আর খুঁজে বেড়াচ্ছেন না ঝকঝকে রাংতামোড়া জীবনের অন্তরালে কী শ্মশানের ভস্মরাশি?
তবু আজ মনে হচ্ছে হয়তো আরো দেখার ছিল। দুঃসহ বেদনাভারাক্রান্ত পৃথিবীকে যতটা দেখেছেন অনামিকা, হয়তো ততটা দেখাননি তার আলোর দিকটা।
আলোও আছে বৈকি।
আছে আনন্দ, আছে বিশ্বাস, আছে প্রেম, আছে সততা।
শুধু তারা তীব্র শিখায় চোখ ধাঁধায় না বলেই হয়তো চোখে কম পড়ছে। অনামিকার মনে পড়ে সেই ছেলেটার মুখ, যে একদিন তার প্রথম কবিতা ছাপা হওয়া পত্রিকাখানা নিয়ে দেখাতে এসেছিল। তার মুখে যেন বিধাতার আশীর্বাদের আলো।
এমন কত ছেলেই তো আসে।
আজকের ছেলেদের প্রধান হবিই তো সাহিত্য।
রাশি রাশি ছেলে আসে তাদের নতুন লেখা নিয়ে। অবশ্যই শুধুই যে দেখাতে আসে তা নয়, আসে একটা অবোধ আশায়ভাবে উনি ইচ্ছে করলেই ছাপিয়ে দিতে পারবেন।
‘উনি’র ক্ষমতা সম্পর্কে বোধ নেই বলেই ভাবে। আর শেষ পর্যন্ত ওঁকে সহানুভূতিহীনই ভাবে। হয়তো কোথাও জায়গা না পেয়েই ওরা নিজেরা জায়গা তৈরি করে নিতে চায়, তাই রোজ রোজ পত্রিকার জন্ম হচ্ছে দেশে।
দু’এক সংখ্যা বেরিয়েও যদি তার সমাধি ঘটে ঘটুক, তবু তো কয়েকটি ছেলের চিন্তার শিশুগুলি আলোর মুখ দেখতে পেল।
বাংলাদেশের শিশুমৃত্যুর হার নাকি কমে গেছে। পবিত্র শিশুরা হয়তো সেই হার বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ওই ক্ষীণকায় পত্রিকাগুলি হাতে নিয়ে ওরা যখন আসে, তখন ওদের মুখে যে আহ্লাদের আলো ফোটে, সেই কি তুচ্ছ করবার?
তবু সেই একটা ছেলেকে খুব বেশী মনে আছে। অথচ আশ্চর্য, নামটা মনে নেই। মনে আছে চেহারাটা, শ্যামলা রং, পাতলা লম্বা গড়ন, চুলগুলো রুক্ষুরুক্ষু, কপালে একটা বেশ বড়সড় কাটার দাগ, আর তীক্ষ্ণ নাকওয়ালা মুখেও একটা আশ্চর্য কমনীয়তা।
তার কবিতা তাদের নিজেদের পত্রিকায় বেরোয়নি, বেরিয়েছিল একটি নামকরা পত্রিকায়। কেমন করে এই অসাধ্য সাধন করেছিল সে তা সে-ই জানে। কেবলমাত্র লেখার গুণের জোরেই যে এটা হয়ে ওঠে না সে তো সকলেরই জানা।
গুণটা যে আছে সেটা তাকিয়ে দেখছে কে?
তা হয়তো তার ভাগ্যে এমন কেউ দেখেছিলেন, যার হাতে সেই গুণটুকুকে আলোয় এনে, ধরবার ক্ষমতা ছিল। যাই হয়ে থাক, ছেলেটির সেই মুখ ভোলবার নয়।
বলেছিল, জানেন, জীবনে যদি আমার আর একটাও লেখা ছাপা না হয়, তাহলেও দুঃখ থাকবে না আমার!
অনামিকা বলেছিলেন, সে কী!
