শান্তিতে মরতে দেবো? শম্পা গুছিয়ে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলে, দেখছে বংশীদা, কী “তুচ্ছ” জিনিসটিই চাইছেন বাবু! শান্তিতে মরা! ভারী সস্তা, না? বলি তুমি আমায় শান্তিতে মরতে দিলে?
আমি তোমায় বলেছিলাম, গোয়েন্দার মত আমার পিছু নিয়ে নিজে অশান্তিতে মরতে আর আমায় অশান্তিতে মারতে?
বংশী হেসে ওঠে, কে কাকে কী বলে জাম্বো? ইহ-পৃথিবীতে কে কাকে দিয়ে বলে-টলে কী করাতে পারে বল? যার ঘাড়ে যা চাপে, যে যার ঘাড়ে চাপে। যে মহীয়সী পেতনীটি তোর ঘাড়ে চেপে বসেছে, সে তোকে মরার পরেও ছাড়বে মনে করেছিস? হয়তো সাতজন্ম তোর পিছু পিছু ধাওয়া করে বেড়াবে!
বংশীদা আমায় পেতনী বললে?
আহা লক্ষ্য করিস তার আগে একটা উচ্চাঙ্গের বিশেষণ জুড়েছি!
সেটা আরো বিচ্ছিরি।
সত্যবান সামনের টুলটার ওপর একটা ঘুষি বসিয়ে বলে ওঠে, যার সবটাই বিচ্ছিরি, তার কোনখানটাকে আর ভালো বলবে? এই যে তুমি একটা প্রতিষ্ঠাপন্ন ঘরের মেয়ে, তোমার উচ্চবংশের মুখে চুনকালি লেপে বাবা-মার মাথা হেঁট করে দিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে আমার মতন একটা হাভাতে লক্ষ্মীছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে, এর মধ্যে কোনটা ভালো শুনি?
শম্পা ওর কথার মাঝখানে বাধা দেয়নি, শুধু কৌতুকের মুখে তাকিয়ে ছিল, এখন হেসে উঠে বলে, দেখছো বংশীদা, আমার হাওয়া লেগে লেগে জাম্বোবাবুর ভাষাজ্ঞানের কতটা উন্নতি হয়েছে। লক্ষ্য করেছো? প্রতিষ্ঠা-পননো, উচ্চ বংশ, আরো কী যেন একটা! নাঃ, আমার ক্যাপাসিটি স্বীকার করতেই হবে তোমায় বংশীদা!
বংশী সস্নেহে হেসে বলে, ছোঁড়াকে সর্বদা অতো জ্বালাস কেন বল্ দেখি শম্পু?
ওই! ওই! সত্যবান রেগে রেগে বলে, ওর নাম হচ্ছে ওর ভালোবাসা!
যাক, এতোদিনে তাহলে আমার স্বরূপ চিনলে? শম্পা আরো জোরে জোরে পা দোলাতে দোলাতে বলে, তাহলে আর বৃথা বিদ্রোহ করতে চেষ্টা কোরো না।
শম্পা! সত্যবান হতাশ গলায় বলে, সত্যিই আমি শান্তিতে মরতে চাই।
যে যা চায় তা যদি পেতো, তাহলে তো পৃথিবী স্বর্গ হয়ে যেতো হে মশাই! আমি তো একখানি চতুস্পদ জীব চেয়েছিলাম, পেয়েও ছিলাম, কপালক্রমে সে-ই দ্বিপদেই দাঁড়ালো। চারখানার দু-খানা গেল। তবেই বোঝো?
বংশী হেসে বলে, তোদের এ ঝগড়া তো সারাজীবনেও মিটবে না, চালা বসে বসে,–আমি তোর বাসন মাজবার জলটা তুলে এনে দিই। বংশী চলে যায়।
সত্যবান চড়া গলায় বলে ওঠে, কেন, জলই বা তুলে এনে দেওয়া হবে কেন? বস্তির ওই সব মেয়েদের মত টিপকলে গিয়ে কোঁদল করে করে বাসন মাজাটাই বা হয় না কেন?
