এই ধরনের একটু আশা নিয়ে তাড়াতাড়ি চোখ বুলোতে গিয়ে বকুল যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেল। এ কী খবর! এ কোন্ ধরনের কথা!
বকুল নিচতলার বসবার ঘরটাতেই বসে পড়লো। চিঠিখানা আর একবার উল্টে নিয়ে গোড়া থেকে পড়তে শুরু করলো, আবার খানিকটা পড়ে মুড়ে রাখলো।
মনে পড়লো বিবাহ-বিচ্ছেদ বিল যেদিন পাস হলো, লিখেছিল বটে ওই কথাটা সেজদি। লিখেছিল, আমাদের মা বেঁচে থাকতে যদি এ আইনটা চালু হতো রে বকুল! ভদ্রমহিলা হয়তো, কিন্তু প্রয়োজন যেখানে তীব্র, আইনের সুবিধে কি সেখান পর্যন্ত পৌঁছয়? ওই ‘সুযোগ’ বস্তুটা তো অপব্যবহারেই ব্যবহার হয় বেশী। নইলে শোভনের বৌ
ভাবনায় ছেদ পড়লো, হঠাৎ বাইরে রীতিমত একটা সোরগোল শোনা গেল। অনেকগুলো কণ্ঠস্বর একসঙ্গে কলবর করে আসছে, হৈ চৈ করছে, কাকে যেন ডাক দিচ্ছে।
পাশের খোলা দরজাটা দিয়ে তাকিয়ে দেখলো বকুল, একটা খোলা ট্রাক ভর্তি করে একদল ছেলেমেয়ে এসে এ-বাড়ির সামনেই গাড়িটাকে থামিয়েছে। তাদের সকলের হাতে একখানা করে রঙিন রুমাল, উর্ধবাহু হয়ে তারা সেই রুমাল উড়িয়ে পপত্ করে নাড়ছে, আর দুর্বোধ্য একটা শব্দের চিৎকারে কাকে যেন ডাকছে।
বকু বুঝতে পারলো না ওরা কে?
ওদের সাজসজ্জাই বা এমন অরুচিকর কেন? ছেলেগুলো টাইট ট্রাউজারের ওপর একটা করে বহুবর্ণ রঞ্জিত কলার দেওয়া গেঞ্জি পরেছে, সেটাও আবার এমন টাইট যে ভেবে অবাক লাগছে মাথা গলিয়ে পরে দেহটাকে ওর খাপে খাপে ঢুকিয়েছে কী করে! আর মেয়েগুলো? চোখ বুজতে ইচ্ছে হলো বকুলের। ইঞ্চিকয়েক কাপড়ে তৈরী যে ব্লাউজগুলো পরেছে তারা, তার হাতা আর গলা এতোখানি কাটা যে মনে প্রশ্ন জাগে, ওই কয়েক ইঞ্চি কাপড়ই বা খরচ করা কেন? আর শাড়ি কি ওরা পরতে শেখেনি এখনো? তা নইলে অমন অদ্ভুত রকমের শিথিল কেন? কোমরের বাঁধন কোমর থেকে খসে পড়ে বেশ খানিকটা নেমে গিয়ে ভিতরের সায়াটাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে, আঁচলের যে সামান্য কোণটুকু কাঁধে থাকবার কথা সেটুকু কাধ থেকে নেমে হাতের উপর পড়ে আছে, চুল রুক্ষ আলুথালু, হান্ত নাড়!, দু’একজনের কানে এতো বড় বড় দুল ঝুলছে যেটা ওই ন্যাড়া হাতের সঙ্গে বিশ্রী বেমানান।
হাত তুলে রুমাল ওড়ানো আর উল্লাসভঙ্গীর ফলেই বোধ করি বেশবাস এমন অসংবৃত, মনে হচ্ছে ওই স্বল্পাবৃত দেহটা বোধ করি এখনি পুরো অনাবৃত হয়ে পড়বে।
আর চুলগুলো? জীবনে তেল তো দূরস্থান, চিরুনিও পড়েনি যেন!
কে এরা?
এদের ভঙ্গীই বা এমন অশ্লীল কেন? এমনিতে তো দেখে ভদ্রঘরের ছেলেমেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। ভদ্রঘরের ছেলেমেয়েরা এমন কুৎসিত অঙ্গভঙ্গীর মাধ্যমে উল্লাস প্রকাশ করে? আর ওই চিৎকার? শেয়ালের ডাকের মত একটা বিচিত্র ‘হু’ ধ্বনি দিয়ে নিয়ে সমস্ত রাস্তাটাকে যেন মূহর্তে সচকিত করে তুললো ওরা!
