বাবা? বাবা আবার নতুন কি বলবেন? বাবা মাত্রেই যা বলে থাকে তাই বললেন–বললেন, পাত্র হিসেবে তুমি কী, তোমার চালচুলো কিছু আছে কিনা সে-সব না জানিয়েই হঠাৎ আমার মেয়েকে বিয়ে করবার ইচ্ছে প্ৰকাশ করলেই আমি আহ্লাদে অধীর হয়ে কন্যা সম্প্রদান করতে বসবো, এই কি ধারণা তোমার? তাতে ও–
তাতে ও কী? ভাবী শ্বশুরকে পিটিয়ে দিয়ে গেল?
শম্পা হেসে উঠে বলে, অতটা অবিশ্যি নয়, তবে শাসিয়ে গেছে। বলেছে–দেখি কেমন না দেন!
চমৎকার! কোথা থেকে এসব মাল জোটাস তাই ভেবে অবাক হই!
ব্যাপারটা কী হচ্ছে জান পিসি-—, শম্পা পা দোলাতে দোলাতে বলে অবস্থাটা মরীয়া। আমি আবার কিছুদিন থেকে ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে আর একটা ছেলের সঙ্গে চালাচ্ছি কিনা। অবিশ্যি সেটা একেবারেই ফলস। স্রেফ ওর জেলাসি বাড়াবার জন্য—
ওকে কথা শেষ করতে দিলেন না অনামিকা দেবী, হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলেন, আচ্ছা! তোমার ফাজলামি পরে শুনবো, এখন আমায় এটা শেষ করতে দাও।
শম্পা ঝপ করে উঠে দাঁড়ায়, ক্ষুব্ধ অভিমানের গলায় বলে, আমি চলেই যাচ্ছিলাম, তুমিই ডেকে বসালে!
তরতর করে নেমে যায় সিঁড়ি দিয়ে।
অনামিকা দেবীও সেই দিকে তাকিয়ে থাকেন। বন্ধ কলমটাই হাতে ধরা থাকে, সর্বশক্তি প্রয়োগের ইচ্ছেটাকে যেন খুঁজে পান না।
খুব আস্তে, খুব গভীরে ভাবতে চেষ্টা করেন, এ যুগের কোন কর্নারে আমি আমার ক্যামেরাটা বসাবো? কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি নেবো?…এই বাড়িরই কোনোখানে কোনোখানে যেন এখনো ভাশুর দেখে ঘোমটা দেওয়া হয়, ভাঁড়ারের কোণে ইত্য ঘটপাতা হয়, হয়তো বা বিশেষ বিশেষ দিনে লক্ষ্মীর পাঁচালিও পড়া হয়। অথচ এই বাড়িতেই শম্পা–
এর কোনটা সত্য?
১০. সে যুগের কোনো স্পষ্ট অবয়ব
না, এ যুগে সে যুগের কোনো স্পষ্ট অবয়ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সে দুরন্ত সংহারের মূর্তি নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে রেণু রেণু করে উড়িয়ে দিচ্ছে বহুযুগসঞ্চিত সংস্কারগুলি, উড়িয়ে দিচ্ছে চিরন্তন মূল্যবোধগুলি, অভ্যস্ত ধ্যান-ধারণার অবলম্বনগুলি, আবার কোথাও সে আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ীর মত আজও তার বহু সংস্কারে বোঝাই ঝুলিটি কাঁধে নিয়ে শিকড় গেড়ে বসে পাপপুণ্য, ভালোমন্দ,–ইহলোক-পরলোকের চিরাচরিত খাজনা যুগিয়ে চলেছে।
তাই এ যুগের মানসলোকে সত্যের চেহারাও অস্থির অস্পষ্ট। দোদুল্যমান দৰ্পণে প্রতিফলিত প্রতিবিম্বের মত সে চেহারা কখনো কম্পিত, কখনো বিকৃত, কখনো দ্বিধাগ্ৰন্ত, কখনো যেন অসহায়। যেন ঝড়ে বাসাভাঙা পাখি ডানা ঝাপটে ঝাপটে পাক খেয়ে মরছে, এখনো ঠিক করে উঠতে পারছে না, ঝড় থামলে পুরনো বাসাটাই জোড়াতালি দিয়ে আবার গুছিয়ে বসবে, নাকি নতুন গাছে গিয়ে নতুন বাসা বাঁধবে!