শম্পা অম্লান গলায় বলে, ওই কোদলটা রপ্ত করবার সময় পাচ্ছি না যে! তোমার সঙ্গে কোঁদল করতে করতেই–
সত্যবান ওর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, সত্যি বলছি শম্পা, তোমার এই আত্মত্যাগ–না তা নয়–আত্মহত্যা, আমাকে যেন বেঁধে মারছে।
শম্পা হঠাৎ হাততালি দিয়ে বলে ওঠে,‘আচ্ছা! আরো দুটো বাড়লো। আত্মত্যাগ আত্মহত্যা!…নাঃ, আর কিছুদিনের মধ্যেই তোমাকে একখানি অভিধান করে তুলতে পারবো!…বংশীদা, ও বংশীদা, শুনে যাও!
সত্যবান আর কথা বলে না।
টুলটার ওপরই হাত জড়ো করে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকে।
শম্পা একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখে।
লোকটাকে যেন একটা ধ্বংসস্তূপের মত দেখতে লাগছে। শম্পা কি ব্যর্থ হবে? তাই কখনো হতে পারে? ওকে বাঁচাতেই হবে। তা ভিন্ন শম্পার বাঁচবার উপায় কি?
ওর আবেগকে প্রশমিত হতে দেবার জন্যে সময় দিতে শম্পা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। আর হঠাৎ একটা চিন্তায় যেন আশ্চর্য একটি কৌতুকের স্বাদ পায়। মাঠকোঠার বাখারি-ঘেরা বারান্দায় বসেও আকাশের রং তো সমানই নীল লাগছে!
ভাবতে গিয়েই পিসির ঘরের সামনের সেই ছাদের বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে পড়লো শম্পা। যেটাতে অনেকদিন দাঁড়ায়নি, যেটাকে সহজে কাছে আসতে দেয় না শম্পা, আসতে চাইলেই প্রায় হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে।
ছাদের বারান্দার সামনের আকাশটাও একই রকম নীল। ওই হালকা নীলটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শম্পা একটি প্রিয় পরিচিত কণ্ঠের ডাক শুনতে পায়, শম্পা! তুই। এতোদিন কোথায় ছিলি রে? আমরা তোকে খুঁজে খুঁজে
শম্পা ওই কণ্ঠের অধিকারিণীকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে, আমি যে হারিয়ে গিয়েছিলাম পিসি!
তারপর পিসি তার সুন্দর ছিমছাম ঘরটায় টেনে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসিয়ে বলে, বল তোর হারিয়ে যাওয়ার গল্প। হারিয়ে গিয়ে কোথায় গিয়ে পড়েছিলি?
শম্পা দুই হাত উল্টে বলে, হনলুলুও নয়, কামস্কাটকাও নয়, স্রেফ নিজের মধ্যেই হারিয়ে মরেছি, হারিয়ে বসে আছি। এ থেকে আর খুঁজে নিয়ে আসতে পারবে না আমায়।
পিসি আস্তে বলে, কিন্তু তোর মা? বাবা?
শম্পা মাথা নীচু করে বলে, পিসি, তোমরা তো সাবিত্রীর কাহিনী বলল, বেহুলার কাহিনী বলল, ওদের মা-বাবার কথা তো বলো না!
তবু তোকে এমন পাষাণ ভাবতে ইচ্ছে হয় না রে শম্পা!
শম্পা আস্তে বলে, পিসি, আমি তাদের কাছে এসে দাঁড়াবো, মাথা নীচু করে আশীর্বাদ চাইবো। বলবো, বাবা, স্বামীর সঙ্গে শত দুঃখবরণ এ তো এ দেশেরই গল্প। সাবিত্রী দময়ন্তী শৈব্যা সীতা চিন্তা দ্রৌপদী এঁদের গল্প তো তুমিই শুনিয়েছে ছেলেবেলায়, কিনে দিয়েছো এঁদেরই বই। আমার শুধু চেহারাটা আধুনিক, আমার শুধু কথাবার্তা এ যুগের, আমার শুধু গতিভঙ্গী বর্তমানের–আর কি তফাত আছে বল?
