স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়েই তো চেষ্টা করছে। কিন্তু একটা জীবনে-পোড়-খাওয়া শিশুর নিরুত্তাপ নির্লিপ্ততার স্পর্শে চেষ্টাটা হাস্যকরভাবে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসছে নিজের কাছে।
তখন পারুলের ওই ছোট ছেলেটার কাছে নিজের বাচালতার জন্যে লজ্জা করছে, লজ্জা করছে কৃত্রিমতার জন্যে। মনে হচ্ছে, পারুল বুঝি এতক্ষণ ভাড়ামি করল!…কিন্তু ওই ছেলেটা কি তার গভীর বেদনার ঘরের বন্ধ দরজাটা একটু খুলে ধরবে, যেখান দিয়ে পারুল পারবে। আস্তে আস্তে ঢুকে যেতে! সে ঘরে চুপ করে বসে থেকে ওর মনের বেদনার ভার নিতে পারবে পারুল!
তা দেবে না।
আশ্চর্য রকমের কঠিন হয়ে গেছে ছেলেটা।
অথবা নিজের ভিতরের সেই গভীর ক্ষতটাকে জগতের কাউকেই দেখাতে চায় না ও।
মনে মনে নিজের ছেলেকে উদ্দেশ করে বলে পারুল, তুই ভেবে সন্তোষ পাচ্ছিস, অন্ততঃ ছেলেটাকে তুই পেয়েছিস, কিন্তু পরে বুঝবি ওটাকেই তুই একেবারে হারিয়েছিস!
এখন আর নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে শুধু একটা শান্ত উপলব্ধির জগতের স্বাদ গ্রহণের সময় নেই, এখন সারাক্ষণ শুধু এই। এখন পারুল মৃদু হাসির সঙ্গে ভাবে জগতে কিছুই অমনি পাওয়া যায় না, সব কিছুর জন্যেই মূল্য দিতে হয়। আমাকে ওদের প্রয়োজন হচ্ছে এই পাওয়াটার জন্যে মূল্য ধরে দিতে হচ্ছে আমাকে, আমার সেই অনাহত অবকাশের গভীর স্বাদটিকে।
২৮. পারুলের অবকাশ গেছে
পারুলের অবকাশ গেছে বলে কি সেই আত্মমগ্নতায় ডুবে যাওয়া রোগটা তার বোনের ঘাড়ে এসে ভর করল?
বকুল তো কখনো এমন শুয়ে বসে অলসভাবে স্মৃতিচারণ করে না। বকুলের এত সময়ই বা কোথায়? বকুল তো কবে থেকেই অনামিকা দেবী নামের জামাটা গায়ে দিয়ে ছুটছে আর ছুটছে। বকুলকে পাঠকসমাজ এখনো ফেলে দেয়নি।
তবু বকুল জানে একদিন দেবে ফেলে, অনায়াসে ঠোঁট উল্টে বলবে, না বাবা, ওঁর লেখা আর পড়া যায় না! সেই মনস্তত্ত্বের তত্ত্ব নিয়ে কথার ফেনা আর ফেনানো! যেন মানুষ নামের জীবটার শুধু মনই আছে, রক্তমাংসের একটা দেহ নেই!
