পারুলের একটা নিঃশ্বাস পড়ে, গভীর গাঢ়। পারুল জানলা দিয়ে চোখ ফেলে দেখে শোভনের ছেলেটা গল্পের বইখানা মুড়ে রেখে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছে। পারুলের হঠাৎ মনে হলো এর থেকে করুণ দৃশ্য সে বোধ করি জীবনে আর কখনো দেখেনি।
পারুল নিজের ছেলের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, হার মানলি?
মানলাম। পারা গেল না!
পারুল অন্য প্রসঙ্গে এলো।
বললো, তোর ছেলে তো কেষ্ট-বিষ্ণু বাবাদের ছেলের রীতিতে বিলিতি ইস্কুলে পড়তো, এখানে ওর দশা কী হবে?
এখন যে দশায় উপনীত হয়েছে তার সঙ্গে ম্যানেজ করতে হবে। ঠাকুমার হাতের বড়ির ঝোল খাবে, আর বাংলা ইস্কুলে পড়বে।
পারুল একটু কঠিন মুখে বলে, তার মানে যে-কালকে তোরা “সেকাল” বলে নাক কোচকাতিস, সেই কালের থেকে এক পা-ও এগোয়নি। তোরাও সে যুগের মত ছেলেপুলেগুলোকে নিজেদের জিনিসপত্তর ছাড়া আর কিছুই ভাবিস না। অথবা তাদের খেলনা পুতুল। সেকালেও তো এই ছিল। ওদের মুখ কে চাইতো? ওরা যেন নিজেদের শখ সাধ মেটানোর উপকরণ মাত্র। নিজেদের সুবিধে-অসুবিধের বশেই তাদের ব্যবস্থা, কেমন? কিন্তু এ যুগে তো তোরা অনেক বড় বড় কথা বলতে শিখেছিস, ওদের জন্যে অনেক ব্যবস্থা অনেক আয়োজন, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিটা বদলালো কই? সন্তানের জন্যে যে স্বার্থত্যাগের দরকার আছে, জেদ অহঙ্কার ত্যাগের দরকার আছে, তা তো ভাবছিস না তোরা একালের মা-বাপ? তোদের সুবিধের অনুপাতে ওদের জীবনের ছক। এতোদিন তোরা ওকে তোর পদমর্যাদা আর ঐশ্বর্যের মাপকাঠিতে ফেলে–ওয়া শোওয়া পড়ায় খেলায় প্রতিটি ব্যাপারে সাহেব করে মানুষ করছিলি, হঠাৎ এখন তোদর ইচ্ছে-বাসনার হাঁচে ফেলে ওর জন্যে ঠাকুমার হাতে বড়ির ঝোল আর পাততাড়ি বগলে পাঠশালে যাওয়া বরাদ্দ করছিস, আবার যদি হঠাৎ খেয়াল হয়, হয়তো মাথা ন্যাড়া করে ব্রহ্মচর্য আশ্রমে পাঠিয়ে দিরি, অথবা একেবারে পাশা উন্টে ফেলে ছুঁচলো জুতো আর ড্রেনপাইপ প্যান্ট পরিয়ে আমেরিকায় চালান করতে চাইবি। ওরও যে একটা মন আছে দেখবি না, আর সে মনে মা-বাপের জন্যে কী সঞ্চিত হচ্ছে ভেবেও দেখবি না?
শোভন একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে।
শোভন বলে, ভেবো না মা, এসব কথা আমি ভাবিনি! অথবা রেখাকে বোঝাতে চেষ্টা করিনি! কিন্তু কিছুতেই যদি না বোঝে কী করবো বল? তাহলে ছেলেটাকেও ওর হাতে তুলে দিয়ে নিজে একেবারে দেউলে বনে যেতে হয়।
পারুলের মনটা বেদনায় টনটন করে ওঠে। পারুলের নিজের বক্তব্যের জন্য লজ্জা হয়, সত্যি নিতান্ত নিরুপায় হয়েই তো মায়ের কাছে ছুটে এসেছে বেচারা। এখানে তো অহমিকাকে বড় করে তোলেনি।
পারুল অতএব বাতাস হালকা করবার চেষ্টা করে। বলে ওঠে, তা বৌমার এতই বা কাঠ জেদ কেন বল্ তো বাপু? তুই এই বুড়ো বয়সে আর কারুর বৌয়ের প্রেমে-ট্রেমে পড়ে বসিসনি
শোভন হঠাৎ মাথা হেঁট করে। তারপর আস্তে বলে, শ্রদ্ধা বলেও একটা বস্তু থাকে। ও সেটাকেও বরদাস্ত করতে পারে না।
পারুল ছেলের দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে। পারুল যেন রহস্যের মূল দরজা খুঁজে পায় হঠাৎ। তবে সেটা বলে ফেলে না। বলে, সেটা কি একটা বিরোধের বস্তু?