হ্যাঁ, সত্যিই বলছি আপনাকে। আমার পারিবারিক জীবনের কথা আপনি জানেন না। সেখানে অনেক বঞ্চনা, অনেক দুঃখ, অনেক অপমান। তবু মনে হচ্ছে–সব কষ্ট সহজে সইবার ক্ষমতা আমার হবে আজ থেকে।
কথাগুলো অবশ্যই অতি আবেগের, তবু কেন কে জানে হাসি পায়নি, অতি আবেগ বলেও মনে হয়নি। যেন ওর মধ্যে একটা দৃঢ় প্রত্যয় কাজ করছে।
কবিতাটা প্রেমেরই অবশ্য, তবে আধুনিক ভঙ্গীতে তো সেই প্রেমকে ধরাছোঁয়া যায় না, তবু অনামিকার মনে হয়েছিল ছেলেটা কি ওই কবিতার মধ্যে দিয়ে তার প্রেম নিবেদন করতে চেয়েছিল?
নামটা মনে নেই এই দুঃখ।
নতুন নতুন কিছু শক্তিশালী কবি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু তাদের চেহারাটা তো দেখতে পাচ্ছেন না! কে জানে কার কপালে রাজটাকার মত সেই কাটার দাগটা!
ছেলেদের মধ্যে এই সাহিত্যের হবি যতটা বেশী, মেয়েদের মধ্যে তার সিকির সিকিও নয়।
তবে মেয়েদের মধ্যে থেকেও কি খাতার বোঝা নিয়ে কেউ আসে না? খাতার বোঝা আর প্রত্যাশার পাত্র নিয়ে?
আসে। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখেছেন অনামিকা দেবী, তারা মেয়ে নয়, প্রায় কেউই, তারা সংসারের পোড়-খাওয়া গৃহিণী, অবমানিতা বধূ। হয়তো প্রৌঢ়া, হয়তো মধ্যবয়সী।
সারাজীবনের তিল তিল সঞ্চয় ওই খাতাগুলি।
কিন্তু ওগুলির যে কোনোদিনই আলোর মুখ সেথার সম্ভাবনা নেই, সেকথা তাদের বল কষ্ট হয়। আর সত্যি বলতে–তখন হয়াৎ নিজেকে ভারী স্বার্থপর মনে হয় অনামিকা দেবীর।
যেন তিনি অনেকের প্রাপ্য ভাগ দখল করে বসে আছেন। প্রাচুর্যের আহার্যপাত সামনে নিয়ে বসে দরিদ্রের দীন অন্নপাত্র চোখ পড়ে গেলে যেমন লাগে, অনেকটা যেন তেমনি
সেই বৌটির কথা মনে পড়ছে, তার নামও মনে আছে। অথচ খুব সাধারণ নাম–সবিতা। তার লেখাও অবশ্য তেমনি। বলতে গেলে কিছুই নয়, কিন্তু তার ধারণা ছিল, পাঠকদের চোখের সামনে আসতে পাচ্ছে না বলেই সে লেখার জয়জয়কার হবার সুযোগ পাচ্ছে না। অতএব যেমন করেই হোক-~
এই মূঢ় প্রত্যাশায় বৌটা বাপের বাড়ি গিয়ে লুকিয়ে গহনা বিক্রী করে একটা চটি বই ছেপে বসলো।
তারপর আর কি! লাঞ্ছনা গঞ্জনা ধিক্কারের শেষ নেই।
তার স্বামী বলেছিল, যে মেয়েমানুষ এতখানি দুঃসাহস করতে পারে, সে পরপুরুষের সঙ্গে বেরিয়েও যেতে পারে।
ফলে এই হল, বেচারী বোটা তার সারাজীবনের যত প্রাণের বস্তু সব আগুনে ফেলে দিল, আগুনে ফেলে দিল সেই পাঁচশো কপি বইও।
সবিতার সেই মুখটা মনে পড়ে। এসে বলেছিল, মাসিমা, নিজে হাতে ছেলেকে চিতায় দিয়ে এলাম। অনামিকা বলেছিলেন, ছি ছি, এ কি বলছো! সন্তানের মা তুমি–
ও বলেছিল, সে সন্তান তো আমার একার নয় মাসিমা। সে তার বাপের, তার বংশের, তার পরিবারেব, তার সমাজের। এইটুকুই ছিল আমার একান্ত নিজের।
এই সব ব্যর্থ জীবনের কতটুকুই বা প্রকাশ হয়!
দিন চলে দিনের নিয়মে, ঋতুচক্র আবর্তিত হয় চিরন্তন ধারায়, জাগতিক কাজকর্মগুলিও চলে অনাহত গতিতে।
