এটা তোমার তর্কের কথা, সত্যবান বলে, আমার তো মনে হয় তোমাদের ওই প্রেস্টিজ জিনিসটা পোশাকী জামা-কাপড়ের মত। তবে? নিজেদের লোকের কাছে ওটা রক্ষা করার এত কী দায়?
শম্পা মারা নেড়ে বলে, নো নো। নিজের লোক কেন, সব থেকে দায় নিজের কাছেই রক্ষা করার।
সতাবান মলিনভাবে বল, এই জন্যেই তোমাকে আমার ভয় করে! মনে হয় তোমার মনের নাগাল একজন্মে কেন, সাতজন্ম ঘুরে এলেও পাব না।
উঃ, নিজের সম্পর্কে কী বিরাট ধারণা। যাক এখন খাবারটা খাবেন মহাশয়? নাকি এটাও নাগালের বাইরের বলে মনে হচ্ছে?
সত্যবান আস্তে বলে, তা হচ্ছে না। হয়ও না। তুমি যখন দয়া করে নিজে অনেকটা নেমে এসে নাগালের মধ্যে দাঁড়াও, তখন মনে হয় হয়তো এইবার সব সহজ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে আর কতক্ষণ? তার পরেই তো আবার ভয়।
উঃ, এবার তো দেখছি তুমিই আমার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই সব ভাবো তুমি?
ভাবনা ছাড়া আর তো কোনো কাজ নেই!
তার মানে এখন থেকে আমায় ভাবনায় পড়তে হচ্ছে। যাক, খাওয়ার প্রশ্নটা তাহলে ধামাচাপা পড়ল?
রাত তো হয়েই গেছে। একেবারে খেয়ে নিলেই হবে!..বরং ততক্ষণ তোমার আজকের– কী বলে, অভিযান না, তার গল্প শুনি।
শম্পা নিজস্ব ভঙ্গীতে ঝলসে ওঠে, অভিযান! ওরে ব্বাস! এরপর হয়তো তুমিই আমার অভিধান হয়ে দাঁড়াবে। তা অভিযানই বটে!
হঠাৎ একটু থামল, চুপ করে গিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন সহসা ওর সেই অভিযানের স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যায়।
এখন ওর মুখের পাশের দিকটা দেখা যাচ্ছে যেন বড় বেশী চাঁচাছোলা। চোয়ালের হাড় কি আগে দেখা যেত শম্পার?
সত্যবান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, কী রোগাই হয়ে গেছো তুমি!
পিসিও তাই বলছিল, কেমন যেন আচ্ছন্ন অন্যমনস্ক গলায় বলে শম্পা, আমি অবিশ্যি তা মানি না। কোনো কালেও আমি মোটকা ছিলাম না। পিসিকে তাই বললাম। তবে মার জবরদস্তিতে নিত্য খানিকটা করে দুধমাখন, মাছ ডিম, মিষ্টান্ন ইত্যাদি পেটের মধ্যে চালান করাতে বাধ্য হতাম তো। তার একটা এফেক্ট থাকবেই।
পিসির কাছে গিয়েছিলে তুমি?
সত্যবান একটু পর বলে কথাটা।
শম্পা তেমনি অন্যমনস্ক গলায় বলে,পিসির কাছে?
হ্যাঁ, পিসির কাছে? মা-বাবার সঙ্গে দেখা হল?
