সমাজতন্ত্রের বহুবৈচিত্র্যময় লীলাখেলার খাজনাটিও অব্যাহত ধারায় যুগিয়ে চলতে হয় সমাজবদ্ধ জীব হতভাগ্য মানুষকে।
কোথায় কার কখন আসছে শ্ৰতি-ক্লান্তি, আসছে বিতৃষ্ণা-বিমুখতা, কে তার দিকে তাকিয়ে দেখে? কে বোঝে কে হাঁপিয়ে উঠেছে, মুক্তি চাইছে।
না, সে কেউ ভাবে না, বোঝে না, দেখে না। সমাজে খাজনার বড় দায়। আপনার যখন এক মেঘমেদুর সন্ধ্যায় একা বসে আপন নিভৃত জীবনের সুখ-দুঃখের স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, তখন হয়তো আপনাকে অমোঘ এক বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আলো বাজনা শব্দ আর মানুষের ভিড়ের মধ্যে গিয়ে আছড়ে পড়তে হবে। চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হওয়ার আহ্বাদে শতমুখ হতে হবে আপনাকে।
হয়তো কোনো দিন আপনার এক অকারণ খুশীর মন নিয়ে জানলার ধারে বসে কবিতা পড়তে বাসষ হচ্ছে, তখন হয়তো আপনার আত্মীয়-কন্যার নবজাত শিশুটির মুখ দেখতে ছুটতে হবে দূরবর্তী কোনো নার্সিং হোমে?
অথবা হয়তো কোনো এক উজ্জল বৈশাখের বিকেলে আপনার কোনো প্রিয় বন্ধুর বাড়ী বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে একটু আড্ডা দিয়ে আসতে, তখন পিসতুতো পিসিমার শবযাত্রার সঙ্গে শোভাযাত্রী হয়ে গিয়ে পৌঁছতে হবে মহাশ্মশানে।
মোটা কথা নিজেকে নিয়ে একা পড়ে থাকবার উপায় নেই। সমাজের ট্যাক্স যোগান দিয়ে চলতেই হবে।
অতএব অনামিকাকে পুলক সঙ্ঘের বার্ষিক সাহিত্যসভার উদ্বোধনে যেতে হয়েছিল তখন, যখন শম্পা নামের একটা চিরকালের মেয়ের মুখটা স্মরণ করে প্রাণটা হাহাকার করছে। সে প্রাণ ছুটে যেতে চাইছে তার সন্ধানে।
কিন্তু নতুন করে হঠাৎ কেন এই হাহাকার?
তা আছে কারণ।
আজই বাড়িতে একটা পোস্টকার্ড এসে জানিয়ে দিয়ে গেছে–আমি মরিনি, বেঁচে আছি।
হ্যাঁ, নাম-সম্বোধনহীন শুধু ওই একটি লাইন। এ চিঠির দাবিদার কে জানার উপায় নেই, কোথাও কারো নাম নেই। ঠিকানার অংশটুকুতে শুধু গোটা গোটা করে লেখা ঠিকানাটুকুই।
তবে?
এই চিঠিটুকুকে ‘আমার’ বলে দাবি কে করতে পারে?
হিসেবমত কেউই পারে না। অথবা ওই ঠিকানার বাসিন্দারা সকলেই পারে।
তবু অনামিকার মনে হচ্ছিল, আমিই দাবিদার।
কিন্তু কোনখান থেকে চিঠিটা পোস্ট করা হয়েছে কিছুতেই ধরা গেল না। কালিমাবিহীন স্বাধীন সরকারের ডাক-বিভাগ যথারীতি স্ট্যাম্পের উপর একটি অস্পষ্ট ছাপের ভগ্নাংশটুকু মাত্র দেগে দিয়ে কর্তব্য সমাধা করেছে।
যেন ওই এক লাইন লেখাটা পাঠিয়ে যে মজা করেছে, সেই দুষ্টু মেয়েটা ডাক-কর্মচারীদের শিখিয়ে দিয়েছে–স্পষ্ট করে ছাপ মেরো না, আমি তাহলে ধরা পড়ে যাব।
অথচ ওই কথাটুকু তার লিখে জানাবার ইচ্ছেটি হয়েছে এতদিনে।
আমি মরিনি, আমি বেঁচে আছি।
এ কার হাতের লেখা? এ কোন স্বর্গলোকের কথা?
