তা বলে ভাবিস না জিনিসটা তোরই রয়ে গেল।
না, সে আশা করিস না শোভন।
ওর জগতে আর মাও নেই, বাপও নেই। একটা নির্দোষ নিশ্চিন্ত শিশুকে শুধু তোদের মতির খেয়ালে একসঙ্গে পিতৃমাতৃহীন করে ছেড়েছিস।
ওই কচি বাচ্চাটাকে এখন সেই ভয়ঙ্কর শূন্যতার আর ভয়ঙ্কর ভারী একটা পাথরের ভার নিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে রাখতে চলতে হবে।
ভগবানের হাতের মার তবু সহ্য হয়, মানুষের মারটা অসহ্য। কিংবা হয়তো সবটাই ভগবানের হাত থেকে আসে মানুষ নিমিত্তটার ভাগী হয় মাত্র!
যাক গে বাহুল্য কথা, ছেলেটাকে তুই দেখেশুনে একটা বোর্ডিঙেই ভর্তি করে দে, জবরদস্তি করে তোর ইচ্ছেটা ওর ওপর চাপাতে চেষ্টা করিস না, শেষরক্ষা হবে না।
এখন কি মনে হচ্ছে জানিস, তোর সেই পরলোকগত পিতৃদেব অমলবাবুর সঙ্গে তোর আসলে কোনোই তফাৎ নেই।
তিনিও লোক হিসেবে কিছু খারাপ ছিলেন না, ভদ্র মার্জিত সৎ। শুধু ভদ্রলোক তার স্ত্রী পুত্রকে নিজের তৈরী নক্সার ছাঁচে ঢালাই করতে চেয়েছিলেন, তারা যে আসলে মালমশলা নয়, রক্তে-মাংসের মানুষ–এটা খেয়াল করেননি…তুইও করলি না, করছিস না।
এখন আর তোর মনে আছে কিনা জানি না, কিন্তু আমার ওই স্মৃতিশক্তি জিনিসটা একটু বেয়াড়া রকমের বেশী, তাই সব মনে থাকে, মনে পড়ে!
তাই মনে পড়ছে, রেখা যখন তোর কাছে এলো, তখন রেখা গঙ্গামাটি দিয়ে শিব গড়ে পুজো করতো। ওর বাপের বাড়িতে ওসবের চল ছিল। ওর ওই শিবপুজো নিয়ে তুই এমন হাসি-ঠাট্টা শুরু করলি যে, ও বেচারী লজ্জাটজ্জা পেয়ে বন্ধ করে দিলো।–তারপর ঘর করতে এসে শোবার ঘরের আলমারির মাথায় লক্ষ্মীর পট আর ঘট বসিয়ে দু’বেলা শুধু একটু ধূপ জ্বালতো, সেও তোর হাসি-ঠাট্টার ঘায়ে একদিন উড়ে গেল।
সত্যি কথা বলতে বাধা নেই, আমিও এসব দেখে হেসেছি, কিন্তু সেটা মনে মনে। তুই মুখের ওপর হাসলি।–তার পর কলসীর মধ্যে থেকে দৈত্য বেরুলো।
তোর যত পদোন্নতি হতে থাকলো, ও তত মর্ডান হতে থাকলো। ক্রমশ গুরুমারা বিদ্যেয় পি এইচ ডি হয়ে গেল তোর বৌ। তুই ওর নাগাল পেলি না আর।
ওর এখনকার যা রূপ, সে তোরই সৃষ্টি। এখন তুই হঠাৎ ভারতীয় ভাবধারায় ভিজতে বসলি, সনাতনী হলি, আর সমুদ্রে-গিয়ে-পড়া নদীকে ফের পাহাড়ের গুহায় এনে ফেলবার বায়না ধরলি! যা হয় না তা হওয়াবার চেষ্টা করলে এমনই হয় শোভন! কাঁচা মাটিকে ছাঁচে ফেলে পুড়িয়ে শক্ত করার পর আর কি তাকে নতুন ছাঁচে ঢালা যায়? যায় না, শুধু তুই যা করেছিস তাই করা যায়, ভাঙা যায়। কেউ ভেতরে ভাঙে, কেউ বাইরে ভাঙে।
আশীর্বাদ নিস।
–মা
শোভন তার সুন্দর কোয়ার্টার্সের বিরাট লনে বসেছিল–বাগানে পেতে বসার উপযুক্ত সুন্দর শৌখিন আসনে।
শোভনের পরনে দামী টেরিলিন ট্রাউজার হালকা ফাইন লাইনের বুশশার্ট, পায়ের চটিটাতে পর্যন্ত আভিজাত্যের ছাপ। শোভনের ওই কোয়ার্টার্সের মধ্যে ঢুকে গেলেও দেখা যাবে আগাগোড়াই সুন্দর শৌখিন আর সুরুচিমণ্ডিত। ঐশ্বর্যের সঙ্গে রুচির পরিচয়ও বহন করছে শোভানের সংসার।
শোভনের সংসার?
