পারুল মনে মনে কেঁদে উঠে বলে, তার মানে তোকে দুজনকেই ছেড়ে থাকতে হবে?
তাছাড়া উপায় কি?
পারবি?
প্রশ্নটা করে ফেলে পারুল, কিন্তু করেই লজ্জিত হয়, সত্যি না পারা শব্দটার কি কোন অর্থ আছে? মানুষ কী না পারে?
সেই প্রশ্নটাই করে শোভন, না পারা শব্দটার কোনো মানে আছে মা?
তা বটে। কিন্তু,ঈষৎ দ্বিধায় থেমে পড়ে অবশেষে মনে জোর করে বলে ফেলে পারুল, তোদের কি তাহলে ছাড়াছাড়িটা পাকা হয়ে গেছে শোভন?
বেপরোয়া পারুলেরও ‘ডিভোর্স’ শব্দটা মুখে আটকায়। সন্তানের বিধ্বস্তু মুখ বড় গোলমেলে জিনিস।
শোভন অদ্ভুত একটু হেসে বলে, পাকাপাকি? না কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছয়নি এখনো, এক্ষুনি ওঠাতে গেলে অসুবিধে আছে। তাতে অনেক হাঙ্গামা। জানো তো সবই, একজনকে মহা পাপিষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে না পারলেও কাজটা সহজে হয় না। এটা তার থেকে সুবিধের, ধীরে ধীরে সিঁড়ি নামা। বছর তিনেক সেপারেট থাকতে পারলেই বিচ্ছেদটা অনায়াসে হবে। কোর্ট আপত্তির পথ পাবে না।
যতোক্ষণ শ্বাস, ততোক্ষণ আশ।
পারুল তবু যেন মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশাস ফেলে। হয়তো এই দূরে থাকার অবকাশে পরস্পরের অভাব অনুভব করে ভুল বুঝতে পারবে, হয়তো নিত্য সাহচর্যের বিতৃষ্ণা ধুয়ে মুছে গিয়ে নতুন আগ্রহ অনুভব করবে। হয়তো এই বাচ্চা দুটোই একটা দারুণ সমস্যা ঘটিয়ে ওদের সমস্যাকে লঘু করে দেবে।
ছেলেটাকে ছেড়েই কি থাকতে পারবে রেখা? যে রেখা বরাবর সমস্ত পরিবেশটাকে বলে চেপে ধরে রাখতে চেয়েছে আপন বাসনামুঠির মধ্যে, যে রেখা কোনদিন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পায়নি? ছেলের জন্যে মন কেমন করলেই সে প্রবল হয়ে উঠবে, আপন অনুকুলে স্রোতকে বইয়ে নেবে।
শোভন?
ও হয়তো তখন কৃতার্স হয়ে ভাববে–বাচলাম বাবা।
এক্কেবারে সব সম্ভাবনার মুল যে একেবারে কোপ পড়েনি, এটুকুই আশায়।
শেভনের ছেলেটাকে একটা গল্পের বই দিয়ে গঙ্গার ধারের বারান্দায় বসিয়ে রেখে এসেছে তাই কথা চালাতে অসুবিধে হচ্ছে না।
ছেলের সামনে চায়ের পেয়ালাটা এগিয়ে দিয়ে পারুল বললো, কিন্তু তোদের এই রুচির অমিলটা হলো কখন? নিজেকে গলিয়েটলিয়ে দিব্যি তো এক ছাঁচে ঢাই করে ফেলেছিলি?
ঈষৎ হালকাই হয় পারুল, ইচ্ছে করেই হয়।
শোভন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার তাই মনে হতো?
শুধু আমার কেন বাবা, সকলেরই হতো।
সকলের কথা থাক, তোমার নিজের কথাই বলো।
তা আমারই বা না হবে কেন বাপু? দেখে তো এসেছি কিছুটা। তোকে তো কোথাও খুঁজে পাইনি।
শোবন একটু হেসে বলে, যে বস্তুটি তুমি হেন মেয়েও খুঁজে পাওনি, সেই সুক্ষ সুগভীর বস্তুটি তোমার বৌ ঠিক খুঁজে খুঁজে আবিষ্কার করে ফেলেছে মা। আর ফেলেই ক্ষেপে উঠেছে।
শোভন চায়ের পেয়ালায় মনোযোগী হয়।
পারুল আস্তে বলে, কিন্তু নিজেদের হৃদয়ের দ্বন্দ্বই বড়ো হয়ে উঠলো তোদের কাছে? ছেলেমেয়ে দুটোর কথা ভাববি না?
