কিন্তু বকুল কেন অপলক তাকিয়ে আছে?
বকুল কি মুখটা ফিরিয়ে নেওয়া যায় এ কথা ভুলে গেছে?
তাই বকুল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো, টপাস করে ট্রাক থেকে একটা ছেলে লাফিয়ে নেমে পড়ে অবোধচন্দ্রের প্রপৌত্রীকে দুহাতে ধরে উঁচু করে তুলে ধরলো, আর ট্রাকের উপর থেকে গোটা দুই ছেলে ঝুঁকে পড়ে বাগিয়ে তুলে নিলো তাকে।
বিরাট গর্জন করে গাড়িটা ছেড়ে গেল।
সমবেত কণ্ঠে একটা ইংরিজি গানের লাইন শুনতে পাওয়া গেল। বাজল সুর।
সেই সুরটা অনেকক্ষণ পর্যন্ত শুনতে পেলো বকুল।
কিন্তু সেই সুরে কি একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল বকুল? তাই অনড় হয়ে বসেই রইলো?
বকুলের মা একদা বিধাতার কাছে মাথা কুটে এই হতভাগা দেশের মেয়েদের বন্ধনগ্রস্ত জীবনের মুক্তি চেয়েছিল। চেয়েছিল তার মা-ও, সেই প্রার্থনার বর কি এই রূপ নিয়ে দেখা দিচ্ছে?
এই মুক্তিই কি চেয়েছিল তারা?
তাদেরই ঘরের মেয়ের এই স্বচ্ছন্দবিহারের বিকাশ দেখে স্বর্গ থেকে পুলকিত হচ্ছে তারা?
বকুল একটু আগেও ভাবছিল ওরা কে? ওরা কোন্ সমাজ থেকে বেরিয়ে এসেছে?
বকুল এখন তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল। ওরা প্রবোধচন্দ্রের সমাজ থেকেই বেরিয়েছে। হয়তো প্রবোধচন্দ্রের দাদা সুবোধচন্দ্রের যে প্রপৌত্রী সাইকেলে ভারত ভ্রমণ করতে বেরিয়েছে, সেও এমনি প্রগতিশীল, সেও হয়তো ধরে নিয়েছে অসভ্যতাটা সভ্যতার চরম সীমা। ধরে নিয়েছে উচ্ছৃঙ্খলতাই মুক্তির রূপ, ধরে নিয়েছে সব কিছু ভাঙাই হচ্ছে প্রগতি।
সুবর্ণলতা! তোমার কান্নায় উদব্যস্ত হয়ে উঠেই ক্রুর বিধাতা তোমার জন্য একটি কুটিল ব্যঙ্গের উপঢৌকন প্রস্তুত করছিলেন। অথবা একা তোমার জন্যে নয়, তোমার দেশের জন্য।
অনেকক্ষণ পরে বকুল তিনতলায় নিজের ঘরে উঠে গেল, আর তখনই ওর আচ্ছন্নতা কেটে সহজ চিন্তা ফিরে এলো।
এরাই সমাজের সবখানিকটা নয়।
ওই পিকনিক পার্টিরা।
পারুলের চিঠিখানা আবার খুলে চোখকে মেলে দিলো বকুল তার উপর।
২৫. শম্পা নামের সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা
কিন্তু শম্পা নামের সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটা কি সত্যিই হারিয়ে গেল? সমাজ থেকে, পৃথিবী থেকে, আলোর জগৎ থেকে?
হয়তো আলোর জগৎ সেই হিসেবই দেবে, কিন্তু শম্পার হিসেব তো চিরদিনই সৃষ্টিছাড়া, তাই ওর মতে ও একটা উজ্জ্বল আলোর জগতে বাস করছে।
অন্ততঃ এখন ওর মুখে অন্ধকারের চিহ্নমাত্র নেই। যদিও পরিবেশটা দেখলে ওর মা-বাপ বা পরিচিত জগৎ হয়তো মূর্ছাহত হয়ে পড়ে যেতে পারে।
মানিকতলায় একটা মাঠকোঠার নড়বড়ে বাঁশ-বাখারির বারান্দায় বসে আছে ও একটা প্যাকিং কাঠের টুলে, সামনে জীর্ণ একখানা ক্যাম্বিশের চেয়ারে সত্যবান নামের সেই লোকটা। হিসেবমতো বলা যেতে পারে ওর জীবনের শনি অথবা রাহু।
সত্যবান নিজেও নিজেকে সেই আখ্যাই দিয়েছে। সর্বদাই বলেছে, আমিই তোমার শনি, রাহু, কেতু! কী কুক্ষণেই যে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তোমার!
