সময়ের যত মূল্যবান আর কি আছে? সেই সময়টাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে মানুষ! বই খাতা কিছুও যদি না থাকে, নিজের মনটা নেই? তাকে নিয়েই কাটিয়ে দেওয়া যায় না বাড়তি পেয়ে যাওয়া সময়টুকু?
শুধু কনক মাসিমার সঙ্গে রুচির কিছু মিল ছিল বলেই মাঝে মাঝে যেত।
তবু ওরই ফাঁকে একদিন একটা পাতায় চোখ বুলিয়ে ফেলেছিলেন অমলবাবু, ছুতো করে ভাড়ার ঘরে ঢুকে তাকের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, বৌয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অন্যমনস্কের ভাবে খাতাটার পাতা উল্টে।
কিন্তু দেখে লাভ হয়নি কিছু, একখানা পৃষ্ঠার পুরো পাতাটার নীচে মাত্র একটি লাইন, মানুষ নামের জীবটা কী হাস্যকর! বিধাতার সৃষ্টির গলদ!
পরের পৃষ্ঠায় সেইভাবে লেখা, অথবা জাতটা নিজের যথার্থ পরিচয় ভুলে মেরে দিয়ে নিজেকে হাস্যকর করে বসে আছে। বিধাতার সৃষ্টিতে গলদ ছিল না।
আর একটা পৃষ্ঠায় লেখা, আজকের মধ্যরাত্রির আকাশটা কী অপূর্ব! চাঁদ না-থাকা আকাশ কী অসম্ভব সুন্দর।
এই জিনিস লিখে মানুষ সময় নষ্ট করে? আবার সেটা অন্যকে দেখানো চলে না? রাবিশ।
পারুল এখনো মাঝে মাঝে ডায়েরি লেখে।
এখনো তেমনি ছিরিছাদের অভাব। আর ভঙ্গীটাও তেমনিই।
যেন মুখোমুখি বসে কারো সঙ্গে কথা বলছে।
আজ লিখছিল, মনের মধ্যে বেশ একটু অহঙ্কার জন্মে গিয়েছিল, তোমাদের নীতিনিয়মের ওই সব বহুবিধ দায়ের বোঝা আমি আর বয়ে মরি না।..অহঙ্কার ছিল, হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি ছুটিনে কাহারো পিছুতে মন নাহি মোর কিছুতেই, নাই কিছুতে। সে অহঙ্কারটা ভাঙতে বসেছে।…অহঙ্কার ছিল, যার বেড়ি তারে ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে বহুদিন পরে মাথা তুলে আজ উঠেছি।
কিন্তু এখন যেন টের পাচ্ছি সব বেড়ি ভাঙা সহজ নয়। সমাজের দায়, সংসারের দায়, চক্ষুলজ্জার দায়, মমতার দায়, সব কিছু ত্যাগ করলেও একটা দায় কিছুতেই ত্যাগ করা যায় না। সেটা হচ্ছে মানবিকতার দায়।…ওই যে ছেলেটা টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে স্কুলের পড়া তৈরী করছে, ওর মনের মধ্যে কী ঝড় তুফান উঠছে তার চিন্তায় আমার মনে প্রবল তুফান উঠছে। স্থির থাকা দায় হচ্ছে।
আচ্ছা, এটা কি স্নেহের দায়?
ছেলেটার মায়ায় পড়ে গেছি বলেই?