ছোড়দা ক্লান্ত গলায় বললেন, অন্য পাড়া থেকেও পোস্ট করা অসম্ভব নয়।
ছোটবৌদি সেই অক্ষর কটাকে পাথরে খোদাই করার মত মনের মধ্যে খোদাই করে ফেলেও, আর একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলেন, আচ্ছা বকুল, হাতের লেখাটা ঠিক তার বলে মনে হচ্ছে তোমার? কোনো বাজে লোকের কারসাজি বলে মনে হচ্ছে না তো?
কী যে বল! ওর হাতের লেখা ভুল হবে? মনটা ভাল কর বৌদি, খবর যখন একটা দিয়েছে
যখন এই প্রসঙ্গ নিয়ে অনামিকার সঙ্গে তাঁর ছোড়দা-ছোটবৌদির আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই এই পুলক সঙ্খের গাড়ি এলো।
আমোঘ অনিবার্য এই গাড়ি।
যেতে পারব না বলার প্রশ্ন ওঠে না।
অনামিকা বলে গেলেন, আচ্ছা, তোমরা চেষ্টা করে দেখো—
অনামিকা বেরিয়ে গেলেন।
পুলক সঙ্ঘের সমস্ত পুলকের ভার বহন করতে হবে এবার।
চলন্ত গাড়িতে ভাবতে ভাবতে চলেন অনামিকা, এই খবর দেওয়াটার মধ্যে কোন্ মনস্তত্ত্ব কাণ্ড করছে।
ও কি খুব কষ্টে পড়েছে। তাই আর না পেরে ফিরে আসতে চাইছে?
ও কি আপরাধবোধে পীড়িত হয়ে এতদিনে—
ওর কি হঠাৎ সবাইয়ের জন্যে মন কেমন করে উঠেছে?
চশমাটা খুলে মুছলেন অনামিকা।
আর যখন আলোকোজ্জ্বল মঞ্চে গিয়ে বসলেন, তখন সহসা মনে পড়ে গেল একদিন আমি নির্মল মারা গেছে শুনেও সভায় এসে অবিচল ভাবে সমস্ত কাজ করে গিয়েছিলাম।
অথচ আজ ও বেঁচে আছে খবর পেয়ে এত ভয়ানক বিচলিত হচ্ছি যে কিছুতেই মন, বসাতে পারছি না! কবে এত দুর্বল হয়ে গেলাম আমি?
তবু অভ্যাসগত ভাবে হয়েও গেল সব।
মঞ্চ থেকে নেমে আসতে আসতে হেঁকে ধরল অটোগ্রাফ-শিকারীর দল। আর তাদের আবদার মিটিয়ে যখন ঠিক গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন, হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠল, আমায় একটা অটোগ্রাফ!
কে? কে?
কে বলল একথা?
অনামিকা গাড়ির দরজাটা ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে আশপাশের ভিড়ের দিকে তাকালেন। অনামিকার মনে হল সব মুখগুলো যেন একরকম–ঝাপসা ঝাপসা!
২৯. বৈকালিক রাশ গোছানো
এই তোমার বৈকালিক রাশ গোছানো থাকল, দয়া করে ঠিক সময় খেয়ে নিও।
সত্যবানের সামনে টুলে একটা কৌটো নামিয়ে রেখে বলল শম্পা, এসে যেন দেখি না কৌটো খোলা হয়নি!
সত্যবান ভুরু কুঁচকে বলল, সবই তো বুঝলাম, কিন্তু বৈকালিক রাশ কথাটার মানে?
মানে? মানে তো অতি সোজা! প্রাতরাশ মানে জান? নাকি তাও জান না?
সেটা জানি।
তবে আর কি। সকালের জলখাবার যদি প্রাতরাশ হয়, বিকেলেরটা বৈকালিক রাশ হবে না কেন?
সত্যবান ওর আলো-ঝলমলে মুখের দিকে অভিভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে ওঠে, শম্পা