এখনো বলছিল সেই কথাই, আরো একজন বারান্দায় উঠে এলো বাঁশের সিঁড়ি বেয়ে। সত্যবানের চেয়ে কিছু বড়ো বলে মনে হয়। চেহারাটা নিতান্ত হতভাগ্যের মতো, আধময়লা একটা পায়জামা শার্ট পরা, চুলগুলো তেল অভাবে রুক্ষ।
ছেলেটার হাতে দুতিনটে ঠোঙা।
সেগুলো নামাতে নামাতে বলে, উঃ, এতো দেরি হয়ে গেল! রাস্তায় তো সব সময় মেলার ভিড়!
শম্পা বলে ওঠে, যাক বাবা, তুমি এসে গেছে বংশীদা, বাঁচলাম। এই অকৃতজ্ঞ লোকটা আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছিল প্রায়। আর বেশী দেরি করলে তুমি হয়তো আমাকে আর দেখতেই পেতে না।
বংশী একটা ঠোঙা খুলে একটা কমলালেবু বার করে ছাড়তে ছাড়াতে বলে, তা ওরকম দুর্ব্যবহার করার কারণটা কী?
সেই পুরনো কারণ। কী কুক্ষণে দেখা হয়েছিল। আগে তবু বলছিলো ওই আমার জীবনের শনি, এখন উল্টো গাইছে। বলছে, আমিই নাকি ওর জীবনের শনি। আমার সঙ্গে দেখা হয় ইস্তক ওর মুখ গেছে, স্বস্তি গেছে, ঘূর্তি গেছে, শেষ পর্যন্ত পা দুখানাও গেল।
বংশী ছাড়ানো লেবুর কোয়াগুলো লেবুর খোসার আধারে রেখে সত্যবানের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, নে, খা! তারপর একটু হেসে বলে, জাম্বোটার কি ধারণা তুই-ই গুণ্ডা লাগিয়ে বোমা ফেলিয়ে ওর পা উড়িয়ে দিয়েছিস?
তা নয়, ওর ধারণা আমার গ্রহ-নক্ষত্রই শুণ্ডা হয়ে ওর পিছু পিছু ধাওয়া করে ওকে পেড়ে ফেলেছে।
গ্রহ-নক্ষত্তর! সেটা আবার কী বস্তু রে শম্পা?
সে একটা ভয়ঙ্কর বস্তু। ইহ-পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে সব কিছুই নাকি ওই ওনাদের নির্দেশে। হিমালয় পাহাড় থেকে তৃণখন্ড পর্যন্ত সবাই ওনাদের অধীনে।
তা হলে তো কোনো বালাই-ই নেই। বংশী বলে এখন এই মশলাপাতি দিয়ে রান্নাটা করে ফ্যাল।
বংশীদা সত্যবান প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে, তুমি ওকে ওর বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসবে কিনা?
আমি দিয়ে আসবো? ও কি নাবালিকা নাকি?
তারও অধম। এ বোকার মত বোলো না বংশীদা। ও যেন আমার মাথায় পর্বতভার হয়ে চেপে বসে আছে।
উঃ, দেখছো বংশীদা, একেই বলে অকৃতজ্ঞ পৃথিবী!
শম্পা ঠোঙাগুলো গুছিয়ে নিয়ে দেখতে দেখতে বলে, আবার কেন গাজর নিয়ে এলে বংশীদা? ওই গাঁইয়াটা তে গাজরের ঝোল খেতে চায় না!
সত্যবান উত্তেজিত ভাবে বলে, এভাবে চালিয়ে চললে আমি আর কিছুই খাবো না বংশীদা। এই জীবন আমার অসহ্য হয়ে উঠেছে। আমায় তোমরা নিশ্চিন্তে মরতে দাও।
