পিসি আস্তে জিজ্ঞেস করলো, বিয়েটা কি হয়ে গেছে শম্পা?
শম্পা মুখ তুলে হেসে বলে, অনুষ্ঠান-ফনুষ্ঠান যে কিছু হয়নি সে তো বুঝতেই পারছে পিসি, তবে এই একটা আইনের লেখালেখি। ওটা না করে উপায় কী বল? শুধু ওই তোমার গিয়ে ‘বিবাহের চেয়ে বড়ো’ জিনিসটার দাবি তো ইহসংসারে টেকে না। ওই লেখালেখির কাগজটুকু সঙ্গে না থাকলে তিষ্ঠোতে দেবে নাকি সংসার? একখানা মাঠকোঠার ঘরের সুখের ওপরও পুলিস লেলিয়ে দেবে। তাই হাসপাতালেই ওই কর্মটি সেরে নিয়ে আপন অধিকারবলে ওকে হাসপাতাল থেকে বার করে এনে সুখে-স্বচ্ছন্দে নিশ্চিন্ততায় আছি। তবে ওই যা বলেছিলে তুমি প্রথম নম্বরে-হতভাগা। হতভাগাই বটে। এখনো বলে কিনা, ওর কোনো মানে নেই। একটা আর মানুষের সঙ্গে একটা আধখানা মানুষের–ও, তুমি তো আমার সব কথা জানোও না, ওর বন্ধুর দলের কোনো এক পরম বন্ধু যে বোমা মেরে ওর পা দুখানা উড়িয়ে দিয়েছে বাকি জীবনটা চালাগাড়ি চড়ে বেড়াতে হবে হতভাগাকে-তা সেই কথাই বলে, একটা আস্ত মানুষের সঙ্গে একটা আধখানা মানুষের বিয়ে আইনসিদ্ধ নয়।…তাছাড়া আমি তখন প্রায় জ্ঞানশূন্য রোগী, অতএব তুমি আমায় ছেড়ে কেটে পড়ো।…শম্পা পিসির গায়ে মাথা রেখে নিজেকে এলিয়ে দিয়ে বলে, মুখটা বলে কিনা তোমার উপস্থিতি আমার অসহ্য!…বাংলাটা খুব ভালো শিখে ফেলেছে, বুঝলে?…বলে, আমায় শান্তিতে মরতে দাও! বোঝো! আমি হেন একখানা ভগবতীকে হাতের মুঠোয় পেয়েও নেয় না, বলে বিদেয় হও! শান্তিতে মরতে দাও! বুঝছো তো? শুধু হতভাগা নয়, হাড়-লক্ষ্মীছাড়া!
তারপর পিসি আরো কথা বলে।
বলে, সেজপিসিকেও তো একটা খবর দিতে পারতিস।
শম্পা অপরাধী-অপরাধী গলায় বলে, সত্যি খুব উচিত ছিলো। কী বলবো পিসি, মাথায় আর মাথা ছিল না। বোমা তো ওর পায়ে পড়েনি, পড়েছিল আমার মাথায়। জ্ঞানগম্যি ছিল না। উদ্ভ্রান্ত হয়ে কেবল ওকে কী করে বাঁচিয়ে তুলবো সেই চিন্তায়-ভাগ্যিস বংশীদাকে পেয়েছিলাম, তাই সেটা সম্ভব হলো।
পিসি বললো, বংশীদা কে?
শম্পা গভীর চোখে তাকালো পিসির দিকে, আস্তে বললো, বংশীদা কে বলে বোঝানো যাবে না পিসি, কিছুই বলা হবে না। দেখে বুঝবে। তুমি তো এক নজরেই বুঝবে।…হা, ওকে তো আনতেই হবে। তোমাদের কাছে যেদিন আশীর্বাদ নিতে আসবো, একা কি পারবো? বংশীদা ওকে বলে, তোর বন্ধুরা তোর পা দুটো উড়িয়ে না দিয়ে যদি মাথাটা উড়িয়ে দিতো, এর থেকে ভালো হতো! মাথাটায় তো গোবর ছাড়া কিছু নেই, ওটা থাকলেই বা কি, গেলেই বা কি! বোঝো কী মজার লোক।
হি হি করে হেসে ওঠে শম্পা!..
.
সত্যবান চমকে মাথা তুলে তাকায়, বলে, কী হলো? শুধু শুধু হঠাৎ হেসে উঠলে যে?
