চায়ের পর্ব মিটিয়ে শোভন সামনের একটা দরজা খুললো, পর্দা সরিয়ে দরজায় দাঁড়ালো। এটা ওদের দু ভাইবোনের খেলাঘর ছিল। দুজনের হলেও ঘরের বারো আনা অবশ্যই একজনের। তার দোলনা ঘোড়া, তার রেলগাড়ি মোটরগাড়ি উড়োজাহাজ, তার কুকুর খরগোস হাতী পাখি, আর বহু-বুর্ণের বহু-মাপের বহু-বৈচিত্র্যময় পুতুলের মেলা।
আচ্ছা, খুকুর ওই পুতুলগুলোকে নিয়ে যায়নি কেন রেখা? রেখা কী নির্মম? শোভন তো রাজার খেলবার বস্তুগুলো যতটা পেরেছে, তার সঙ্গে দিয়ে এসেছে!
যদিও সেগুলোয় ব্যবহারের হাত পড়ছে না, গঙ্গার ধারের সেই বাড়িখানার একটা ঘরে বোঝাই হয়ে আছে। তবু ওর চোখের সামনে তো আছে।
আর ওই পুতুলগুলো?
ওদের আবার চোখ রয়েছে। বড় বড় বিস্ফারিত সব চোখ।
ওই চোখগুলো মেলে ওরা শোভনের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
পুতুলের চোখে কি দৃষ্টি থাকে? সে দৃষ্টিতে ব্যঞ্জনা থাকে? ভর্ৎসনা থাকে? তীব্র? করুণ?
শোভনের মনে হল, রয়েছে। শোভন সেই তীব্রতার সামনে থেকে তাড়াতাড়ি সরে এলো।
শোভনের কোথায় যেন কী একটা অসহ্য হচ্ছিল, তাই শোভন ওই পুতুলের মালিককে চলে যেতে দিয়েছে। অথচ শোভন এগুলো সহ্য করে যাচ্ছে।
সহ্য করে যাচ্ছে, একটা মেয়ে-মনের ভালবাসায় তিল তিল করে গড়া এই সংসারটাকে, সহ্য করে যাচ্ছে প্রকাণ্ড ডিনার-টেবলটার. একধারে বসে একা খাওয়া, বসবার ঘরের একটা ডিভানে তুচ্ছ একটা বালিশ নিয়ে শুয়ে থাকা।
সহ্য করে যাচ্ছে, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে একটা নিঃশব্দ প্রেতপুরীর মাঝখানে অভ্যস্ত নিয়মে ঘুরেফিরে কাজের জায়গায় যাবার জন্যে প্রস্তুত হওয়া।
কদিন যেন একটা ঘোরে ছিল, ঠিক অনুভব করতে পারছিল না সত্যি কি ঘটে গেছে। আজ মায়ের চিঠি যেন প্রবল একটা নাড়া দিয়ে জানিয়ে গেল ঘটনার স্বরূপ কি!
৩২. একটা প্রস্তাবের মুখোমুখি
বকুলকে যে হঠাৎ এমন একটা প্রস্তাবের মুখোমুখি হতে হবে, তা কোনোদিন কল্পনা করে নি সে।
সেই অকল্পিত অবস্থায় ভাসমান নৌকোয় পা রেখে বকুল তার প্রায় অপরিচিত জ্যাঠতুতো দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
একটু আগে বকুল যখন তাদের সাহিত্যচক্রের পুনর্মিলনের অধিবেশন সেরে বাড়ি ফিরেছিল, তখন বড়বৌদির ঝি খবর দিয়ে গিয়েছি, পিসিমা, আপনাদের দর্জিপাড়ায় না কোথায় যেন কে জ্ঞাতি আছে, সেখান থেকে আপনার বুঝি কোন দাদা আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে অনেকক্ষণ বসে আছে।
খুব ক্লান্ত লাগছিল; আবার এখন কার সঙ্গে কী কথা কইতে হবে, কত কথা কইতে হবে কে জানে! বকুলের সঙ্গে দেখা করবার জন্য যখন তিনি এতক্ষণ বসে আছেন, তখন যে সহজে ছাড়বেন এমন মনে হয় না।