পাগল। ওসবের ধার পারু বামনী ধারে না। আজ যদি ওর মা-বাপের শুভমতি হয়, কাল আর ভাবি না–আজকের দিনটা থাকুক আমার কাছে ছেলেটা।…যদিও আমার প্রতিবেশিনীরা এখন মহোৎসাহে বেড়াতে আসতে শুরু করেছেন, এবং এই কথাটি বলতে পেয়ে আনন্দের সাগরে ভাসছেন, এইবারে দিদি আমাদের জব্দ হয়েছেন। এখন রাজা ভরতের দশা হলো! হরিণছানাটির জন্যে সব দরকার হচ্ছে। সব আহরণ করতে হচ্ছে।
আবার আর এক দল হিতৈষীও যারা সখেদে বলেন, দেখছেন তো দিদি যুগের ধর্ম! মা বাপ ওই দামাল বয়েসের ছেলেকে বুড়ো ঠাকুমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্দি হয়ে বসে আছে! একটা ছেলের কী কম হ্যাঁপা? আহা, আবার ওঁর জন্যে মাছ-মাংসের পত্তন করতে হচ্ছে। তবে এও বলি দিদিজাপনার আবার বেশী মায়া! কেন, দুধ ঘি ছানা মাখনে কি পুষ্টি নেই? তাই আপনি ওই ক্ষুদে ছেলেটার জন্যে এতকাল পরে ওই সব ছুঁয়ে মরছেন! আর মাছটা যদিও বা করলেন, মাংস, ডিম, এততা কেন?…তাছাড়া যতই করে মরুন, শেষ অবধি কি ওই ছেলে আপন হবে? হবে না দিদি, এই আমি আপনাকে স্ট্যাম্পো কাগজে লিখে দিতে পারি, কার্যকালে ঠিকই আমে-দুধে মিশে যাবে, আঁটি আঁস্তাকুঁড়ে রবে! নিজেই মারবেন মায়ায়!
শুনে শুনে খুবই হাসি পায়, বুঝলে?
মায়া নামক বস্তুটার সংজ্ঞা কী তাই ভাবতে চেষ্টা করা। অভিধানে আছে বিভ্রান্তি,… অলীক, যেটা যা নয় তাই দেখা, দৃষ্টিভ্রম-আবার এও আছে-মমতা স্নেহ। কোনটা সঠিক মনে হয় তোমার?
কাকে যে সম্বোধন করে লিখছে কে জানে! লিখছিল, হঠাৎ নাতিটা পড়তে পড়তে উঠে এলো। বিনা ভূমিকায়, বলল, বাবাকে লিখে দাও আমায় বোর্ডিঙে ভর্তি করে দিতে।
পারুল প্রায় চমকে উঠল। তবু সামলে নিয়ে বললো, কেন হে মহারাজ, হঠাৎ এই আদেশ কেন?
এখানে আমার ভাল লাগছে না।
সে তো না লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু বোর্ডিঙে গেলেই ভাল লাগবে মনে হয়?
লাগাতে চেষ্টা করবো।
তা এখানেই সেই চেষ্টাটা করে দেখো না।
না।
উদ্ধত উত্তর দিল ছেলেটা।
তবে তো লিখতেই হয় বাবাকে। তা তুই নিজেই লেখ না।
রাজা, পারুল যাকে মহারাজ বলে, তেমনি উদ্ধতভাবে বলে, না, তুমি লিখে দাও।
বাঃ! তোর বাবা, তুই লিখবি না কেন?
বলছি তো, না!
ছেলেটার সুকুমার শিশুমুখে একটা অনমনীয় কাঠিন্য।
পারুলও একটু কাঠিন্য দেখায়।
বলে, কিন্তু আমি কেন লিখতে যাব, বল? তোর এখানে অসুবিধে হচ্ছে তুই সেটা জানাবি-
রাজা লাল-লাল মুখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি বলেছি এখানে অসুবিধে হচ্ছে?
ওমা, তা না হলে হঠাৎ বোর্ডিঙে ভর্তি করার কথা উঠবে কেন? আমি তো সাত দিন সাত রাত বসে ভাবলেও এটা মাথায় আনতে পারতাম না। আমি হঠাৎ এমন কথা লিখলে বাবা ভাববে আমিই তোকে ভাগাতে চেষ্টা করছি।
কক্ষনো ভাববেন না। বাবা তোমায় চেনেন না বুঝি?
চেনেন বুঝি! পারুল সকৌতুকে বলে, আমি তো জানতাম আমায় কেউ চেনে না।
রাজা ক্রুদ্ধ গলায় বলে, তোমার কথার মানে বোঝা যায় না।
পারুল এবার শান্ত গলায় বলে, আচ্ছা রাজা, তোকে যদি আমি বাবাকে লুকিয়ে তোর মার কাছে রেখে আসি?