আমাদের কাছে এ কথা ভাবছ কেন মা? আমি তো চেষ্টার ত্রুটি করিনি!
বেশ, না হয়ে ওদের মার কাছেই। কিন্তু তোর কোনো রকমে সাধ্য হলো না ওটা ম্যানেজ করা?
কই আর হলো?
শোভল বলে, সব কিছুরই শেষ পর্যন্ত তো একটা সীমা আছেই। ম্যানেজ করারও আছে।
তাহলে এখন দাঁড়াচ্ছে, তুই তোর কাজের জায়গার চলে যাচ্ছিস, বৌমা বাপের বাড়ি থাকছে, এবং ছেলেটা এখানে আর মেয়েটা সেখানে। অর্থাৎ ভাইবোনের যে একটা সুখের সঙ্গ, সেটা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বেচারারা। মেয়েটা তবু মা পাচ্ছে, ছেলেটা তাও না।
শোভন একটু হালকা গলায় বলে ওঠে, তেমনি বাবার মাকে পাচ্ছে।
থাম তুই। পারুল প্রায় ধমক দিয়ে বলে, বাজে কথা রাখ। যে বাবার মাকে বেচারী জন্মে জীবন চক্ষে দেখেনি বললেই হয়, তাকে পেয়ে তা কৃতার্থ হয়ে যাবে একেবারে! সত্যি, আমি তো ওটার মুখের দিকে তাকাতেও পারছি না। বুড়ো ধাড়ী দুটো মা-বাপ তাদের হৃদয় সমস্যাকে এতো জটিল করে তুললো যে, ভেবে দেখছে না ওদের মুখগুলো হেট হয়ে গেল! এতোদিনের আনন্দের, আহ্লাদের, গৌরবের জীবন থেকে হঠাৎ যেন তোরা ওদের একটা দারুণ লজ্জার, দুঃখ আর অপমানের জীবনে গড়িয়ে ফেলে দিলি। এই পৃথিবীতে ওদের পরিচয়পত্রটা কত মলিন বিবর্ণ হয়ে গেল সে হুঁশ আছে? জীবনে কখনো ওরা মা-বাপকে ক্ষমা করতে পারবে?
পারলেই অবাক হবো। পারবে না।
সেই গ্লানির বোঝা তাদের জীবনকে ভারী করে তুলবে না?
পারুল স্বভাবত কখনোই উত্তেজিত হয় না, কিন্তু এখন পারুলকে উত্তেজিত দেখালো।
শোভন বিধ্বস্ত গলায় বলে, জানি তুলবে। অসহনীয় করে তুলবে। কিন্তু আমি কি করবো বলো? এসব যুক্তি যে দেখাইনি তা তো নয়?
কিন্তু তোদের বিরোধটা কোথায় ঘটলো? কবে কখন কী সূত্রে?
পারুল যেন জিনিসটাকে লঘু করে দেখিয়ে ছেলের মনের ভারটা লঘু করে দিতে চায়। যেন দুটো অবোধ ছেলেমেয়ে ঝগড়াঝাটি করে নিজেদের ক্ষতি ডেকে আনছে, পারুল তাদের সামলে দেবে।
শোভন হয়তো মায়ের এই মনোভাব বোঝে, হয়তো বা বোঝে না, ভাবে মা ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছেন না।
শোভন তাই মার দিকে সরাসরি তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে, বিরোধ? সর্বক্ষেত্রে। বরাবর চিরদিন। তবু অবিরত চেষ্টা করে এসেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চেষ্টায় হেরে গেলাম। ও বলছে আমি নাকি কোনোদিন চেষ্টা করিনি।
