রাজা হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে বলে, তোমরা সবাই মিলে আমায় এত জ্বালাতন করছো কেন? শুধু বোকার মত কথা!
না, কেঁদে ফেলে না, শুধু মুখটা আগুনের মত হয়ে ওঠে।
পারুল কি এই ছোট্ট ছেলেটাকে ভয় করবে?
হয়তো ভিতরে ভিতরে ভয়ই আসে পারুলের। তবু সাবধানে হালকা গলায় বলে, বুড়োদের দশাই ওই, বুঝলি? সবাইকে জ্বালাতন করে মারে, আর বোকার মত কথা বলে। তা যাকগে, সত্যিই বলছি শোন, আমি ঠিক করেছি তোর বাবাকে না বলে-টলে চুপিচুপি তোকে নিয়ে–
ব্যাপারটা যেন খুব কৌতুকের এইভাবে বলে পারুল, তোকে নিয়ে সোজা তোর মায়ের কাছে। ব্যাস, বাবা যখন এসে বলবে, কই মা, রাজা কই? আমি তখন বেশ বোকাটি সেজে বলব, কি জানি বাপু, সে যে সুটকেস-ফুটকেস নিয়ে কোথায় কেটে পড়লো একদিন।
রাজা এই ছেলে-ভুলনো কথায় দারুণ চটে যায়, অসহিষ্ণু গলায় বলে ওঠে, বেশ তোমায় লিখতে হবে না, আমিই বাবাকে লিখে দিচ্ছি, বোর্ডিঙে ভর্তি করে দিয়ে যেতে।
পারুল গম্ভীর হয়।
শান্ত গলায় বলে, দেখ রাজা, তোর বাবার খামখেয়ালীর জন্যে সবাই মিলে কষ্ট পাবি কেন? মার জন্যে তোর কত মন কেমন করছে–
কথার মাঝখানে রাজা বলে ওঠে, ছাই করছে!
করছে রে করছে। আচ্ছা বেশ, না হয় নয়, কিন্তু বোনটির? বোনটি তো তোকে দেখতে পেয়ে–
তোমরা আমায় একটু শান্তি দেবে? বলে ঘর ছেড়ে চলে যায় রাজা।
পারুল চুপ করে বসে থাকে সেই দিকে তাকিয়ে। আর ডাকাডাকি করে না ওকে। সাহস হয় না।
একটু পরে নিজেই ফিরে আসে ছেলেটা, একটুকরো কাগজে কলাইন লিখে পারুলের সামনে ফেলে দিয়ে বলে, এই নাও। তোমার চিঠির সঙ্গে পাঠিয়ে দিও।
পারুল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেই লাইন-দুটোর ওপর।
আমায় বোর্ডিঙে ভর্তি করে দেবে। তোমার যা খরচ হবে, আমি বড় হয়ে শোধ করে দেব।
সেই রাত্রে পারুল তার সেই ছিরিছাঁদহীন খাতাটায় লিখে রাখে, একটা খামখেয়ালী পুরুষ পরিণাম-চিন্তাহীন একটা খেয়ালের বশে একটা মেয়ের স্বামী সংসার সন্তান সব কেড়ে নিয়েছে, ভেবেছিলাম অন্ততঃ সন্তানটাকে ফেরত দেবে তাকে, দেখছি আর উপায় নেই। আর ফেরত দেওয়া যাবে না।
হ্যাঁ, পুরুষটাকেই দোষ দিলো পারুল, নিজের ছেলে হলেও। হয়তো পুরুষকেই বিচক্ষণ হতে হবে এই সহজাত ধারণায়।
৩১. মায়ের চিঠি
মায়ের চিঠি চিরদিনই গভীর ভালবাসার বস্তু। যেদিন আসতো, সেদিন যেন শোভনের চোখেমুখে আহ্লাদের আলো জ্বলতো, আর ছোট্ট একটু চিঠি পড়তেই কতখানি যে সময় লাগতো!
পারুল হয়তো জানতো না এমন ঘটনা ঘটে। রেখা এই নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়তো না, বলত, পড়ে পড়ে তো মুখস্থ হয়ে গেল, আর কতবার পড়বে?
