সে কতোদিনের কথা? মেয়েটা কি তারই মেয়ে?
তবু এ সংবাদে কৌতুকই অনুভব করে বকুল। বলে, তা ভালো তো। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে থাকলেই বিপদের আশঙ্কা, এ ছ’জন একজনকে পাহারা দেবে।
পাহারা দেবে, না সদলবলেই আহার করবে কে জানে! ছোটবৌদি বলে, এই ভেবে অবাক হচ্ছি, তোমাদের সেই বাড়িতেও এত প্রগতির হাওয়া বইলো!
বাঃ, কাল বদলাবে না? যুগ কি বসে থাকবে?
ওদের বাড়িটা দেখলে তো মনে হতো বুৰি “বসেই আছে”! হঠাৎ একেবারে
বকুল অন্যমনস্ক গলায় বলে, হয়তো এমনিই হয়। ঘরে দরজা-জানলা না থাকলে, একদিন ঘরে আটকানো প্রাণী দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে নিঃশ্বাস নিতে চায়।
তা বলে বাপু এতোটা বাড়াবাড়ি–ছোটবৌদি বলে ওঠে, থাক, আমার কোনো কথা বলা শোভা পায় না।
বকুল ওর অপ্রতিভ ভাবটাকে না দেখতে পাওয়ার ভান করে বলে, তাড়াতাড়ি করতে গেলেই বাড়াবাড়ি করতে হয় ছোটবৌদি, হঠাৎ যখন খেয়াল হয় “ছি ছি, বড্ড পিছিয়ে আছি”, তখন মাত্রাজ্ঞাটা থাকে না।
হবে হয়তো বলে একটা নিঃশ্বাস ফেলে শম্পার মা। হয়তো এই কথায় তার নিজের মেয়ের কথাই মনে এসে যায়।
কিন্তু এমন কী দরজা-জানলা এটে রেখেছিল তারা? তাই তাদের মেয়ে দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে গেল? আমরা তো যা করেছি ওর ভালোর জন্যেই–তা আমরা ওকে বুঝিনি, ওই বা আমাদের বুঝবে কেন?
অদ্ভুতভাবে ভেঙে পড়েছে বলেই একটু বুঝতে পারছে শম্পার মা। আস্ত থাকলে কি বুঝতো? না বুঝতে চাইতো?
এই বাড়িতেই আর একটা অংশেও চলছিল একটা নাটকীয় দৃশ্য।
অলকা ঘর-বার করছিল, অলকা বার বার জানলার ধারে এসে দাঁড়াচ্ছিল, তবু অলকা তার মুখের রেখায় একটা যুদ্ধং দেহি ভাব ফুটিয়ে রাখছিল বিশেষ চেষ্টায়। কারণ কাঁচঘেরা বারান্দার একধারে ক্যাম্বিসের চেয়ারে উপবিষ্ট অপূর্বর মুখের দিকে মাঝে-মাঝেই কটাক্ষপাত করছি অল।
সে মুখ ক্রমশই কঠিন কঠোর আর কালচে হয়ে আসছে, আর তার আগুনজ্বলা চোখ দুটো বার বার বুককেসের উপর রাখা টাইমপীসটার উপর গিয়ে পড়ছে।
উঃ, লোকটা কী ধড়িবাজ! ভাবলো অলকা, সেই থেকে টেলিফোনটার গা ঘেঁষে বসে আছে, এক মিনিটের জন্য নড়ছে না। একবার বাথরুমে যাবারও দরকার পড়তে হতো না এতোক্ষণ সময়ের মধ্যে? অলকা তো তাহলে ওই টেলিফোনটার সহায়তায় ব্যাপারটা ম্যানেজ করে ফেলতে পারতো। বলে উঠতে পারতো, এই দ্যাখো কাণ্ড, এখন তোমার কন্যে ফোন করলেন, “ফিরতে একটু দেরি হয়ে যাচ্ছে, বাপীকে ভাবনা করতে বারণ কোরো”।
তারপরই ব্যাপারটাকে লঘুতর করে ফেলবার জন্যে হেসে গড়িয়ে বলতে, বুঝছো। ব্যাপার? ‘মা তুমি ভেবো না’ নয়, “বাপীকে ভাবনা করতে বারণ কোরো।” জানে তার বাপীই সন্ধ্যেরাত্তির থেকেই ঘড়ির দিকে তাকাবে আর জানলার দিকে তাকাবে। আর জগতে যতরকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, মনে মনে তার হিসেব কষবে।…মা বেচারীও যে ভেবে অস্থির হতে পারে সে চিন্তা নেই মেয়ের।
