস করবার কী আছে? ওঁকে না চেনে কে?
উনি এসে গেছেন। পিছনে পিছনে ওঁর তবলচি।
তারপর আরও এক নায়ক। তাঁর সঙ্গে এক নায়িকা।
বলা বাহুল্য, এরপর আর সাহিত্য-বক্তৃতা চলে না। মানস হালদার, সিতেশ বাগচী এবং সভানেত্রী অনামিকা দেবী নিতান্তই অবাঞ্ছিত অতিথির মতো তাঁদের ভাষণ সংক্ষেপে শেষ করে নিলেন, মঞ্চাধিপতি সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট তারস্বরে ঘোষণা করলেন, সাহিত্য-সভা শেষ হলো। এইবার আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরম্ভ হবে। আপনারা অনুগ্রহ করে স্থির হয়ে বসুন।
কিন্তু দোদুল্যমান পর্দার সামনে কে স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে? দোদুল্যমান চিত্তের মৃদু গুঞ্জন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গদি একখানা পেলে আর কোনো মিঞাই ছাড়তে চান না। শেষক্ষণ পর্যন্ত গদি আঁকড়ে বসে থাকবো এই পণ। এই ভাষণ শুনতে এলেই আমার ওই গদি আঁকড়ানোদের কথা মনে পড়ে যায়।
আহা বুঝছিস না, কে কতো পণ্ডিত, কার কতো চিন্তাশক্তি, বোঝাতে চেষ্টা করবে না?
সবাইকে ওনাদের ছাত্র ভাবে, তাই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আর আশ মেটে না। কোন নতুন কথাটা বলবি বাবা তোরা! সেই তো কেবল লম্বা লম্বা কোটেশন! অমুক এই বলেছেন, তমুক এই বলেছেন! আরে বাবা, সে-সব বলাবলি তো ছাপার অক্ষরে লেখাই আছে, সবাই পড়েছে, তুই কী বলছিস তাই বল?
পর্দার ওপারে তখন জুতো খুঁজতে খুঁজতে অধ্যাপক-সাহিত্যিক ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বলেছিলেন, এতোক্ষণ অসংস্কৃতির আসর চলছিল সেটা শেষ হলো, এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরম্ভ। সংস্কৃতির বেশ একখানা প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা বেরিয়েছে দেশে! সংস্কৃতি মানে নাচ গান! কী বলুন অনামিকা দেবী?
অনামিকা দেবীর চটি যথাস্থানেই পড়ে আছে, তিনি অতএব আত্মস্থ গলায় বলেন, তাই তো দেখি আর আশ্চৰ্য হই, কে যে এই নতুন ব্যাখ্যার ব্যাখ্যাকার।
কে আর! এই ফাংশানবাজরা!
মানস হালদারের জুতোটা মঞ্চে ওঠার বাঁশের সিঁড়িয়ে নীচে ঢুকে পড়েছিল, তিনি সেটা টেনে যার করতে করতে কঠিন-পেশী-পেশী-মুখে বলেন, এই ফাংশানবাজরাই দেশের মাথা খেলো! কী পাচ্ছি আমরা ছেলেদের কাছে? আমাদের পরবর্তীদের কাছে? হয় পলিটিক্স, নয় ফাংশান! কোনো উচ্চ চিন্তা নেই, উচ্চ আদর্শ নেই, সুস্থ একটা কর্মপ্রচেষ্টা নেই, শুধু রাস্তায় রাস্তায় রকবাজি! নাঃ, এ ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছি না আমরা ছেলেদের কাছে।
অনামিকা দেবী এই সব প্ৰবলদের সঙ্গে তর্ক করতে ভয় পান। জানেন এদের প্রধান অস্ত্ৰই হবে প্ৰাবল্য। অনামিকা দেবীর সেখানে তাই হার। ওঁর প্রশ্নে শুধু মৃদু হাসেন।
উত্তরটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।
আমরা ওদের কাছে কিছুই পাচ্ছি না। ঠিক। কিন্তু ওরাই বা আমাদের কাছে কী পাচ্ছে?
আদর্শ? আশ্রয়? সভ্যতা? সত্য?
