ভগবানের মারও অবস্থার বিপাক ঘটায়, কিন্তু তাতেও দুঃখ থাকে, বেদনা থাকে, হয়তো এক রকমের লজ্জাও থাকে, কিন্তু অপমান থাকে না, গ্লানি থাকে না।
ও যখন ভাবতে বসবে তার এই দুর্দশার জন্যে দায়ী তারই মা-বাপ, যাদের কাছে এযাবৎ নিতান্ত নিশ্চিন্ত হয়ে কাটিয়ে আসছিল, তখন ওর ভিতরটা কী জ্বালায় জ্বলবে ভা।
তোর মনে আছে বকুল, যেদিন হিন্দু বিবাহে বিচ্ছেদের আইন পাস হলো, সেদিন আমি ঠাট্টা করে আক্ষেপ করেছিলাম, আহা আমাদের মায়ের আমলে যদি এটি হতো, তাহলে সে ভদ্রমহিলা সারাজীবন এমন বেড়া-আগুনে পুড়ে মরতেন না। ঠাট্টাই, তবু আক্ষেপের কোথাও একটু সত্যিও কি ছিল না? আজ মনে হচ্ছে আমাদের মায়ের জীবনে তেমন সুযোগ এলে আমাদের কি দশা ঘটতো?
শোভন চলে যাবার পর থেকে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। শুনি ছোট বোনটাকে প্রাণতুল্য ভালবাসে, সেটাকে ওর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, কী নিষ্ঠুরতা! নিজের ছেলেকেই আমার একটা হৃদয়হীন পিশাচ মনে হচ্ছে।
অথচ কারণটা কি? শুধু জেদ, অহমিকা! শুধু রুচির অমিল, শুধু মতের অমিল। অর্থাৎ বনিয়ে থাকতে পারার অক্ষমতা! কিন্তু ওই অমিলের কারণগুলো যদি শুনিস মনে হবে সবই ঠাট্টা।
একজন চেয়েছে জীবনযাত্রার প্রণালীটা সম্পূর্ণ পাশ্চাত্ত্য-ধর্মী হোক, অন্যজন চেয়েছে প্রণালীটা পাশ্চাত্ত্যধর্মী হয় হোক, তবু তাতে প্রাচ্যের একটু আভাস মেশানো থাক। ছেলেমেয়েরা সাহেব হোক তাতে ক্ষতি নেই, কিন্তু তারা যে আসলে বাঙালী, সেটা যেন ভুলে না যায়।
অতএব প্রথমজন বলেছে, খিচুড়ি চলবে না, যা হবে তা একরকম হবে, অপরজন বলেছে, জন্মসূত্রটা তো এড়াতে পারবে না, ওটা তো বদলাবার বস্তু নয়, অতএব?
শেষ পর্যন্ত বিরোধটা গিয়ে ঠেকেছে সংঘর্ষে।
এক হিসেবে দোষটা আমার ছেলেরই।
বেড়ালটাকে পয়লা রাত্তিরেই কাটতে হয়।
প্রথম দিকে আত্মমহিমা অথবা উদারতা দেখাতে, অথবা নিতান্তই মোহাচ্ছন্ন বশ্যতায় বেড়ালকে ইচ্ছামত খেলতে দিয়েছো তুমি, এখন হঠাৎ সে পাতে মুখ দিয়েছে বলে তলওয়ার বার করে কাটতে চাইলে চলবে কেন?
