অবশ্য সব সমালোচনাই যে তাদের ব্যাকুল করে তা নয়। সমালোচনার মধ্যে অনামিকা সাহিত্যকে ভূপাতিত করবার চেষ্টা অথবা নস্যাৎ করবার চেষ্টা দেখলেই তাদের বন্ধু-হৃদয়। ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
বাংলার বাইরে অবস্থিত বন্ধুরাও অনেক সময় ডাকব্যয় খরচা করে করে এই মহৎ বন্ধুকৃত্য করে থাকেন। মহৎ ইচ্ছাই সন্দেহ নেই। অনামিকাকে কে কি বলছে, তার রচনা সম্পর্কে কার ক ধারণা, এটা অনামিকার জানা দরকার বৈকি। নইলে ভুল সংশোধনের চেষ্টা আসাবে কী করে?
অনামিকার দৃষ্টিভঙ্গী অবশ্য (বন্ধুকৃত্য সম্পর্কে) আলাদা, তার কোনো বন্ধু সম্পর্কে বিরূপ কোনো সমালোচনা দেখলে তিনি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন, আহা ওর চোখে যেন পড়ে। সভাসমক্ষে সে প্রসঙ্গ উঠলে স্রেফ মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে বলেন, কই, দেখিনি তো? পড়িনি তো! পত্রিকাগুলো জানেন, বাড়ি ঢুকতে-না-ঢুকতেই বাড়ির বাইরে বেড়াতে চলে যায়।
যাক, সকলের দৃষ্টিভঙ্গী তো সমান নয়।
পত্রিকার নাম ভস্মলোচন।
নামটার মৌলিকত্ব আছে।
অনামিকা দেবী দেখলেন, জনৈক ছদ্মনামী সমালোচক রীতিমত উষ্ণ হয়ে লিখছেন যারা ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে বাংলা-সাহিত্যের হাটের মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, পত্রিকা সম্পাদকদেরই উচিত তাদের বয়কট করা। তাদের এই লোভ ও নির্লজ্জতার প্রশ্রয়দাতা পত্রিকা-সম্পাদকদের কাছে আমার নিবেদন, তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নামের মোহ ত্যাগ করে তারা সাহিত্যের হাটে নতুন মুখ ডেকে আনুন। প্রতিষ্ঠার অহঙ্কারে ওই নামী রে যে কী রাবিশ পরিবেশন করছেন তা সম্পাদকদের অনুধাবন করে দেখতে অনুরোধ করি।
এই যে বর্তমান সংখ্যা বেণুমর্মরে শ্ৰীমতী অনামিকা দেবীর একটি ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে, কী এটি? এর কোন মাথামুণ্ডু আছে? কোনো যুক্তি আছে? নায়ক কেন অমন অদ্ভুত আচরণ করে বসলো–তার কোনো ব্যাখ্যা আছে? যা খুশি চালাবার অধিকার লাভ করলেই কি সেই অধিকারের অপব্যবহার করতে হয়? আগে শ্রীমতী অনামিকার লেখা যে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, যে মননশীলতা দেখা যেতো, আজ আর তার চিহ্ন চোখে পড়ে না।
আসল কথা–তেল ফুরোবার আগেই আলো নিভিয়ে দেবার শিক্ষা এঁরা লাভ করেন। অনামিকা দেবী প্রমুখ বর্তমানের কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের নাম করে ভদ্রলোক বলেছে, এক সময়কার পাঠক এঁদেরকে নিয়েছিল, তখন এঁরা যথেষ্ট যশ-খ্যাতি এবং অর্থ অর্জন করেছিলেন, আজ এঁদের যশ নির্বাপিত, খ্যাতি বিলুপ্ত, তবু ওই শেষ বস্তুাড ই দেহে ঘাঁটি আগলে পড়ে না থেকে আসর ছেড়ে বিদায় নেবার সভ্যতা শেখাচ্ছেন না। ওঁদের জন্যই তরুণদের কাছে সুযোগের দরজা বন্ধ, দরজার মুখে ওঁদেরই ভিড়।
ভাষাটি জ্বালাময়ী সন্দেহ নেই। আর তাজা রক্ত সন্দেহ নেই।
অনামিকা দেবী একটু হেসে কাগজখানা সরিয়ে রেখে ওই ছদ্মনামী সমালোচকের উদ্দেশে মনে মনে বললেন, ওহে বাপু, তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে সাহিত্যের হাটে এসে পড়া এইসব লেখকগোষ্ঠী যখন হাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল, পূর্বতন প্রতিষ্ঠিতেরা কি বিবেক তাড়িত হয়ে অথবা সভ্যতাতাড়িত হয়ে এদের জন্যে আসন ছেড়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন? বলেছিলেন কি–এসো বৎস, এই নাও আমার ছত্রমুকুট, এখন থেকে তোমাদের দিন!
