হায়! যদি তারা জানতে পারতো, স্বামীকে কেবলমাত্র লোকচক্ষে ওই স্ত্রৈণরূপে প্রতিভাত করতেই কত কাঠখড় পোড়াতে হয় অলকাকে, কতখানি জীবনীশক্তি খরচ করতে হয়?
নেহাৎ নাকি গুরুবলে বলীয়ান বলেই পেরে চলছে অলকা।
এখনো তাই অবস্থাকে সেই হতভাগা মেয়ের অনুকূলে আনতে বলে ওঠে অলকা, বাবা জানেনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেছে কিনা–
অগ্নিগর্ভ মানুষটা এতক্ষণকার স্তব্ধতা ভেঙে চাপা গলায় গর্জে ওঠে, দুর্ঘটনা!
প্রশ্ন না মন্তব্য? সমর্থন না প্রতিবাদ? কে জানে!
অলকার মনে হয় বোধ হয় অবস্থার হাতলটা চেপে ধরতে পারলো। তাই তেমনি উদ্বিগ্ন গলায় বলে, তাই ভাবছি! ‘‘বাই কারে” গেছে তো সব! ফেরার সময় গাড়িফাড়ি বিগড়ো্লো, না আরো কিছু ঘটলো, অলকা গলার স্বর আরো খাদে নামায়, বুকের মধ্যে কি যে করছে। আজকাল তো রাতদিনই আকসিডেন্ট!
আগুনের শিখা আর একবার ঝলসে ওঠে, তা যদি হয়ে থাকে তো বলবো তোমাদের ভগবান মারা গেছেন। এতোক্ষণ তো আমার ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলাম যেন অ্যাকসিডেন্টই হয়। এমন হয় যাতে তোমার ওই নাচিয়ে মেয়ের পা দু’খানা জম্মের মত খোঁড়া হয়ে যায়।
অলকা যথারীতি ঠিকরে উঠলো।
অলকা যখন ভাবছিল অবস্থা আয়ত্তে আসি-আসি করছে, তখন কিনা এই কথা! এতোখানি অপমান তো আর বরদাস্ত করা যায় না!
অলকা যথারীতি ঝঙ্কারে বলল, কী বললে?
যা বলেছি আবারও বলছি। প্রার্থনা করছি তোমার মেয়ে যেন ঠ্যাং ভেঙে বাড়ি ফেরে।
অলকা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, তা ওইটুকুই বা আর রেখে-ঢেকে বলা কেন? বলল যে-প্রার্থনা করছি যেন আর বাড়ি না ফেরে। যেন গাড়ির তলায় পেষাই হয়ে যায়। আশ্চর্য প্রাণ বটে! তুমি না বাপ!
সেই তো, সেটাই তো অস্বীকার করার উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। যদি পেতাম।
ওঃ বটে! বলতে লজ্জা করছে না? বাড়ির আর একটি মেয়েও তো দেখলাম। মেয়ে বাপের নাকের সামনে দিয়ে তেজ করে বেরিয়ে গেল, আর বাড়ি ফিরলো না, অথচ কোন নিন্দে নেই। যত দোষ আমার মেয়ের।
নিন্দে নেই কে বললো? এই তো তুমিই নিন্দে করছে। তবে তুমিও জানো আর আমিও জানি, সে মেয়ে পাতালের সিঁড়িতে পা বাড়াবে না।
থামো থামো! মেয়েমানুষ একলা রাজরাস্তায় ঘুরে বেড়ালে কে তাকে স্বর্গের সিঁড়িতে তুলে দিতে আসে?…আমি বলছি
অলকা যে কি বলতো কে জানে, সত্যভামা এসে পড়লো হড়মুড়িয়ে, বলে উঠলো, বাপী খুব রাগ করছে তো? জানি করবেই। ওদের না বাপী, এত করে বললাম, সারাদিন এতো কাণ্ডের পর আবার নাইট শোর সিনেমা! বাপী বাড়ি ঢুকতে দেবে না। তা শুনলো না গো। …মেয়েগুলো কী পাজী জানো? বলে কি আমরা বুঝি একটা বাড়ির মেয়ে নয়? আমাদের বুঝি মা-বাপ নেই? তবু আমি শীলাকে ধরে বেঁধে তুলে নিয়ে ছবি শেষ হবার আগেই চলে এলাম। সবাই যা ঠাট্টা করলো!..ও বাপী, কথা বলছ না যে? বাপী—
