একটি সহকর্মীর বিয়োগ একটি বড় শিক্ষা। নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া যায় তা থেকে। অভিযোগের কিছু নেই, ধূলির প্রাপ্য খাজনা তো ধূলিকেই দিতে হয়।
সব কথার মাঝখানে কেমন করে যেন শম্পার কথা মনে এসে যায়, সব চিন্তার মধ্যে শম্পার মুখ!
ইচ্ছে হল খুব চেঁচিয়ে, শম্পা যেখানে আছে যেন তার কানে যায়, অমনি জোরে চেঁচিয়ে বলেন, শম্পা, আমি তোদের যুগকে আর কিছু জানি না জানি, জেনে ফেলেছি তোদের এই যুগ বড় নিষ্ঠুর। এই পরিচয়টাই বোধ হয় তার সব থেকে স্পষ্ট পরিচয়।
ইচ্ছে হচ্ছে চুপ করে একটু বসে থাকতে, কিন্তু সময় কই? ওই ভস্মলোচন-টাই উল্টে দেখে নিতে থাকেন খানিক খানিক।
২৭. বকুলের প্রকৃতিতে পারুলের মত
বকুলের প্রকৃতিতে পারুলের মত নিজের মধ্যে ডুবে, গভীরে তলিয়ে যাওয়ার সুখ নেই। বকুলের সে সময়ও নেই। বকুল বর্তমানের স্রোতের ধাক্কায় ছুটেই মলো জীবনভোর।
পারুলের কথা আলাদা।
পারুল চিরদিনই আত্মমগ্ন। এখন তো আরো বেশী হয়েছে। পারুলের চোখের সামনে গঙ্গার অফুরন্ত তরঙ্গ। পারুলের জীবনটা নিস্তরঙ্গ। সেই নিস্তব জীবনের মাঝখানে আচমকা একটা বড় ঢিল পড়ার মত তরঙ্গ তুলেছিল শম্পা নামের মেয়েটা, পারুলেরও যে এখনো কারো জন্যে কিছু করবার আছে, পারুল এখনো কারো প্রয়োজনে লাগতে পারে এ স্বাদ এনে দিয়েছিল, কিন্তু সেও তো মিলিয়ে গেল ক্ষণিক বুদবুদের মত।
আমাকে আর কারো কোনো দরকার নেই। এই এক শ্মশানের শান্তি নিয়ে আবার থিতিয়ে বসেছিল পারুল, আবার এক তরঙ্গ এলো তার জীবনে।
পারুলের ছেলে তার ছেলেকে রেখে গেল মায়ের কাছে। তার সমারোহময় জীবনে মার প্রয়োজন ফুরিয়েছিল, রসুনচৌকি থেমে যাওয়া বিধ্বস্ত জীবনে আবার এলো সেই প্রয়োজন।
পারুল বলেছিল, ও কি একা এই বুড়ীর কাছে থাকতে পারবে?
ছেলে বলেছিল, পারা অভ্যাস করতে হবে। তা নইলেই তো বোর্ডিঙের জীবন? সেটা আমি চাইছি না–
হ্যাঁ, পারুলের ছেলে এখন আর চাইছে না ছেলেকে কনভেন্টে রেখে ‘সভ্যভাবে’ মানুষ করতে। অথচ কিছুদিন আগেও সে চাহিদা ছিল তার। আর একটু বড় হলেই কোথাও পাঠিয়ে দেবার বাসনা এবং চেষ্টা ছিল। হঠাৎ মন ঘুরে গেছে তার, সে ‘প্রাচীন কালে’র আদর্শে আর সনাতনী পদ্ধতিতে ছেলেকে মানুষ করতে চায়। অতএব মার কাছেই শ্রেয়। প্রথম দিন এর জন্যে ছেলেকে বকেছিল পারুল, বলেছিল, ছেলে-মেয়ে কি তোদের হাতের বল যে নিজেদের যখন যেমন মতিগতি হবে, তখন ওদের গতিও তাই হবে? এই কদিন আগেও তুই ওকে বলেছিলি, তুই সাহেব হ! আজ বলছিস, তুই সনাতনী হ! ছেলেমানুষ এ ধাক্কা সামলাতে পারবে কেন?