সেটা কী?
সে কি ওই বাড়িটা? ওই খাট আলমারি, সোফা ডিভান, ফ্রীজ, কুকিং-রেঞ্জ, ডিনার-সেট, ডাইনিং টেবল?…সংসার মানে বুককেসের ওপর সাজানো পিতলের বুদ্ধমূর্তি (নিত্য যাকে ব্রাসো ঘষে চকচকে রাখা হয়), দেয়ালে টাঙানো নেপালী ঢাল, বারান্দায় ঝোলানো অর্কিড, জানলায় বসানো ক্যাকটাসের বৈচিত্র্য?
তাহলে অবিশ্যি বলতেই হয়, শোভনের সংসার যথাযথই বজায় আছে। কারণ শোভনের সংসারে একাধিক সুদক্ষ ভৃত্য আছে, যাদের দক্ষতার শিক্ষা দিয়ে গেছে একদার সুদক্ষ গৃহিণী।
শোভন যদি এখন পূর্ব অভ্যাসে একটা পার্টি দেয়, তাহলে সুব্যবস্থায় এতটুকু চিড় খাবে না। তৎসত্ত্বেও যদি অতিথিরা মনে মনে ভাবে, শ্মশানের ভূমিতে নেমন্তন্ন খেতে এলাম কেন আমরা–তাহলে বলার কিছু নেই।
বসে থাকতে থাকতে একসময় বয় এস প্রশ্ন করল, সাহেবের চা-টা এখানেই আনা হবে কিনা।
কর্মস্থল থেকে ফিরে শোভন যে বেশ পরিবর্তন করেনি, এসেই লেটারবক্সের চাবি খুলেছে, সেটা সে দেখেছে।
ওদের মহলে ‘সাহেব’ এবং মেমসাহেবকে নিয়ে যে-সব আলোচনা হয়, ভাগ্যিস সাহেবের কর্ণগোচর হয় না।
শোভন বলল, না, ভিতরে যাচ্ছি।
তারপর একসময় ভিতরে এলো।
শোভনের কাছে একটা ফুলের মত মেয়ে আর দেবদূতের মত ছেলে ছুটে এলো না, বাপী আজ তোমার এত দেরি হলো কেন? বলে অনুযোগ করলো না, শুধু যেন সমস্ত পরিবেশটাই মৌন গভীর একটা অভিযোগের মূর্তিতে তাকিয়ে বসে আছে।
আজ বাতাসও কি অসহযোগিতা করছে? পর্দাগুলো উড়ছে না কেন? টেবল-ঢাকার কোণগুলো? ওগুলো এলোমেলো উড়লেও যেন মনে হয় কোথাও কোনোখানে প্রাণের স্পন্দন আছে।
দু-তিনটে ঘর চাবিবন্ধ আছে, মগনলাল খোলে, আবার ঝাড়মোছা করে বন্ধ করে রেখে দেয়। আচ্ছা, বাড়িটা কি হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেল! রেখা যে কেবলই বলতো, আর একখানা ঘর বেশী থাকলে বাড়িটা সত্যিই আইডিয়াল হতো!
তার মানে জায়গায় কিছু ঘাটতি পড়ছিল। শোভন সেটা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব না করলেও এমনি অনুভব করতো, সত্যি–সবটাই ভরা-ভর্তি।
দু-একটা মাত্র মানুষের উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে এত বিরাট পার্থক্য ঘটে!
শোভন তো যে-সে কেরানীবাবু নয় যে, মন লাগছে না বলে কিছু না খেয়ে শুয়ে পড়ে থাকবে? শোভনকে ভৃত্যবর্গের কাছে সাহেবের সম্মানটা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
