তবে কি সত্যিই কলম বন্ধের সময় এসেছে? বিধাতার অমোঘ নির্দেশ–আসছে ছদ্মনামীর ছদ্মবেশে। ছেলেবেলায় ছেলেখেলার বশে কলমটা হাতে নিলেও, কোথাও কোনোখানে বুঝি একটা অঙ্গীকার পালনের দায় ছিল, ছিল কোনো একটা বক্তব্য, সে অঙ্গীকার কি পালন করতে পেরেছেন অনামিকা? পাঠক-হৃদয়ে পেশ করতে পেরেছেন সেই বক্তব্য?
নাকি সেগুলো পড়ে আছে ভাড়ার ঘরের তালাবন্ধ ভারী সিন্দুকের ভিতর, অনামিকা শুধু আপাতের পসরা সাজিয়ে জনপ্রিয়তার হাটে বেচাকেনার ঝুলি নিঃশেষিত করছেন?
কিন্তু বক্তব্য কি শুধু পুঁজিতেই থাকে?
দিনে দিনে জমে ওঠে না সে?
আপাতের পসরায় সাজানো হয় না তাকে?
যখন শম্পা ছিল, মাঝেমাঝেই বলতো, তুমি ওই সব পিতামহী প্রপিতামহীদের গল্প রেখে দিয়ে আমাদের নিয়ে গল্প লেখো দিকিন? স্রেফ এই আমাদের নিয়ে। আমরা যারা একেবারে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে চরে বেড়াচ্ছি। নিজের চিন্তাভাবনা নিয়ে যাকে বলে তোমার গিয়ে উদ্বেলিত হচ্ছি, নিজেদের ভয়ঙ্ক ভয়ঙ্কর উৎকট জালা-যন্ত্রণা নিয়ে ছটফটাচ্ছি।
অনামিকা তখন হেসে বলেছিলেন, ও বাবা, তোদের আমি চিনি? শম্পা পা দোলাতে দোলাতে বলেছিল, চিনতে হবে। এড়িয়ে গেলে চলবে না। শম্পার কথাটা মনে পড়তেই একটা কথা মনে পড়ল।
কতদিন যেন চলে গেছে শম্পা।
অনামিকা বলবার সুযোগ পেলেন না, তবে এ যুগের পরম প্রতীক তোকে নিয়েই হাত পাকাই আয়।
সেদিন একটা আলোচনা-সভায় আধুনিক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে বসে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই একটি উদ্ধত তরুণ সভানেত্রীকে উদ্দেশ করে বলে উঠলো, এখনকার যুগকে নিয়ে আপনি লিখতে চেষ্টা করবেন না মাসীমা। ওটা আপনার এলাকা নয়। এ যুগের ছেলেমেয়েরা হচ্ছে বারুদের বস্তা, বুঝলেন? তারা অসভ্য উদ্ধত বেয়াড়া, কিন্তু ভেজাল নয়। তারা সৎ এবং খাঁটি।
অনামিকা ভেবেছিলেন, এইখান থেকেই কি আমি এ যুগকে চেনা শুরু করবো? নাকি ওই অসভ্যতা অভব্যতা ঔদ্ধত্য বেয়াড়ামিটাও একটা চোখ-ধাঁধানো মেকী জিনিস? যাতে ওদের নিজেদেরও চোখ বেঁধে আছে?
ছেলেরা আরো বললো, আপনি জানেন আমরা এ যুগের ছেলেরা কোন ভাষায় কথা বলি? আপনাদের ওই রঙিন পাখির সোনালী পালক-গাঁজা সুসভ্য ভাষা নয়। যে পোশাক পালিশ ছাড়া নগ্ন ভাষা, বুঝলেন? ধারণা আছে আপনার এ সম্বন্ধে? গিয়ে বসেছেন কোনো দিন আমাদের মধ্যে?