ভালবাসার বশ্যতা এক, আর নিরুপায়ের ভূমিকায় অন্ধ আত্মসমর্পণ আর এক। এ যুগের পুরুষরা ওই বিভেদটার সীমারেখা নির্ণয় করতে অক্ষম হয়েই তো জীবনে অনিষ্ট ডেকে আনছে।
.মনে হচ্ছে সমাজের চাকাটা হঠাৎ যেন আমূল ঘুরে গেছে। যেখানে একটু নড়লে কাজ ঠিক হতো, সেখানে এই একেবারে উল্টোটা চোখে কেমন ধাক্কা মারছে।
জানি না আমার বড় ছেলের সংসারেও আবার এই ঢেউ এসে লাগে কিনা। সেখানেও তো অমিলের চাষ। আর ওই ছেলেমেয়ে নিয়েই। মোহনের মতে ছেলেমেয়েদের দোষ-ত্রুটি হলে বুঝিয়ে শিক্ষা দিয়ে সংশোধন করা উচিত, মোহনের বৌয়ের মত পিটিয়ে সায়েস্তা করাই একমাত্র উপায়। এ বিষয়ে সে আমাদের পিতামহী প্রপিতামহীদের সঙ্গে একমত। আসলে ‘গ্রাম্যতা’ বস্তুটা একটা চরিত্রগত ব্যাপার। ওটা শহুরে জীবনের পরিবেশ পেলেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার নয়।
অথচ আবার দেখছি, মোহন ছেলেকে একটু কঠিন কথা বলে শাসন করতে গেলে তার বৌয়ের এমনই প্রাণ ফেটে যায় যে তদ্দণ্ডে ছেলেকে মাথায় তুলে আদর করতে বসে দেখিয়ে দেখিয়ে। মা-বাপের এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে ওরা খানিকটা বেশ মজা পায়। আবার কখনো ওদের উলুখড়ের দশা ঘটে।
বিরোধ পদে-পদেই! একজনের মতে ওদের খাওয়া নিয়ে জুলুম করা পীড়নেরই নামান্তর, অন্যজনের মতে অহরহ জগতের যাবতীয় পুষ্টিকর খাদ্য তাদের একটি ক্ষুদ্র উদরভাণ্ডে চালান করে দেবার তালে সর্বদা জুলুম করাই মাতৃ-কর্তব্য।
অন্য দিকেও মোহনের ইচ্ছা তার অধস্তনের অফিসেই বিরাজ করুক, বসের বাড়িতে এসে ‘বস’-গিন্নীকে বৌদি ডেকে চাকরগিরি না করুক, অথচ মোহনের বৌয়ের ইচ্ছে তার স্বামীর অধস্তনেরা সবাই এসে তার পায়ে পড়ক। যেন ‘বস’-গিন্নী মরতে বললে মরে, আর বাচতে বললে বাঁচে।
মোহনের মতে যা করবে মাত্রা রেখে। বন্যাত্রাণ তহবিলে মোটা চাদা দিতে চাও দাও, শ্লোগান দিয়ে পথে নেমে পড়বার অথবা অভিনয় করতে স্টেজে ওঠবার কী দরকার? বৌয়ের মতে সেটাই জরুরী দরকার।
মোহন যদি বলে বৌয়ের রাত দশটা পর্যন্ত বাইরে আড্ডা দেওয়াটা বাড়াবাড়ি, বৌ পরদিন রাত এগারোটায় বাড়ি ফেরে তার মহিলা সমিতির কাজের ছুতোয়।
তবু নাকি মোহনের বৌ তার বন্দীজীবনকে ধিক্কার দেয়।
এ শুধু আমার সংসারের কথা নয়, প্রায় সব সংসারেরই কথা। হয়তো কলসী থেকে দৈত্যকে বার করলে এই দশাই ঘটে।
অথবা দৈত্যটা বেরিয়েই ছাড়তো, এ যুগের হতভাগারা সেটাই লোকচক্ষে আড়াল দেবার জন্যে বশংবদ স্বামীর ভূমিকা অভিনয় করে চলে, যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত অসহ্য হয়ে ওঠে।
এক যুগের পাপের প্রায়শ্চিত্ত অপর যুগ করে, এই বোধ হয় ইতিহাসের নিয়ম। কিন্তু ইতিহাসটা যখন প্রিয়জনের জীবনে আবর্তিত হয়, তখন নির্লিপ্তর ভূমিকায় থাকা শক্ত বৈকি। ভেবেছিলাম এতে পটু হয়ে গেছি। দেখছি ধারণাটা মজবুত নয়।
সেজদির চিঠি বকুল কখনো পাওয়া মাত্র তাড়াতাড়ি যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ে না, কিন্তু আজ পড়ছিল, লেটার বক্সের কাছ থেকে একটুখানি সরে এসেই। আজকে ওর মনে হলো হয়তো একটা ভাল খবর বয়ে এনেছে চিঠিটা। হয়তো চিঠি খুলেই দেখবে, পোড়ারমুখী মেয়েটা হঠাৎ এসে হাজির হয়েছে রে বকুল! দেখে প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাই চিঠি লিখতে বসলাম।
