ইতিহাস? বিশদ বলতে গেলে সাত দিন সাত রাতেও ফুরোবে না। সংক্ষিপ্ত ভাষণে হচ্ছে, সেই হতভাগা ছোঁড়াটা, যাকে জাম্বুবান বলে জানতে। তার একজন প্রাণের বন্ধু পার্টি বিরোধে ক্রুদ্ধ হয়ে তার প্রতি বোমা নিক্ষেপ করে ইহকালের মত পদগৌরব শেষ করে দেওয়ায়–
তার মানে?
মানে অতি সোজা। হাসপাতাল থেকে যখন বেলোল, চিরকালের চেনা পা দুটো নেই।
শম্পা!
আহা-হা, অমন আর্তনাদ করে উঠো না, রাস্তার লোক কী ভাববে। আচ্ছা আরো সংক্ষেপে সারি–প্রাণের বন্ধু ছাড়াও আলটু-বালটু কিছু বন্ধু ছিল তার, তাদের সাহায্যে দিব্যি সমুদ্র পার হয়ে কূলে উঠেছি—
কুলে উঠেছি মানে? তোর কথা কিছু বুঝতে পারছি না শম্পা, স্পষ্ট করে খুলে বল্ সব।
পিসি, আর বলতে গেলে তোমার ভাইয়ের বাড়ির মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়তে হবে। আমায় নামিয়ে দাও, বাসে করে চলে যাই।
বাড়ি যাবি না?
আজ থাক না।
পিসি হঠাৎ একটু চুপ করে থেকে আস্তে বললো, সেই ভাল, তুই নিজেই যাস।
তারপর ওই পুলক সঙ্ঘকে বললো, কথায় কথায় অনেকটা চলে এসেছি, একে তোমাদের পাড়াতেই পৌঁছতে হবে–
গাড়ির ব্যাপারে অনেক বারণ করলাম, শুনলো না, বললো, হাত ছাড়িয়ে রাস্তায় ঝাঁপ দিতে পারিস তো দে। ছেলেটা আর কি করবে, এখানে গলির মুখে ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। অবিশ্যি পিসি ট্যাক্সি ভাড়াটা দিয়েছিল।
এই বস্তির ধারে দিয়ে গেল?
উপায় কী? বাসাটা না দেখে প্রাণ ধরে চলে যেতে পারে কখনো? এখন ভাবছি কাজটা ভাল করলাম, না মন্দ করলাম!
কোন কাজ?
এই যে হঠাৎ ধরা দেওয়া! কি জানো, হঠাৎ কী রকম যে একটা লোভ হলো!
.
ঠিক এই একই কথা ভাবছিল তখন বকুল নামের একটা মানুষ।
কাজটা ভাল করলাম, না মন্দ করলাম?
যদি শম্পার মা-বাপ জেনে ফেলে শম্পার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল অথচ আমি তাদের বলিনি, কী বলবেন তারা আমায়?
কিন্তু আমি কেমন করে বলবো, ওগো তোমাদের মেয়ে নিজে যেচে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে আবার পালিয়ে গেছে, তোমাদের কাছে আসতে চায়নি!
ঘুম হয় না সারারাত।
৩০. ডায়েরি লেখা
ডায়েরি লেখা পারুলের আবাল্যের অভ্যাস।
ওই অভ্যাসের জন্যে অমলবাবু নামের ভদ্রলোকটি ক্ষেপে যেতেন। তার ধারণা ছিল আমাকেও দেখতে দেওয়া হয় না এমন কিছু লেখা স্ত্রীর পক্ষে অত্যন্ত গর্হিত! কিন্তু পারুল এমন অদ্ভুত আশ্চর্য ভাবে ধিক্কার দিয়েছিল যে, জোর করে চেয়ে নিয়ে পড়া সম্ভব হতো না।
অমলবাবু বলেছিলেন, কী লেখা হয় ওতে যে মাঝরাত্তিরে উঠে লিখতে ইচ্ছে করে? ওটা তো তোমার পদ্যর খাতা নয়?
পারুল হেসে গড়িয়ে পড়েছিল, ওমা, তুমি আমার পদ্যর খাতাটা চিনে রেখেছো? আমার সম্পর্কে তোমার এতো লক্ষ্য?