সভানেত্রী হেসে বলেছিলেন, লেখকদের আর একটা চোখ থাকে জানোতা? কাজেই তোমাদের আড্ডায় গিয়ে না বসলেও, ধারণা হয়তো আছে। কিন্তু ওই তোমাদের পোশাক ছাড়াটাড়াগুলো নিজের হাতে লেখবার ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না।
তবে? ছেলেটা বিজয়গর্বে বলেছিল, সেইজনেই বলছি–এটা আপনার এলাকা নয়। না বুঝে বারুদে হাত দিতে যাবেন না।
এরাই ডেকে নিয়ে গেছে সভানেত্রীকে, ফুলের মালাটালাও দিয়েছে। অতএব হাসতেই হবে। হাসতে হয় ‘অমৃতং বালভাষিতং’ নীতিতে।
তবু প্রশ্ন উঠছে মনে।
এরাই কি সব?
এদের নিয়েই কি যুগের বিচার?
শম্পাটার ওপর মাঝে মাঝেই ভারী রাগ হয়। সেদিনও হয়েছিল। শম্পাটা থাকলে ডেকে বলতে পারতেন, ওহে, বারুদের বস্তার তুমিও তো একটি নমুনা? এখন বল দেখি এ বারুদ তোমরা আত্মরক্ষার কাছে লাগাবে, না আত্মধ্বংসের কাজে?
কি যে করছে কোথায় বসে কে জানে! ভাবতে ভাবতে আবার নিজের দিকে ফিরে তাকালেন।
নাঃ, সত্যিই হয়তো এবার কলমকে ছুটি দেবার সময় এসেছে, সত্যিই হয়তো ফুরিয়ে এসেছেন তিনি।
ভাবলেন, নাহলে লিখে আর সেই আনন্দবোধ নেই কেন? কেন মনে হয় রাজমিস্ত্রীর ইটের পর ইট সাজানোর মতো এ কেবল শব্দের পর শব্দ গেঁথে চলেছি?
ঘরের পূর্ব দেয়ালে একটা বুককেসে অনামিকার বইয়ের এক কপি করে রাখা আছে। আছে শম্পারই প্রচেষ্টায়। অবিশ্যি প্রথম দিকের বইগুলো সব নেই। দেখে রেগে গিয়েছিল শম্পা, এ কী অবহেলা? একটা করে কপিও রাখবে তো?
অনামিকা হেসে বলেছিলেন, তুই যে তখন জন্মাসনি, বুদ্ধি দেবার কেউ ছিল না
তবু ওর চেষ্টাতেই অনেকগুলো হয়েছে।
সেইগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলেন অনামিকা, এও ওজন হিসেবে কম নয়। কিন্তু অনামিকর হঠাৎ মনে হল, সবই বৃথা কথার মালা গাঁথা। যে অঙ্গীকার ছিল, তা পালন করা হয়নি। করবার ক্ষমতা হয়নি। যে কথা বলবার বিনা তা বলা হয়নি।
আবার একটু হাসি পেলো।
যা পেরেছি, আর যা পারিনি, কিছুই তো দাঁড়িয়ে থাকবে না। এ যুগ দ্রুতগতির যুগ, তাই মুহূর্তে সব সাফ করে ফেলে। পরক্ষণেই ভুলে যায়।
অধ্যাপক সাহিত্যিক অমলেন্দু ঘটকের কথা মনে পড়লো।
ক্লাসে পড়াতে পড়াতে হার্ট-অ্যাটাকে মারা গেলেন, ক’দিনেরই বা কী সেটা? মৃত্যুর সদ্য আঘাতের মুখে মনে হয়েছিল, দেশ কোনোদিনই বুঝি এ ক্ষতি সামলাতে পারবে না। ভেঙে পড়েছিল দেশ, ভেঙে পড়েছিল দেশের মানুষ।
কতো ফুল, কতো মালা, কতো শোকসভা! কতো শোকপ্রস্তাব! আশ্চর্য, এই বছরখানেকের মধ্যেই যেন দেশ অমলেন্দু ঘটকের নামটা পর্যন্ত বিস্মৃত হয়ে গেছে!
আর স্মৃতিরক্ষা কমিটি? সে যেন ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
অথচ নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে কী গভীর মূল্যবোধ ছিল অমলেন্দু ঘটকের। অমরত্বের স্বপ্ন ছিল তার মনে।
অমলেন্দু ঘটককেই যদি লোকে মাত্র তিনশো পঁয়ষট্টিটা দিনের মধ্যেই ভুলে যেতে পারলো, অনামিকাকে দুটো দিন মনে রাখবারই বা দায় কার?