হয়তো উদ্দেশ্যটা তাই। ওদের পার্শ্ববলয়ে যারা রয়েছে তাদের সচকিত করে তোলা, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এটাই লক্ষণীয় হবার পদ্ধতি ওদের।
এ ধরনের বলগা-ছাড়া উল্লাসধ্বনি একমাত্র খেলার মাঠেই দেখা যায়, এ রকম উল্লাসভঙ্গী বারোয়ারী পূজার বিসর্জনকালে ধুনুচি নৃত্যে!
কিন্তু এ-বাড়ির দরজায় থেমেছে কেন ওরা? ডাকাডাকি করছে কাকে?
ওদের বেশবাসে, আচরণ-ভঙ্গীতে কোনো রাজনৈতিক পাটি বলেও মনে হচ্ছে না, নেহাতই একটা অভব্য বেপরোয়া হুল্লোড়ের দল। দল বেঁধে কোথাও চলেছে, এ-বাড়ির কাউকে ডেকে নিতে এসেছে বোধ হয়।
কিন্তু ঐ দলে এ বাড়ি থেকে কে যাবে? তবে কি–
ভাবতে হলো না বেশীক্ষণ, যাকে ডাকাডাকি করছে সে নেমে এলো সাজসজ্জা সমাপ্ত করে। এই ঘর দিয়েই বেরোবে। হাতের ব্যাগ লোফালুফি করতে মরতে ঢুকে এলো। আর
এখানে বকুলকে দেখে ঈষৎ থমকে গিয়ে বলে উঠলো, আপনি এখানে বসে যে?
অপূর্বর মেয়ে।
বকুল প্রায় বিহ্বল হয়েই তার নাতনীর দিকে তাকিয়ে দেখলো। এই সাজে সেজে এই অসভ্য ছেলেগুলোর সঙ্গে হুল্লোড় করতে যাবে অপূর্বর মেয়ে!
ও মেয়ের অনেক ইতিহাস আছে, অনেক ঘটনা জানা আছে বকুলের। তবু চোখের সামনে ওকে দেখে, আর ওদের সঙ্গীদের দেখে বকুল যেন এখন একটা অশুচি স্পর্শের অনুভূতিতে সিটিয়ে গেল।
ব্লাউজের গলার এবং পিঠের কাট এতো নামিয়ে ব্লাউজটা গায়ের সঙ্গে আটকে রেখেছে কি করে সত্যভামা? নাভির এতো নীচে শাড়িটাকে পরেছে কি করে? ওই নখগুলো এতো লম্বা লম্বা হলে কী করে? ও কি নিজেই বুঝে ফেলেছে ওর ওই দেহখানা ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই, নেই কোনো সম্পদ? তাই ওই দেহটাকেই
কী অশ্লীল! কী অরুচিকর!
তবু ওর কথার উত্তর দিতে হলো, কারণ ও এ-বাড়ির। ও অপূর্বর মেয়ে
বকুল বললো, ওরা কি তোকেই ডাকতে এসেছে নাকি?
হ্যাঁ তো-, কৃত্রিম একটা গলায়, অবাঙালীর মুখের বাংলা উচ্চারণের মত উচ্চারণে বলে ওঠে সত্যভামা, পিকনিকে যাচ্ছি আমরা।
ওরাই সঙ্গী?
তবে?
কোথায় পিকনিক?
কী জানি? অপূর্বর মেয়ে তার আধ-ইঞ্চি প্রমাণ ফলস নখ বসানো হাত দুটো একটি অপূর্ব কায়দায় উন্টে বলে, যেখানে মন চাইবে! আচ্ছা টাটা!
একটি লীলায়িত ছন্দে কোমর দুলিয়ে ঘরের সামনের সিঁড়ি দুটো ডিঙিয়ে নেমে গেল ও।
সঙ্গে সঙ্গে ওই ট্রাকের মধ্যে একটা প্রচণ্ড উন্নাসরোল যেন ফেটে পড়লো এসসেছে–এসসেছে।
একটা ছুঁচলো দাড়িওলা ছেলে হঠাৎ রুমালখানা হাত থেকে ছেড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে সুর করে গেয়ে উঠলো–এসে গেছে বিপিন সুধা–বাতের ওষুধ আর খেও না।