লক্ষ্যের কিছু অভাব দেখেছো? বলেছিলেন অমলবাবু।
পারুল হাসি থামিয়ে বলেছিল, তা বটে! লক্ষ্যের অভাব? নাঃ, বরং একটু অভাব থাকলে মন্দ হতো না!
অমলবাবু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, হুঁ, তা এ খাতাটা কিসের?
দেখছেই তো, ডায়েরির।
ডায়েরি! গেরস্থর ঘরের মেয়েছেলের ডায়েরি লেখবার কি আছে?
কিছুই নেই। পাগলামি মাত্র!
কই দেখি কী নিয়ে পাগলামি! বলেছিলেন অমলবাবু হাতটা বাড়িয়ে!
সেই সময় পারুল বেদম হেসে উঠেছিল, এমা, দেখবে কি বলে! পরের চিঠি পড়ো পড়ো, তাই বলে অন্যের ডায়েরী দেখবে? নাঃ, তুমি বাপু বড়ো বেশী গাঁইয়া! আমার সামনে যা বললে, আর কারুর সামনে বোলো না। এটাকে এই তোমার সভ্যতার ওপর ছেড়ে দিয়ে যেখানে সেখানে ফেলে রাখছি, দেখো-টেখো না যেন।
এমন গোপন জিনিস যে স্বামীকেও দেখানো চলে না?
দেখানো কো চলবে না? পারুল কৌতুকে চোখ নাচিয়ে বলেছিল, আমি তোমায় ভয় করি নাকি; তাই তুমি পাছে আমার গোপন কথা জেনে ফেলে বলে ভয় পাবো? অপরের ডায়েরি দেখাটাই অসভ্যতা। সভ্য সমাজের কতকগুলো আইন আছে, মানো তো?
মানি না একথা বলতে পারেননি অমলবাবু, তাই বেজার মুখে বলেছিলেন, ওসব হচ্ছে বিলিতিয়ানা কথা! বাঙালী-বাড়িতে আবার এই সব!
পারুল সঙ্গে সঙ্গে মুখটা খুব অমায়িক করে বলেছিল, ওমা তাই তো! বাঙালীদের সে সভ্যতা-ভব্যতার ধার ধারতে হয় না তাতে মনে ছিলো না। তবে তো দেখছি খাতাটাকে গভীর গোপনে লুকিয়ে রাখতে হবে।
বলেছিল কিন্তু তা রাখেনি।
ভাড়ার ঘরের তাকে ফেলে রেখেছিল।
অথবা সেটাই অমলবাবুর পক্ষে দূর্গম-দুস্তুর ঠাই বলেই ওই চালাকিটা খেলেছিল। ভাড়ার ঘরে চাবি দেওয়ার কড়া নির্দেশ অমলবাবুরই। চাকর-বাকরকে তার দারুণ সন্দেহ।
পারুল যখন বলেছিল, সর্বদা চাবি দিয়ে রাখবো, ভাঁড়ারে এমন কি আছে? টাকা না গহনা, নাকি শাল-দোশাল-? দুটো চাল ডাল তেল নুন বৈ তো নয়। তখন অমলবাবু পারুলকে ন্যাকা আখ্যা দিয়েছিলেন।
অতএব পারুল একনিষ্ঠ চিত্তে ভাঁড়ারে চাবি লাগায় এবং সে চাবি কোথায় যে রাখে কে জানে! আঁচলে চাবি বাঁধার যে একটা চিরন্তন রীতি আছে বাঙালী মেয়েদের, সেটা আবার পারুলের হয়ে ওঠে না। আঁচলে চাবি বাধার অভ্যাস তার এতাবৎকাল নেই!
পারুল যখন তাড়ারে থাকে, কাজকর্ম করে, তখন কিছু আর সামনে থেকে খুন করে টেনে নেওয়া যায় না। আর পারুল যখন বাড়িছাড়া হয়ে কোথাও যায়, চাবিটা খুঁজে পাওয়া যায় না।
অবিশ্যি কোথায় আর যেত পারুল, হয়তো পাশের বাড়ির কনক মাসিমার কাছে। মফঃস্বলে যে রকম পাড়া-বেড়ানোর প্রথা, পারুল তেমন বেড়াতে পারতো না অমলের ভয়ে। নয়, নিজের বিতৃষ্ণায়? ওটা ওর নিজের রুচিতেই ছিল না।