শম্পা সচেতন হয়।
শম্পা একটু নড়েচড়ে বসে, দূর! আমি কি ওখানে, মানে বাড়িতে গিয়েছিলাম নাকি? সকালে রুটি আনতে বেরিয়েছিলাম, হঠাৎ দেখি দোকানের পাশের একটা দেয়ালে প্ল্যাকার্ড সাঁটা-পুলক সঙ্ঘের বার্ষিক উৎসবে অভিনব আয়োজন, শ্যাম নৃত্যনাট্য, বিচিত্রানুষ্ঠান, শিল্পী অমুক অমুক, সভানেত্রী দেশবরেণ্য সাহিত্যিক শ্রীযুক্তা অনামিকা দেবী!..ঠিকানাটা দেখে হাত-পা স্রেফ হিম। বুঝতে পারছে, কেন? একেবারে দোরের কাছে! কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থেকে কর্তব্য স্থির করে ফেললাম। তখন অবশ্য বলিনি তোমায়, ভাবলাম কি জানি বাবা, সভানেত্রীর কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে পারি কিনা! বলে খেলো হব?…তা বুদ্ধির জোরে শেষ অবধি পৌঁছলাম।…একেবারে সভা-অন্তে গাড়িতে ওঠার সময় দেখি-অটোগ্রাফ শিকারীরা হেঁকে ধরেছে, আমিও হাত বাড়িয়ে বললাম–আমায় একটা অটোগ্রাফ..খাতা ফাতা অবিশ্যি ছিল না, ওই আর কি। দেখলাম পিসি বিভ্রান্তের মত চারদিকে তাকাচ্ছে, তারপর না থপ করে আমার হাতটা চেপে ধরে বলল, উঠে আয়।
কোথায় উঠে আয়?
এই দেখ, কোথায় আবার? গাড়িতে!
তারপর?
তারপর আর কি, বাধ্য মেয়ের মত উঠেই পড়লাম। পুলক সঙ্ঘের একটা ছোঁড়া বোধ হয় গাড়িতে, অত গেরাহ্যি করলাম না। করবই বা কি! তখন তো পিসি-ভাইঝি দুজনেই বাকশক্তিরহিত।…একটু পরে পিসি বলল, তোকে কী করব? ঠাসঠাস করে গালে চড় মারব, না চুলের মুঠি ধরে মাথা ঠুকে দেব? আমি বললাম, এই কি দেশবরেণ্যা সাহিত্যিকার ভাবের অভিব্যক্তি?
পিসি বলল, হ্যাঁ।
তারপর না অনেকক্ষণ পরে আমি বলে উঠলাম, আমি কিন্তু আমার আস্তানা থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি–অতঃপর নাটকের দুই নায়িকার মধ্যে এই মত কথোপকথন হলো।
কোথায় তার আস্তানা?
পুলক সঙ্ঘের কাছাকাছি। অনেকটা চলে এসেছি।
এখন কে ছাড়ছে তোকে?
ধরে ফেলার কথা তো ওঠে না বাপু। নিজেই ধরা দিয়েছি।
অশেষ দয়া তোমার। এখন চলো বাড়ি।
আজ থাক্ পিসি—
কেন, আজ থাক্ কেন? তোর মা-বাপের অবস্থাটা ভেবে দেখিস কোনো দিন?
ওনারা তো ডাঁটুস!
সেই ডাঁট তুই রাখতে দিয়েছিস লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা মেয়ে?
ওরে ব্বাস! তুমি যে অনেক নতুন নতুন ভাষা শিখে ফেলেছ দেখছি ইতিমধ্যে
তুমি অনেককে অনেক শিখিয়েছে পাজি নিষ্ঠুর মেয়ে!
তুমি বুঝি এই গালমন্দগুলো শোনাবার জন্যে টেনে গাড়িতে তুললে?
তা ছাড়া আবার কী! এ তো কিছুই নয়, আরো অগাধ আছে। এতদিন ধরে আর কী জমানো সম্ভব ছিল তোর জন্যে।
তাহলে যা যা আছে তাড়াতাড়ি শেষ করে নাও। অর্থাৎ তূণে যত বাণ জমা করে রেখেছো, সব মেরে তুণ খালি করে ফেলল। আমাকে আরো বেশী দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলে ফিরতে বড় ভুগতে হবে পিসি। তখন আর তোমার পুলক সঙ্ঘ বিপুল পুলকে আমাকে আমার মাটকোঠায় পৌঁছতে যাবে না।
মাটকোঠা! মাটকোঠায় থাকিস তুই? পিসি যেন আছাড় খেলো।
দেখে হেসে বাচি না।
বললাম, তবে কি আশা করেছিলে, দালানকোঠা?
না, তোমার সম্পর্কে আশা-টাশা আর কিছু করে না কেউ। কিন্তু ইতিহাসটা কী?