এ ধরনের মন্তব্য অন্যের সম্বন্ধে কানে এসেছে, অতএব বোঝা শক্ত নয়, অনামিকার সম্বন্ধেও এ মন্তব্য তোলা আছে। তখন শুধু সম্পাদকের খাতায় যে নিমন্ত্রণের তালিকা আছে, সেই তালিকার খাতিরেই মাঝে মাঝে এক একটা নিমন্ত্রণ পত্র আসবে, সামাজিক নিমন্ত্রণের মত। কারণ বিজ্ঞাপনদাতারা কতকৃগুলো নাম মুখস্থ করে রেখেছে, সেগুলোই তারা ভাল বোঝ। আধুনিক অতি-আধুনিকদের নাম মাথামোটা কারবারী লোকেদের কানে ঢুকতে দেরি হয়।
তখন সেই সামাজিক দায়ে লেখা ছাপা হলেও, পাঠক অনামিকা নামের ফর্মাটা উল্টে ফেলে চোখ ফেলবে অন্যত্র! প্রকাশকরা যাঁরা নাকি এখনো হাঁটাহাঁটি করছেন, তারা বইটা ছাপতে নিয়েও ফেলে রেখে উঠতি নামকরাদের বইগুলো আগে ছাপবেন।
এ হবেই। এ নিয়তি।
এ নিয়তি তো চোখের সামনেই কত দেখছেন অনামিকা দেবী। লাইব্রেরীতে যাঁর বই পড়তে পেতনা, লাইব্রেরীরা এখন তার বই কিনতে চায় না, পয়সাটা মিথ্যে আটকে রাখবে বলে। জনপ্রিয়র দেবতা তো জনগণ! তারা যদি একবার মুখ ফেরান, তাহলেই তো হয়ে গেল।
অনামিকা দেবীর দেবতা এখনো হয়তো বিমুখ হননি, কিন্তু হতে কতক্ষণ? অনামিকা চুপচাপ শুয়ে সেই দেবতাদের কথা চিন্তা করেন।
না, ভাগ্যের কাছে অকৃতজ্ঞ হবেন না তিনি। সামান্য সম্বল নিয়ে এই হাটে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, বিনিময়ে পেয়েছেন অগাধ অবিশ্বাস্য।
মন পূর্ণ হয়ে আছে কানায় কানায়। ওই ভালবাসার দানেই নিজের অক্ষমতার গ্লানি মুছে যায়, মনে হয় কী পেয়েছি আর না পেয়েছি তার হিসেব করতে বসে দুঃখ ডেকে এনে কী হবে? যা পেয়েছি তার হিসেব করার সাধ্য আমার নেই।
ভিড় করে আসে অনেক মুখ।
ভালবাসার মুখ।
ভিড় করে আসে নিজের সৃষ্ট চরিত্ররাও। এরা আর ছায়া নয়, মায়া নয়, বঞ্চনা নয়, আস্ত এক-একটা মানুষ।
অনামিকা জানেন, প্রকৃতপক্ষে ওরা অনামিকার সৃষ্টিও নয়। ওরা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টি করেছে! ওদের নিজস্ব সত্তা আছে, ওরা নিজের গতিতে চলে। অনামিকাই ওদের নিয়ন্তা এমন ভুল ধারণা অনামিকার নেই।
হয়তো অনামিকার পরিচিত জগতের কারো কারো ছায়ার মধ্যে থেকে তারা বিকশিত হয়ে ওঠে, কলম তার অনুসরণ করে চলে মাত্র। অনামিকার ভূমিক: ষ্টার নয়, দর্শকের।
তিনি যে শুধু এই সমাজকেই দেখে চলেছেন তা নয়, তার রচিত চরিত্রদেরও দর্শক তিনি।
তাই পারুলের অভিযোগে অক্ষমতা জানিয়ে চিঠি লেখেন অনামিকা, বকুল নিজে এসে ধরা না দিলে বকুলের কথা লেখা হবে না সেজদি। সে আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। হয়তো কোনদিনই তার কথা লেখা হবে না, কারণ বকুল বড় মুখচোরা, বড় কুণ্ঠিত। নিজেকে প্রকাশ করতে সে লজ্জায় মারা যায়।
অনামিকার ভক্ত পাঠককুলের এখন আর অজানা নেই অনামিকা বকুলের ছদ্মবেশের নাম, তাই তারা অনামিকার রচিত চরিত্রদের মধ্যে থেকে বকুলকে খুঁজে বেড়ায়, আগ্রহে উদ্ভাসিত মুখে প্রশ্ন করে, এর মধ্যে কে বকুল?
অনামিকা মৃদু হেসে বলেন, জানি না ভাই। আমিও তো সে বকুলকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
কিন্তু অনামিকা কি শুধু বকুলকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন? আবাল্যের এই সাধনায় আরো একটা জিনিস কি খুঁজে বেড়াচ্ছেন না? খুঁজে বেড়াচ্ছেন না কেন এই তার জানা জগতের সমাজে আর জীবনে এত বেদনা, এত অবিচার, এত নিরুপায়তা?
