বলুন স্যার?
এত দূর্দশার মধ্যে এত আহ্লাদ কোথা থেকে আসে তোমার শম্পা?
দুর্দশা!
শম্পাও ভুরু কুঁচকে ঝলে, তা বেশ, দশাটা যদি দুর্দশাই হয়, যদিও আমি তা মানি না, এটা আপনাদের ধারণার ব্যাপার, তাহলেও বলি–আহ্লাদ জিনিসটার বাসা কোথায় বলুন তো মশাই? ওটা কি বাইরের কোনো দোকানে মেলে? নাকি আশপাশের গাছে ফলে?
তোমার কথা শুনলে আমার অবাক লাগে শম্পা। আমার ভয় করে।
ভয় করে? সেটা আবার কী? শম্পা সর্বাঙ্গে আহাদ ঠিকরে বলে, অবাক লাগতে পারে, এমন অবাক করা একখানা মেয়ে দৈবেই দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু ভয়?
ভয়ই তো। মনে হয় হঠাৎ একদিন দেখব এই সবই স্বপ্ন, তুমি আর আমার সামনে নেই।
সামনে না থাকাই স্বাভাবিক। শম্পা তেমনি করে হাসে, পিছনে থাকলে ঠেলার সুবিধে।
সেই তো। সারাজীবন আমায় ঠেলে নিয়ে যাবে এ আমি ভাবতেই পারি না।
তোমায় সেদিন কী পড়তে দিয়েছিলাম? শম্পা মাস্টার মশাইয়ের ভঙ্গীতে গম্ভীর গলায় বলে, পড়নি রাজকুমারী ও বামনের গল্প!
পড়েছি। ওসব পড়াশুনোর মধ্যে কোন সান্ত্বনা পাই না। কোনোমতেই নিজেকে তোমার পাশে ভাবতে পারি না।
শম্পা বসে পড়ে হতাশ গলায় বলে, আচ্ছা তুমি কি চাও বল তো? আমাকেই তোমার যোগ্য করে নিতে কোনো কৌশল প্রয়োগ করব? বেশ, কী করা যায় বল? পা-দুটো কেটে ফেলা? উঁহু, ওতে সুবিধে হবে না। চার-চাকার গাড়ি না থাক, দু-চাকার সাইকেলটাও দরকার। একজনের অন্ততঃ পা থাকা বিশেষ প্রয়োজন। হাত? ওরে বাবা, হাত বাদ দিলে তোমার মুখের সামনে নাড়ব কী?…চোখ? ওটা গেলে কটাক্ষ গেল। এক পারা যায়, সূর্পণখার মতো নাকটা কানটা খতম করে ফেলা। বল তো তাই করা যাক। তাহলে যদি তুমি কিছু-কিঞ্চিৎ সান্তনা। পাও!
শম্পা!
এই দেখ! বেরোবার সময় এই এক নাটক! যাচ্ছি একটা শুভকাজে, আর ওই সব কাণ্ড! পুরুষমানুষের চোখে অশ্রুধারা–এ আমার বরদাস্ত হয় না বাপু!
সত্যবান অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কেন আমাকে ভালবাসতে এলে শম্পা?
ওই তো! শম্পা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ওইটাই তো আমিও ভেবে মরি। কী মরণদশা হল আমার যে, তোমার মতন একটা উজবুক বুদ্ধুকে ভালবাসতে গেলাম! যাক গে, যা হয়ে গেছে তার তো আর চারা নেই!
চারা নেই কে বললে? তুমি তো অনায়াসেই–
দেখ এবার কিন্তু আমি রেগে যাব। আমার রাগ তুমি জানো না। বাবা বলল, আমার বাড়িতে বসে এসব চলবে না। বললাম, বেশ চালাব না। চলে এলাম এক বস্ত্রে।
সেই তো, তোমার ওই ভয়ঙ্কর ইতিহাসটাই আমাকে সর্বদা ভয় পাওয়ায়।
তবে হে প্রভু, আপনি এখন বসে বসে ভয় পান, আমি একটু বেরিয়ে পড়ি।
সত্যবান বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, এত আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে কোথায় চলেছ?
বলব কেন?
না বলতে চাও বলবে না।
উঃ, কী রাগ বাবুর। বলব, বলব, ফিরে এসে বলব। এখন চলি, কেমন? খেও। আর এই বইটা পড়ে ফেলো।
কোনটা? বই তো অনেক চাপিয়ে রেখেছ?