শম্পা শিথিল ভঙ্গী ত্যাগ করে সোজা হয়ে বসে বলে, পাগল-ছাগলরা তো তাই করে। কেউ শুধু শুধু হাসে, কেউ শুধু শুধু কাঁদে!
সত্যবান সেই একফালি আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে, শুধু শুধু কেউ কাঁদছে না।
শম্পা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, বংশীদা ভুল বলে। বলে, পাটার বদলে মাথাটা গেলে কম লোকসান হতো, গোবর ছাড়া তো কিছু নেই। দেখছি গোবর শুকিয়ে দিব্যি ঘুঁটে হয়ে উঠেছে! কথা ফেললেই কথা বুঝে ফেলতে পারছো! তবে আমি তো শুধু শুধু ছাড়া কারণ কিছু দেখছি না।
সত্যবান হতাশ গলায় বলে, আচ্ছা তুমি কি সহজ করে কথা বলতে জানাই না? না– বলবে না প্রতিজ্ঞা।
শম্পা মৃদু হেসে বলে, জানো পিসিও ঠিক এই কথাই বলতো। আমি উত্তর দিতাম, যদি খুব সহজ আর সাধারণ কথাই বলতাম শুধু, ভাল লাগতো তোমার? সেই উত্তরটাই তোমাকেও দিচ্ছি। না না, উত্তর তো নয়, প্রশ্ন–দাও এখন প্রশ্নটার উত্তর?
সত্যবান আস্তে মাথা নাড়ে।
দিতে পারবো না।
পারলে না তো? পিসি পারতো। বলত, দূর, পাগল হয়েছিস!
২৬. একখানা অনামী পত্রিকার পৃষ্ঠা
একখানা অনামী পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে দেখছিলেন অনামিকা দেবী। এ পত্রিকাটি কোনোদিন অনামিকা দেবীর দৃষ্টিগোচরে আসেনি, নামও শোনেন নি কখনো, এবং পত্রিকার চেহারা দেখে অন্ততঃ ওই না দেখা বা না-শোনার জন্য লোকশান-বোধ আসছে না।
তবু মন দিয়েই দেখছিলেন।
কারণ এখানি অনামিকা দেবীর একজন হিতৈষী বন্ধু নিজের–খরচায় কিনে পাঠিয়ে দিয়েছেন। হঠাৎ এমন একটা আজেবাজে পত্রিকা যত্ন করে পাঠিয়ে দেবার হেতু প্রথমটা বুঝতে পারেননি অনামিকা দেবী। যে অধ্যাপক বন্ধুটি পাঠিয়েছেন তার যে সাহিত্য রোগ আছে এমন সন্দেহ করবার কোন কারণ কোনোদিন ঘটেনি, কাজেই একথা ভাবলেন না–বোধ হয় ওনার কোনো লেখা ছাপা হয়েছে–
তবে?
যে ছেলেটিকে দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, অনামিকা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কিছু বলে দিয়েছেন নাকি? কিংবা কোনো চিঠিপত্র?
সে সবিনয়ে জানালো, না। তারপর আভূমি প্রণাম করে বিদায় নিলো।
বইটা খুলে দেখতে পেলেন অনামিকা দেবী, বন্ধুর যা বলবার বইয়ের ভিতরেই লিখে দিয়েছেন। সূচীপত্রের পৃষ্ঠার মাথায় লাল পেন্সিলে লেখা রয়েছে–২৩ পৃঃ দ্বিতীয় কলমটা লক্ষ্য করবেন। কী স্পর্ধা দেখুন!
অনামিকা একটু হেসে পাতা ওল্টালেন।
অনামিকা দেবীর অনেক ভক্ত পাঠক আছে, অনেক হিতৈষী বন্ধুও আছেন। ওঁরা এ ধরনের কাজ মাঝে মধ্যে করে থাকেন! অনামিকার লেখা সম্পর্কে কোথাও কোনো সমালোচনা দেখলেই তারা হয় টেলিফোনযোগে জানিয়ে দেন, নয় সেই কাগজখানাই পাঠিয়ে দেন। যদি উঃ সমালোচনা অনামিকার চোখ এড়িয়ে যায় বা তেমন খেয়াল না করেন, তাই তাদের এই ব্যাকুল প্রচেষ্টা।
