এর মধ্যে কোন্ ফাটল দিয়ে ঢুকবে পারুল? আশ্চর্য সংযম ওইটুকু ছেলের!
এমন সাবধানে কথা বলে, যেন ওর ‘অতীত’ বলে কিছু নেই, কিছু ছিল না। ও যেন কেবলমাত্রই এই চন্দননগরের পারুলের ‘বুড়ো’।
মা বাপ বোন, কি নিজের হারিয়ে ফেলা জীবনের কোন কথার ছন্দাংশও অসতর্কে কোনো সময় বেরিয়ে পড়ে না বুড়োর মুখ দিয়ে।
বুড়ো যেন ভূঁইফোড়।
পারল হয়তো অন্যমনস্কের বশে কোনোদিন বলে বসে, এ সময় তুই কী খেতিস? ছুটির দুপুরে তুই কি করতিস?
বুড়ো অবলীলায় বলে, মনে নেই।
পারুল বলে, বুড়ো, তোর বাবার চিঠি এসেছে। তোর আর আমার একটা খামের মধ্যে, আয় আমরা দুজনে দুটো চিঠি লিখে খামে পুরে পাঠাই। আমারটা লিখছি–তোরটা লেখ।
এইভাবে ছড়িয়ে গুছিয়ে বলে। তবু বুড়ো অম্লানমুখে বলে, তুমি তো সব খবরই লিখেছ-
ওমা! আমি লিখছি আমার ছেলেকে, আর তুই লিখবি তোর বাবাকে, দুটো বুঝি এক হল? আয় আয়, তাড়াতাড়ি পড়ে ফেলে উত্তরটা লিখে ফেল, ডাকের সময় চলে যাবে।
বুড়ো আসেও না, চিঠি লেখা তো দূরের কথা, পড়েও না। হাতেই নেয় না, বলে, এখন লিখতে ইচ্ছে করছে না, তুমি পাঠিয়ে দাও।
বলে, এখন অঙ্ক কষছি, পরে পড়ব।
পারুল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
পারুলের ওর আগের চেহারাটা মনে পড়ে যায়।
আগে আগে দু-একদিনের জন্যে বাপ-মার সঙ্গে বেড়াতে আসত, ‘বাপী বাপী’ করে কী বায়নাই করত!
বাপী, আমায় এক্ষুনি বেড়াতে নিয়ে চল। বাপী, আমি এক্ষুনি নৌকো চেপে গঙ্গায় ভাসবো। বাপী, তুমি যে বলেছিলে–একটা তিনকোণা এরোপ্লেন কিনে দেবে, এক্ষুনি দাও।
বাপী বাপী বাপী!
বাপীর জীবন মহানিশা করে তুলত, গলা ধরে ঝুলে পড়ে, পিঠের ওপর লাফিয়ে চড়ে বসে।
বাপী যদি বলত, এখন গঙ্গায় জোয়ার, এখন নৌকোয় চড়ে না।
অবলীলায় বলত, মেরে হাড় ভেঙে দেব তোমার!
‘মা-মণি’ সম্পর্কে অবশ্য একটু সমীহ ভাব ছিল। এমন কথা মাকে বলতে সাহস করত না। মা বলত, নিজের মান নিজে রাখতে জানে না, তাই ছেলের অতো সাহস!
তবু মা-মণি-অন্ত প্রাণও তো ছিল।
আর ছোট্ট সেই বোনটার ওপর? আহা, একেবারে সাতখানা প্রাণ বোনের গুণপনায়, বোনের বোকামিতে আহ্লাদে বিগলিত।
পারুলকে ডেকে ডেকে উচ্ছ্বসিত সেই মন্তব্য মনে পড়ে যায় পারুলের।
দিদি দিদি, শোন! লিলিফুলটা এমন না বোকা! টফিটা ফেলে দিয়ে কাগজটাই খেতে লেগে গেছে।
দিদি দিদি, লিলিফুলটার বড় হবার কী দারুণ শখ দেখ, নিজের জুতো ফেলে রেখে বাপীর জুতো পরে বেড়াচ্ছে–
উচ্ছ্বসিত কলকণ্ঠ।
যে দু-তিনটে দিন থাকত, মুখর করে রাখত গঙ্গাতীরের এই নিস্তরঙ্গ বাড়িখানা।
সেই ছেলেটাই!