ওরা নেমে এসে সামনের সারিতে নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। অস্তুতঃ দুএকটি গান শুনে না গেলে ভালো দেখায় না।
যদিও ভালো গানের আশা দুরাশা।
প্ৰথমে শুধু দায়েপড়ে নেওয়া গায়কদের গান। হয় এরা বেশী টাকা দিয়েছে, অথবা এরা উদ্যোক্তাদেরই কেউ। সারমেয়র সামনে মাংসখণ্ড ঝুলিয়ে রেখে তাকে ছুটিয়ে নেওয়ার মতো, ভালো আর্টিস্টদের শেষের জন্যে ঝুলিয়ে রেখে এইগুলি পরিবেশিত হবে একটির পর একটি।
দশটা বেজে যাবে?
যাক না।
বারোটা বাজিলেই বা কী! ঘণ্টা পিছু একশো টাকা বৈ তো নয়! পুষিয়ে যাবে।
প্রধান অতিথি সভানেত্রীকে উদ্দেশ করে চাপা গলায় ক্ষুব্ধ মন্তব্য করেন, এতে মিটার ওঠে না, দেখছেন?
হাসলেন অনামিকা দেবী, দেখছি তো অনেক কিছুই।
সত্যি দেখছেন তো অনেক কিছুই!
তার ভূমিকাটাই তো দর্শকের।
.
অনুষ্ঠান-উদ্যোক্তারা তাঁদের সাহিত্যসভার সভানেত্রী ও উদ্বোধককে সসম্মানে ট্যাক্সিতে তুলে দিলেন। তুলে দিলেন তাদের মালা আর ফুলের তোড়া। তারপরে প্রায় করজোড়ে বললেন, অনেক কষ্ট হলো আপনাদের।
কথাটা বলতে হয় বলেই বললেন অবশ্য, নইলে মনে মনে জানেন কষ্ট আবার কি? গাড়ি করে নিয়ে এসেছি, গাড়ি চড়িয়ে ফেরত পাঠাচ্ছি, বাড়তির মধ্যে মঞ্চ দিয়েছি মাইক দিয়েছি, একরাশ শ্রোতার সামনে বসে ধানাই-পানাই করবার সুযোগ দিয়েছি, আরামসেই কাটিয়ে দিলে তোমরা এই ঘণ্টা দুই-তিন সময়। কষ্ট যা তা আমাদেরই। কন্যাদায়ের অধিক দায় মাথায় নিয়ে আমরা তোমাদের বাড়িতে বার বার ছুটেছি, মাথায় করে নিয়ে এসেছি, ঘাড়ে করে নিয়ে যাচিছ।
তবু সৌজন্যের একটা প্ৰথা আছে, তাই ওঁরা হাত কচলে বললেন, আপনাদের খুব কষ্ট হলো।
তা এরাও সৌজন্যের রীতি পদ্ধতিতে অজ্ঞ নয়। তাই বললেন, সে কি সে কি, কষ্ট বলছেন কেন? বড় আনন্দ পেলাম।
আমাদের অনেক ভুল-ত্রুটি রয়ে গেছে, ক্ষমা করবেন।
আ ছি ছি, এ কী কথা। না না, এসব বলে লজ্জা দেবেন না।
আচ্ছা নমস্কার-যাবো আপনার কাছে। এটা মানস হালদারের উদ্দেশ্যে, কারণ তিনি একটা কাগজের সম্পাদক।
আচ্ছা নমস্কার—
গাড়িটা কারো ঘরের গাড়ি হলে হয়তো এই সৌজন্য-বিনিময়ের পালা আরও কিছুক্ষণ চলতো, ট্যাক্সি-ড্রাইভারের অসহিষ্ণুতায় তাড়াতাড়ি মিটলো। গাড়ি ছেড়ে দিলো।
পিঠে ঠেস দিয়ে গুছিয়ে বসলেন সভানেত্রী অনামিকা দেবী, আর উদ্বোধক মানস হালদার।
প্রধান অতিথি চক্ৰপাণি চট্টোপাধ্যায়?
না, তিনি এসব সৌজন্য বিনিময়ের ধার ধারেননি, নিজের গাড়িতে বাড়ি চলে গেছেন একটা মাত্র গান শুনেই। এঁরা দুজন গাড়িহীন, এবং একই অঞ্চলের অধিবাসী, কাজেই একই গতি।