কিন্তু বড় কি থামবে?
ভাঙনের ঝড় কি ভেঙেচুরে তছনছ না করা পর্যন্ত থামে? সে কি ওই আদ্যিকালের বুড়ীটাকে শিকড় উপড়ে তুলে ফেলে না দিয়ে ছাড়ে?
অথবা হয়তো থামে।
হয়তো ছাড়ে।
কোথায় যেন একটা রফা হয়ে যায়। তখন বুড়ীটাকে দেখতে পাওয়া না গেলেও শিকড়টা থাকে যায় মাটির নীচে। নিঃশব্দে সে আপন কাজ করে যায়। তাই এই বিশ্বনস্যাতের যুগেও মহাত্মা আর মহারাজের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, বেড়ে চলেছে ভাগ্যগণনা কাৰ্যালয় আর গৃহশান্তির রত্ন-কবচ।
তাই যখন সাম্য মৈত্রী আর স্বাধীনতার জয়ডঙ্কায় আকাশবাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে, এখনও শুধু মাত্র চামড়ার রঙের তারতম্যের ছুতোয় মানুষ মানুষের চামড়া ছড়িয়ে নিচ্ছে! এবং যখন মানুষের একটা দল চাঁদে পৌঁছবার সাধনায় আকাশ পরিক্রম করছে, তখন আর একটা দল সভ্যতার সব পথ-পরিক্রমা শেষ করে ফেলেছি বলে আবার গুহার দিকে মুখ ফিরিয়ে চলতে যাচ্ছে।
একটানা এতোখানিকটা বলে বক্তা একবার থামলেন। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। বহু আসন-বিশিষ্ট বিরাট সুরম্য হল। সভার উদ্যোক্তা মোটা টাকা দক্ষিণা এবং অক্লান্ত ধর্নার বিনিময়ে একটি সন্ধ্যার জন্য সংগ্রহ করেছেন এই হল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্য সম্মেলনের জন্য। ওই ভাবেই বেশ কয়েকদিন থেকে প্রচার কার্য চলেছে। অভিনব সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্য সম্মেলন। আসুন অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করুন। পঁচিশ টাকা, দশ টাকা ও পাঁচ টাকা। দুই টাকার টিকিট কেবলমাত্র অনুষ্ঠান-দিবসে হল-এ বিক্রয়!…আর একটি ঘোষণা, এই অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্রের বিক্রয়লব্ধ অর্থের এক-তৃতীয়াংশ দুঃস্থত্রাণ সমিতির হস্তে অৰ্পণ করা হইবে।
মানুষ যে যথেষ্ট পরিমাণে হৃদয়বান তা এই প্রবেশপত্ৰ সংগ্রহের উদগ্র আগ্রহের মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেছে। তিনদিন আগেই উচ্চ মূল্যের টিকিট নিঃশেষিত, হল-এ বিক্রয়ের বিকল্পনার নির্বুদ্ধিতায় বিপর্যন্ত উদ্যোক্তারা পুলিসের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছেন।
দুঃস্থদের জন্যে প্ৰাণ না কাঁদলে কি এতোটা হতো? নিন্দুকেরা হযতো অন্য কথা বলবে, কিন্তু নিন্দুকে কি না বলে? অন্য কথা বলাই তো তাদের পেশা। যাই হোক-দুঃস্থদের জন্যেই হোক, অথবা দুর্লভদের জন্যই হোক, সব টিকিট বিক্ৰী হয়ে গেছে।
আর সে সংবাদ ঢাক পিটিয়ে প্রচার করাও হয়েছে।
অতএব আশা করা অসঙ্গত নয় সামনের ওই সারিবদ্ধ আসনের সারির জমজমাট ভরাট ভরাট রূপ দেখতে পাওয়া যাবে।
কিন্তু কোথায় সেই ভরাট রূপ?