সেই ছেলেটাই এ বাড়ির মৌন দেয়ালগুলোকে যেন ডবল ভারী করে তুলেছে। কেউ নেই, কেউ কথা বলার নেই, সে একরকমের শান্ত স্তব্ধতা, কিন্তু একজন আছে, যাব হঠাৎ হঠাৎ বাঁশীর মত বেজে ওঠার কথা, ঝর্ণার মত কলকলিয়ে ওঠবার কথা, সে যদি নিথর হয়ে থাকে, সে স্তব্ধতায় দম আটকে আসে।
পৃথিবীর তিক্ত অভিজ্ঞতায় বুড়িয়ে যাওয়া একটা শিশুর ভার যে কত গুরুভার, সেটা অহরহ অনুভব করছে পারুল। অনুভব করতে পারছে ওই স্তব্ধতার অন্তরালে কী যন্ত্রণার ঝড় বইছে।
এই তো ছিল গৌরবের উচ্চ রাজাসনে, হঠাৎ নেমে আসতে হল রিক্ত নিঃস্ব এক অগেীরবের রুক্ষ ভূমিতে। সেখানে কোথাও কোনোখানে স্নেহ নেই, মমতা নেই, ত্যাগ নেই।
না, ওদের জন্যে কেউ ত্যাগস্বীকারে রাজী নয়। ওরা গুঁড়ো হয়ে যাক, ওদের ওপরওয়ালা অটল থাকবে আপন হৃদয়সমস্যা নিয়ে।
পারুল মনে মনে বলে, সব যুগেরই বলি আছে, তোরাই এ যুগের বলি। আমাদের অন্ধকার যুগে আমরা ছিলাম অন্ধ কুসংস্কারের বলি, আর এই আলোর যুগে তোরা হচ্ছিস সভ্যতার বলি।
তবু চেষ্টা করে পারুল।
ডাক দেয়, বুড়ো আয়, বুড়ীর মাথার পাকা চুল তুলে দে
বুড়ো বই হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ায়। অহরহ হাতে বই। গল্পের বই নয়, পড়ার বই।
ওই বই-খাতাই যেন তার আত্মরক্ষার অস্ত্র।
যেন তলোয়ারের মুখে ঢাল। ডাকলে সব সময় বই নিয়ে এসে দাঁড়ায়।
এসে বলে, তোমার তো পাকা চুল নেই
আছে রে আছে। ভেতরে আছে, খুঁজে দেয়।
বুড়ো নির্লিপ্তভাবে বলে, ও তো কেউ দেখতে পাচ্ছে না। বলে চলে যায়।
পারুল ডাকে, বুড়ো আয়, একটা ফার্স্ট ক্লাস খাবার করছি, চটপট চলে আয়—
বুড়ো এঘর থেকে বলে, আমার এখন খিদে পায়নি।
আরে বাবা, তুই আয়ই না, দেখলেই খিদে পেয়ে যাবে! এমন জিনিস, তুই নামই শুনিসনি
নিতান্ত অনিচ্ছুক মূর্তিতে এসে দাঁড়ায় ছেলেটা।
পারুল অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়ে বলে, বল তো এগুলো কী?
নাতি ভাববার চেষ্টামাত্র না করে মাথা নেড়ে বলে, জানি না।
জানবি কোথা থেকে? এসব হল সেকেলে জিনিস। আমার শাশুড়ী বানাতেন। তোর বাবা বলত, ঠাকুমা, রোজ রোজ কেন বকুল-পিঠে কর না? আসলে এর নাম হচ্ছে গোকুল পিঠে, বুঝলি? তোর বাবা বুঝতে না পেরে বলত “বকুল-পিঠে”। এদিকে ওর মাসির নাম, মানে আমার বোনের নাম তো বকুল, তাই তোদের যিনি দাদু ছিলেন, তিনি বলতেন, তার চেয়ে বল না কেন মাসি-পিঠে?
হি হি করে হাসতে হাসতে রস থেকে প্লেটে তুলে এগিয়ে ধরে পারুল।
কিন্তু ছেলেটা পারুলের মত চেষ্টাকৃত কৌতুকের আয়োজন ব্যর্থ করে দিয়ে নিস্তেজ গলায় বলে, পরে খাবো।
আর কী করবে পারুল? আর কী করতে পারে?