শোভন অপ্রতিভভাবে বলতো, না, একটা জায়গা ঠিক পড়া যাচ্ছে না, অক্ষরটা কেমন জড়িয়ে গেছে।
রেখা চোস্ত গলায় বলতো, অক্ষর জড়িয়ে যাবার কোনো প্রশ্নই নেই। তোমার মার হাতের লেখা তো ছাপার অক্ষরের মত।
শোভন যে কেন অপ্রতিভ হতো তা শোভনই জানে। শোভন তো অনায়াসেই বলতে পারতো, তোমার মার চিঠিও তুমি কম বার পড়ো না।
কিন্তু ওই সহজ কাজটা পেরে উঠতো না শোভন, তাড়াতাড়ি চিঠিটা তুলে মেখে দিত।
অথচ পেরে উঠলে হয়তো জীবন এমন জটিলতার পথে গিয়ে পৌঁছত না। যতই তুমি ভদ্র হও, মার্জিত হও, মাঝে-মধ্যে প্রতিবাদে মুখর হবারও দরকার আছে।
অপ্রতিবাদ অন্যায় দুঃসাহসের জন্মদাতা।
এখন রেখা এখানে নেই, মায়ের চিঠি একশোবার পড়লেও কেউ ব্যঙ্গ হাসি হেসে উঠবে না, তবু একবার মাত্র পড়েই চিঠিখানা টেবিলে ফেলে রেখে পাথরের মত বসে আছে কেন শোভন?
মা তো তীব্র কোনো তিরস্কার করেনি চিঠির মাধ্যমে, কোনো ধিক্কার বাকাও পাঠায়নি! তবু ওই চিঠিটা জ্বলন্ত আগুনের মত লাগছে কেন তার? শুধু ওই চিঠিটার জন্যে? নাকি তার সঙ্গের ওই একটুকরো কাগজের এক লাইন লেখাটুকুই অগ্নিবাহী?
রাজাকে ভাবতে চেষ্টা করছে শোভন, ওই লেখাটার সঙ্গে মেলাতে পারছে না কিছুতেই। শোভন এখন রাজার জন্যে যা করবে, রাজা বড় হয়ে তার পাই-পয়সাটি পর্যন্ত শোধ করে দেবে, এখন থেকে বাপকে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখলো রাজা!
অনেকবার ভাবতে চেষ্টা করলো, এটা কোনো ব্যাপারই নয়, একেবারেই ছেলেমানুষের ছেলেমানুষী। ওখানে যে থাকতে ভাল লাগছে না, এটা হয়তো ঠিক, অথচ এখানে আসার উপায়ও দেখতে পাচ্ছে না, তাই বোর্ডিঙের কথা মাথায় এসেছে।
আর ওই প্রতিশ্রুতিটা স্রেফ প্রস্তাবটাকে জোরালো করবার জন্যে। পাছে বাবা বলে বসে ও বাবা, বোর্ডিং? সে তো দেদার খরচের ব্যাপার! যা-তা জায়গায় তো দিতে পারবো না
তাই আগে থেকেই সে পথ বন্ধ করে দেবার চালাকিটি খেলেছে। কিন্তু চেষ্টা করে ভাবা ভাষাটাকে কি বিশ্বাসের ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করা যায়? না তার থেকে নিশ্চিন্ততার ফল মেলে?
ভাবনাটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আর একটা অজানা ভয় যেন গ্রাস করতে আসছে শোভনকে। হ্যাঁ ভয়, ভয়ই।
চাঁদের টুকরোর মত এক টুকরো ছেলে রাজার হাতের এক টুকরো লেখা যেন শোভনের সর্বনাশের ইশারা বহন করে এনেছে।
অনেকক্ষণ পাথরের মত বসে থেকে মায়ের চিঠিখানা ত্যাবার তুলে নিল শোভন, নিয়ে পড়তে লাগলো। মা লিখেছে
শোভন, ছেলেটার যন্ত্রণা আর চোখে দেখতে পারছিলাম না। তাই মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি জেগেছিল। ভেবেছিলাম, আমার কপালে যা থাকে থাক, পরে তুই আমায় জেলেই দিস আর ফাঁসিই দিস, মার কাছ থেকে কেড়ে-আনা ছেলেটাকে চুপিচুপি আবার তার মার কাছেই ফেরত দিয়ে আসি। তুই তার স্বামী কেড়ে নিয়েছিস, সংসার কেড়ে নিয়েছিস, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পরিচয় কেড়ে নিয়েছিস, আবার সন্তানটাকেও নিলি ভেবে বুকে বড় বাজছিল, কিন্তু দেখলাম, দুষ্ট বুদ্ধিটা মাঠে মারা গেল, আর উপায় নেই। ফেরত দেওয়া যাবে না।