আহা, বললাম না রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবিটা পড়ে ফেলো। কিছুই তো পড়নি এযাবৎ। পড়ে দেখো। দেখবে একমাত্র বই পড়ার মধ্যেই জীবনের সব দুঃখকষ্ট ভোলা যায়। তোমায় আমি ওই নেশায় নেশাখোর করে তুলব দেখো!
হাসতে হাসতে আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে চলে যায় শম্পা।
ঝাপসা ঝাপসা অনেকগুলো মুখের মধ্যে থেকে একখানা মুখ ঝলসে উঠল।
রোগা কালো শুকনো একটা মুখ।
তবু বুঝি আকাশ ভরা চন্দ্র-সূর্যের আলো ভরা।
বিশ্বাস করতে কিছুটা সময় লাগল।
হয়তো সে সময় ঘড়ির হিসেবে এক সেকেণ্ডের ভগ্নাংশ মাত্র, তবু থমকে থেমে থাকা ক্ষণকাল বুঝি অনন্তকালের স্বাদবাহী।
ওই মুখের অধিকারিণীর হাতে সত্যি কোন অটোগ্রাফ খাতা ছিল না, তবু হাতটা বাড়ানো, ছিল। রোগা পাতলা নিরাভরণ একখানা হাত।
অনামিকা ওই হাতখানাকে শক্ত হাতে চেপে ধরে বললেন, উঠে আয়।
.
হাসতে হাসতে বেরোলে, আর কাঁদতে কাঁদতে ফিরলে যে? সত্যবান ওকে ঘরে ঢুকতে দেখে হাতের বইটা মুড়ে রেখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে প্রশ্ন করে, কী হলো?
শম্পা হাতের ব্যাগটা দেওয়ালের পেরেকে ঝুলিয়ে রাখার ছুতোয় দেয়ালমুখো হয়ে বলে ওঠে, কাঁদতে কাঁদতে! বলেছে তোমাকে!
বলে, কিন্তু কণ্ঠস্বরে ওর নিজস্ব কলকণ্ঠের ঝঙ্কার ফোটে না! ঝঙ্কারের চেষ্টাটাই ধরা পুড়ে শুধু।
সত্যবান আর কথা বলে না। বইটা মুড়েই বসে থাকে চুপচাপ।
শম্পা বলে, খেয়েছিলে?
সত্যবান কুণ্ঠিত গলায় বলে, না–মানে, খুব বেশী খিদে পায়নি
শম্পা এবার ফিরে দাঁড়ায়, বলে ওঠে, খুব বেশী খিদের মত ভয়ানক কিছু দিয়ে খাওয়া হয়েছিল কি?
না না, মানে মোটেই খিদে পায়নি।
শম্পা এবার ওর কাছাকাছি টুলটায় বসে পড়ে হতাশ গলায় বলে, আচ্ছা, তোমার জ্বালায় আমি কী করবো বলতে পারে?
করবার কিছু নেই। নিজের হাতেই খাল কেটে কুমীর এনেছে।
শম্পা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, সেকালের রাণী-মহারাণীরা কেন যে একটা গোঁসাঘর রাখতেন, সেটা মর্মে মর্মে অনুভব করছি। যে কোনো সম্ভ্রান্তচিত্ত মহিলার ওটা একান্ত প্রয়োজন।
একান্ত প্রয়োজন?
নিশচয়! সব সময় মহারাজদের চোখের সামনে থাকতে হলেই তো প্রেস্টিজ পাংচার! কখন যে রাণীর হাসতে ইচ্ছে হয় আর কখন যে কাঁদতে ইচ্ছে হয়
সত্যবান কথার মাঝখানে বলে ওঠে, সব সময় ওই প্রেস্টিজটা আঁকড়েই থাকতে হবে তার কী মানে আছে?
হুঁ! বাক্যিটাক্যি তো বেশ রপ্ত করে ফেলেছো দেখছি। তাহলে বলি–প্রেস্টিজটাই তো মানুষ। ওটা ছাড়া আর কী রইল তার? চারখানা হাত পা, চক্ষু কর্ণ নাসিকা, রক্ত মাংস হাড়, এসব তো পশুজাতিরও থাকে।