বাপের গলা ধরে ঝুলে পড়ে সত্যভামা, আমি বলে বন্ধুদের কাছে মুখ হেঁট করে আগে আগে চলে এলাম, তুমি রেগে আছো বলে, আর তুমি কিনা হাঁড়ি-মুখ কবে–হাসো হাসো বলছি! ও বাপী! না হাসলে আমি দারুণ ভাবে কেঁদে ফেলবো–
বাপীকে নরম না করা পর্যন্ত থামবে না সে নিশ্চিত।
২৪. নমিতার জীবনে নাটক ছিল না
নমিতার জীবনে নাটক ছিল না, নমিতা এক দীনহীন পরিচয়ের মধ্যে অতি সাধারণ জীবন বহন করছিল, নমিতার প্রাপ্তির ঘর ছিল শূন্য। তাই নমিতার মধ্যে থেকে প্রতিবাদ উঠেছিল, দিনে দিনে প্রবল হয়ে উঠেছিল সেই প্রতিবাদ, তাই নমিতা আকস্মিক এক নাটকীয়তায় মোড় নিয়ে ওর জীবনটাকেই নাটক করে তুললো, কিন্তু অনেক প্রাপ্তির গৌরর বহন করে আলোকোজ্জ্বল মঞ্চেই যাদের ঘোরাফেরা, তাদের মধ্যে থেকেও প্রতিবাদ ওঠে কেন?
পারুলের ছোট ছেলে শোভনের বৌ রেখার স্বামী তো তার সম্পত্তির ট্যাক্স খাজনা দিতে কসুর করেনি! তবু সে তার সম্পত্তিকে হাতে রাখতে পারছে না। দশ বছরের বিবাহিত জীবনযাপনের পর রেখা হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলেছে, এই ফাঁকিতে ভরা দাম্পত্যজীবন বহনের কোনো মানে হয় না।
অথচ এযাবৎ সকলেই দেখেছে আর জেনেছে, ওদের সেই জীবন একেবারে ভরাভরন্ত। তাতে ফাঁকই বা কোথায়, ফাঁকিই বা কোথায়?
উপরওলা-মুক্ত সংসার, সুখী পরিবার, বশংবদ স্বামী, বিনীত ভৃত্য, অগাধ প্রাচুর্য, অবাধ স্বাধীনতা, ছবির মত বাড়ি, সাহেববাড়ির মত ড্রইংরুম, ফুলে ভরা বাগান, ফুলের মত ছেলেমেয়ে, অনুরক্ত প্রতিবেশী, পদমর্যাদায় সমৃদ্ধ স্বামীর অনুগত অধস্তনের দল, এক কথায় যে কোনো মেয়ের ঈর্ষাস্থল এই জীবনে মণ্ডিত রেখা নামের মহিলাটি তো একেবারে পাদপ্রদীপের সামনে বিরাজ করেছে এতদিন-ঝলমলে মূর্তিতে। রেখার চলনে-বলনে, আচার-আচরণে, দৃষ্টি ভঙ্গিমায়, ঠোঁটের বঙ্কিমরেখায় উচ্ছ্বসিত হয়েছে সেই ঝলমলানির ছটা, হঠাৎ এ কী?
জীবনভার নাকি দুর্বহ হয়ে উঠেছে তার! যে স্বামীর সঙ্গে তার চিন্তায়-ভাবনায়, ইচ্ছায় বাসনায়, রুচিতে-পছন্দে কোনোখানে মিল নেই, সে স্বামীর সঙ্গে একত্রে বসবাস তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
পারুল ছেলের পরাজিত পর্যন্ত মুখের দিকে একটুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে আস্তে বলে, তুই ঠাট্টা করছিস না তো শোভন।
সেটা হলে আমার পক্ষে ভালো হতো অবশ্যই, শোভন আস্তে বলে, কিন্তু হঠাৎ তোমার সঙ্গে এমন ঠাট্টা করতে আসবো কেন বল? ছেলেটাকে তোমার কাছে রাখতে এলাম, মেয়েটাকে ছাড়লো না। হোক সেটা বাপ-মরার মত মামার বাড়িতে মানুষ।