আর এমনও মনে হয় না বকুলের উপকার হতে পারে বা লাভ হতে পারে, এ রকম কোনো বিষয় নিয়ে এসে বকুলকে সেটুকু উপটৌকন দেবার জন্যে বসে আছেন।
বাইরের কাপড় ছেড়ে হাত মুখ ধুতে ধুতে ভাবতে চেষ্টা করলো বকুল, কী হতে পারে? ও-বাড়ির সেই ছোটকাকার সেজদার মত কোনো সুবিধেজনক প্রস্তাব নিয়ে আসেননি তো? তাহলেই মুশকিল।
ও-বাড়ির সেই সেজদা, যাকে অন্য কোথাও দেখলে চট করে চিনে ফেলা শক্ত বকুলের পক্ষে, কারণ সব থেকে যারা নিকটজন তাদের সঙ্গেই সব থেকে দূরত্ব।
আসা-যাওয়ার পাটই নেই, ছেলে-মেয়ের বিয়ের সময় মহিলাদিগের ‘প্রীতিভোজ’ সম্বলিত কার্ডসহ যে নিমন্ত্রণপত্র এসে পৌঁছয়, তার সূত্রেই যা আসা-যাওয়া।
তবু বকুলের সেই খুড়তুতো ভাই এসে বলে উঠেছিল, তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।
সেদিনও বকুল বুঝেছিল কাজটা খুব সহজ নয়, হলে সেই ভদ্রলোক এসে এমনি বসে থাকতেন না।
নরম হয়ে বলেছিল, কি বলুন?
তিনি খুব অমায়িক গলায় বলেছিলেন, আমাকে আবার “আপনি আজ্ঞে” কেন রে? আমি কি পর? কাকা আলাদা বাড়িতে চলে এসেছিলেন তাই অচেনা, নচেৎ একই বাড়ি। একই ঠাকুমার নাতি-নাতনী আমরা।
বকুলের তখন মনে পড়েছিল, একই ঠাকুর্দা-ঠাকুমার বংশধর এই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইনি একদা তাঁর কাকাকে যৎপরোনাস্তি যাচ্ছেতাই করে গিয়েছিলেন বকুলের বিয়ে না দেওয়ার জন্যে। এতে নাকি তাদের বংশেও কালি পড়ছে, তাদের মুখেও চুনকালি পড়ছে।
অথচ বকুলের থেকে তিনি বয়েসে খুব যে বড় তাও নয়।
সে যাক, সে তো তামাদি কথা, বকুল নম্র হয়ে বলেছিল, আচ্ছা কী করতে হবে শুনি?
অর্থাৎ তুমি আপনি দুটোকেই এড়িয়েছিল।
দাদাটি বলে উঠেছিলেন, বিশেষ কিছু না রে ভাই, যৎসামান্য একটু কাজ। আমার ছোট ছেলেটা চাকরির জন্যে দরখাস্ত করছে, তোকে তার জন্যে একটা ক্যারেক্টর সাটিফিকেট লিখে দিতে হবে।
শুনে অবশ্যই বকুলের মাথা ঘুরে গিয়েছিল।
বকুল প্রায় থতমত খেয়ে বলেছিল–কিন্তু আমি তো তাকে চিনিই না, হয়তো দেখিওনি–
দাদা বিগলিত হাস্যে বলেছিলেন, দেখেছো নিশ্চয়ই, বিয়ে-থাওয়া কাজেকর্মে, তবে সে হয়তো তখন হাফপ্যান্ট পরে জল পরিবেশন করে বেড়াচ্ছে। আর চেনার কথা বলছিস? বলি আমাকে তো চিনিস? নাকি চিনিস না?
এই নিতান্ত অন্তরঙ্গতায়– ‘তুই’ ‘তুই’ শব্দটা কানে খটখট করে বাজছিল, বকুল তাতে মনে মনে লজ্জিত হচ্ছিল। সত্যিই তো নিতান্ত আপনজন। এঁর বাবা আর আমার বাবা একই মাতৃগর্ভজাত।
বকুল বলেছিল, আপনাকে চিনি না, কী যে বলেন! কিন্তু এখনকার ছেলেদের সম্পর্কে চট করে কিছু বলা তো মুশকিল। কি ধরনের বন্ধুদের সঙ্গে মেশে, হয়তো আপনার নিজের ছেলেকে নিজেই ভাল করে চেনেন না সেজদা!