ছেলে বলেছিল, জীবনে আরও অনেক বড় ধাক্কা আসতে পারে মা, এটা ধরো সেটা সইবার ক্ষমতা-অর্জনের প্রস্তুতি।
তা আমার কাছে যে দিচ্ছিস, আমাকে কি তোর খুব সনাতনী মনে হয়? আমি তো একটা সর্বসংস্কারবর্জিত কালাপাহাড়।
ছেলে মার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেছিল, তবু তো খাঁটি! নির্ভেজাল কালাপাহাড়! ভেজাল দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি মা!
তবে দিয়ে যা ছেলেকে। তবে গ্যারান্টি দিতে পারব না বাপু, তোমার ছেলেকে তোমার মনের মত গড়ে তুলতে পারব কিনা। তুই আমাকে যা ভাবছিস, আমি সত্যি তাই কিনা, তাতে আমার নিজেরই ঘোরতর সন্দেহ আছে।
তোমার থাকে থাক, আমার নেই। বলে চলে গিয়েছিল ছেলে।
পারুলের বড় একটা যা হয় না তাই হয়েছিল। পারুলের চোখে জল এসে গিয়েছিল। আমায় কেউ বুঝতে পারল, আমায় সেই বোঝার মধ্য দিয়ে সে বিশ্বাস করল, এর থেকে আহ্লাদের কি আছে? আর সে স্বীকৃতি যদি আপন সন্তানের কাছ থেকে আসে, তার থেকে মূল্যবান বুঝি কিছু নেই।
তা স্বয়ং ভগবানই নাকি ওই স্বীকৃতির কাঙাল, তিনিও তার গঠিত সন্তানদের কাছে ভিক্ষাপাত্র পেতে ধরে বলেছেন, তুই আমায় বোঝ, আমায় জান্। আমি যে কী তা একবার উপলব্ধি কর। তবে? মানুষ কোন্ ছার!
.
কিন্তু ছেলের এই ছেলেটাকে নিয়ে মুশকিলেই আছে পারুল। এত গম্ভীর হয়ে গেছে সে, যেন পাথর কী কাঠ! ওর কোনখানটা দিয়ে যে একটু ঢুকে পড়ে মনটা ছুঁতে পারবে, বুঝতে পারে না।
গল্প বলে, ছড়া শিখোবার চেষ্টা করে নিজেদের ছেলেবেলার কাহিনী শুনিয়ে, ওরই বাবার ছোটবেলার দুষ্টুমির আর বায়না আবদারের বিশদ বর্ণনা করে ওই গাম্ভীর্যের পাষাণপ্রাচীরে এতটুকু ফাটল ধরাতে পারছে না পারুল।
একেবারে যে হাসে না তা নয়, হাসির গল্প শুনে একটু হাসে। সদ্য শোকগ্রস্ত মলিনচিত্ত মানুষ শিশুর হাসিখেলা দেখলে যেমন একটু প্রাণহীন হাসি হাসে তেমন হাসি। যেন পারুল যে ওর জন্যে এতটা চেষ্টা করছে, সেটা বুঝে একবিন্দু কৃতজ্ঞতার কুণ্ঠিত হাসি।
পারুল বলে, তুই একটা বুড়ো! পুরো বুড়ো! তোর যত ভাল আর শৌখিন নামই থাকুক, আমি তোকে “বুড়ো” বলে ডাকবো, এই আমার সঙ্কল্প।
বুড়ো একটু বুড়োটে হাসি হেসে বলে, তা ডাক না। ভালই তো।
পারুল রাগ দেখিয়ে বলে, আচ্ছা, তুই এমন নিক্তিমাপা হাসি হাসতে শিখলি কোথা থেকে বল তো? আমাদের ছেলেবেলায় আমাদের জোরে জোরে হাসিটা ছিল মহা দোষের, হেসে উঠলেই ধমক। তবু আমরা হেসে উঠতাম। আর তুই বাবা কেমন মেপে মেপে হাসি অভ্যেস করেছিস!
বুড়ো তার উত্তরে আরো শীর্ণ হাসি হেসে বলে, আমি তো খুব হাসি।