হ্যাঁ, এইভাবেই কথার ফুলঝুরি ছিটিয়ে পরিস্থিতি হালকা করে নিতে পারতো অলকা, বরাবর যেমন নেয়। কতো ম্যানেজ করে আসছে এযাবৎ তার ঠিক আছে? মেয়ে বড় হয়ে ওঠার আগে থেকেই চলছে অলকার এসব কলাকৌশল।
ওই অপূর্ববাবুটি বাইরের লোকের কাছে যতই প্রগতিশীলের ভান করুক, আর উদারপন্থীর মুখোশ আঁটুক, ভিতরে কি তা তো জানতে বাকি নেই অলকার। মনোভাব সেই আদ্যিকালের পচা পুরনো মেয়েরা একটু সহজে স্বচ্ছন্দ জীবন পেতে চাইলেই সেই সেকালের সমাজপতিদের মত চোখ কপালে উঠে যায়। নেহাৎ নাকি এই আমি খুব শক্ত হাতে হাল ধরে বসে আছি, তাই আধুনিক যুগের সামনে মুখটা দেখাতে পারছি।
তবু শুধুই কি জোরজুলুম চালাতে পাই? কত রকমেই ম্যানেজ করতে হয়–সাজিয়ে বানিয়ে গুছিয়ে কথা বলে, রাতকে দিন আর দিনকে রাত করে।
এই এখুনি সামলে ফেলা যেতো, যদি লোকটা ওই টেলিফোনের টেবলটার গায়ে বসে না থাকতে।
মেয়ের ওপরও রাগে মাথা জ্বলে যায় অলকার। জানিস তো সব, তবে এত বাড়াবাড়ি কেন? যা বয়-সয় তাই ভালো।…বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গেছিস, বেশ করেছি, তাই বলে রাত এগারোটা বেজে যাবে-বাড়ি ফিরবি না? এতো রাত অবধি কেউ পিকনিকের মাঠে থাকে?
ভাবতে থাকে এসব, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের দিকে যুক্তি শক্ত করতে আপন মনে বলে ওঠে, বাবা জানেন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেছে কিনা!
‘বাবা’ অবশ্য সেই অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন গুরুদেব। অলকার পিত্রালয়ের সম্পর্কসূত্রে তিনি অলকারও গুরুদেব। শুধু অলকারই বা কেন, সত্যভামারও।
উদার প্রগতিবান সেই ‘বাবা’র মত এই মানুষ হচ্ছে সোনার জাত, ও কখনো অপবিত্র হয় না। তা ছাড়া এও বলেন, ভালমন, ভুল-ঠিক, এ সবের বিচার করবার তুই কে রে? মন হচ্ছে মহেশ্বর, সে যা চাইবে তা করতে দিতে হবে তাকে, ফলাফলের চিন্তার দরকার নেই, সব ফলাফল গুরুর চরণে সমর্পণ করে তুড়ি দিয়ে কাটিয়ে দিবি ব্যস।
এমন উদারপন্থী ‘বাবা’র শিষ্যশিষ্যার সংখ্যা যে অগুনতি হবে, তাতে আর সন্দেহ কি? অলকার পিতৃকুলের কি মাতৃকুলের কেউ একজন হয়তো আদি শিষ্যত্বের দাবি করতে পারেন, কিন্তু তারপর তিনকুলের কেউ আর বাকি নেই।
তবে অলকার এমনি কপাল, তরুণ মেয়েটাকেও ‘বাবা’র চরণে সপে দিতে পেরেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত স্বামীটিকে নোওয়াতে পারলো না। অথচ ঘরে বাইরে সবাই বলে অলকার ভাগ্যে যেমন বশংবদ স্বামী, কটা মেয়ের ভাগ্যে তেমন জোটে?…আর শাশুড়ী ননদরা তো স্পষ্টাস্পষ্টি স্ত্রৈণই বলে।