শুধু সেটাই নয়, বললাম তো, প্রতিপদে রুচির অমিল, এ জীবন ওর অসহ্য হয়ে উঠেছে। আমি সঙ্কীর্ণচিত্ত, ও উদার। আমি গ্রাম্য, ও আধুনিক। আমি ভগবান-বিশ্বাসী, ওর মতে সেটা কুসংস্কার।
.
পরদিন রাত্রে পারুল তার চিঠির কাগজের প্যাডটা নিয়ে বসলো।
শোভন ছেলে রেখে চলে গেছে, কারণ ছুটি নেই তার। ছেলেটা পারুলের চৌকির কাছে আর একটা সরু চৌকির ওপর শুয়ে আছে। মশারির মধ্যে থেকে বোঝা যাচ্ছে না ও ঘুমিয়ে পড়েছে না জেগে আছে।…এখন খোলা জানলা দিয়ে গঙ্গার বাতাস এসে মশারিটাকে দোলাচ্ছে, কিন্তু সব দিন বাতাস থাকবে না, গুমটের দিন আসবে, সেদিন কী হবে ওর? জন্মাবধি যার বিজলী পাখার হাওয়ায় অভ্যাস! পারুলের এই মফঃস্বলের বাড়িতে তো ও জিনিসটি নেই।
শুধু ও জিনিসটি কেন, অনেক অনেক জিনিসই তো নেই যাতে ও অভ্যস্ত। প্রতি মুহূর্তেই কি বিদ্রোহী হয়ে উঠবে না ওর মন? অথবা নিজেকে হতভাগ্য বেচারী ভেবে হীনমন্যতার শিকার হয়ে পড়বে না?
আমার মনে হচ্ছে তাই হবে, লিখলো পারুল, এরকম মৃদু আর চাপা স্বভাবের ছেলেমেয়েরা তাই হয়। পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই এরা আছে, এই হতভাগ্যের দল। আমাদের সমাজেও এলো। প্রতিরোধের উপায় নেই। কিন্তু বকুল, আমরা কি মেয়েদের এই স্বাধীনতারই স্বপ্ন দেখেছিলাম? আমরা, আমাদের মা-দিদিমারা? তুই তো গল্প-উপন্যাস লিখিস, কতো জীবন তৈরী করিস, আমার অভিজ্ঞতা সত্যি মানুষ নিয়ে, তাই আজকাল যেন ভেবে ভেবে বল পাচ্ছি না। এ যুগ কি ব্যক্তি-স্বাধীনতা আর মেয়েদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে এদেশেও সেই একটা হতভাগ্য জাতি সৃষ্টি করলো, পৃথিবীর সমস্ত সভ্য জাতিরা যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে। যে হতভাগ্যেরা শিশুকালে বাল্যকালে তাদের জীবনের পরম আশ্রয় হারিয়ে বসে ক্ষমাহীন নিষ্ঠুরতায় কঠিন হয়ে উঠবে, উজ্জ্বল হবে, স্বেচ্ছাচারী হবে, সমাজদ্রোহী হবে, অথবা একটা হীনমন্যতায় ভুগে ভুগে জীবনের আনন্দ হারাবে, উৎসাহ হারাবে, বিশ্বাস হারাবে।
বিশাস হারানোর মত ভয়ঙ্কর আর কী আছে বল? ক’দিন আগেও যে ছেলেটা জানতে, আমার এই রাজপুত্তরের পোস্টটা চোরাবালির ওপর প্রতিষ্ঠিত, আমার রাজ্যপাট আবুহোসেনের রাজ্যপাটের মত এক ফুয়ে ফর্সা হয়ে যাবে, আজ আচমকা এই অবস্থায় পড়ে গিয়ে সে যদি পৃথিবীর ওপরই আর বিশ্বাস রাখতে না পারে, তাকে দোষ দেব কেমন করে?