আস্তে আস্তে হাসিটা মিলিয়ে গেল।
ভাবলেন, কিন্তু অভিযোগটার মূলে কি ভিত্তি নেই? সত্যিই কি প্রথম জীবনের মতো সময় দিতে পারছেন তিনি? সময়ের কল্যাণেই না লেখার মননশীলতা, নিখুত নিপুণতা, সূক্ষ্মতা, চারুতা? ছুটতে ছুটতে কি শিল্পকর্ম নিটোল হয়ে উঠতে পারে?
নিজের ইদানীংকালের লেখায় নিজেই তো লক্ষ্য করেছেন অনামিকা, বড় বেশী দ্রুত ভঙ্গীর ছাপ। লেখাটা হাতছাড়া করে দিয়ে মনে হয়, হয়তো আর একটু মাজা-ঘষার দরকার ছিল।
কিন্তু সেই দরকারের সময় দিচ্ছে কে?
অজস্র পত্রপত্রিকায় ভরা এই আসরে প্রায় প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে আরো পত্রিকা। এ যুগের তরুণদের প্রধান ‘হবি’ পত্রিকা প্রকাশ।…যেনতেন করে একখানা পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে। আর আশ্চর্য, সকলেরই দৃষ্টি এই তৈল ফুরিয়ে যাওয়া হতভাগ্য প্রতিষ্ঠিতদের দিকেই। প্রত্যাশা পূরণ না হলে তারা ব্যথিত হয়, ক্ষুব্ধ হয়, ক্রুদ্ধ হয়, অপমানিত হয়।
অতএব যাহোক কিছু দাও।
এই যাহোকের দাবী মেটাতে মেটাতে কলমও চালাক হয়ে উঠতে চায়। যাহোক দিয়েই সারতে চায়। চাওয়াটা অসঙ্গত নয়, সকলেরই একটা ক্লান্তি আছে।
তাছাড়া
কলমটা টেবিলে ঠুকতে ঠুকতে ভাবতে থাকেন অনামিকা দেবী, এ যুগের আমরা কী বিরাট একটা ঝড়ের সঙ্গে ছুটছি না? আমাদের কর্মে মর্মে জীবনে, জীবনযাত্রায়, আমাদের বিশ্বাসে, মূল্যবোধে, রাষ্ট্রচেতনায়, সমাজব্যবস্থায়, শিক্ষায়, সংস্কারে অহরহ লাগছে না ঝড়ের ধাক্কা? প্রতিমুহূর্তে আমরা আশান্বিত হচ্ছি আর আশাহত হচ্ছি। সোনার মূল্য দিয়ে সোনা কিনে হাতে তুলে দেখছি রাং। অভিভূত দৃষ্টি মেলে দেবতার দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ছে দেবতার পা কাদায় পোঁতা।
এই চোখ-ধাঁধানো ঝড়ের ধুলোর মাঝখানে উৎক্ষিপ্ত বিভ্রান্ত মন নিয়ে ছুটতে ছুটতে কোথায় বসে রচিত হবে আগের আদর্শের মননশীলতা?
এ যুগের পাঠকমনও তত দ্রুতগামী।
তবু নিজের সপক্ষের যুক্তিতে আমল দিতে চাইলেন না অনামিকা। বেদনার সঙ্গেই স্বীকার করলেন আগের মতো লেখার মধ্যে সেই ভালবাসার মনটি দিতে পারছেন না। যে ভালবাসার মনটি অনেক বাধা, অনেক প্রতিবন্ধকতা, অনেক দুঃখ পার করে করে বহন করে নিয়ে চলতো তার আত্মপ্রকাশের সাধনাকে।
