হঠাৎ নিজেকে ধরা দিতে এলেন কেন ইনি?
বকুল কারণটা ঠিক বুঝতে পারলো না। তাই আলগা গলায় বললো, এই একটা মেয়ে ইয়ে জলপাইগুড়িতে
ও কি সেই লক্ষ্মীছাড়ীর কোনো খবর এনেছিল?
আর একবার চমকে উঠতে হল বকুলকে।
বাঁধ ভেঙে গেলে বুঝি এমনিই ঘটে।
বকুল এই বাঁধভাঙা মূর্তির দিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে। সেই নীচু মাথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীচু গলায় বলে, না তো! ও এমনি একটা মেয়ে। জলপাইগুড়িতে আলাপ হয়েছিল–
ও! অনেকক্ষণ কথা বলছিল কিনা, আমি ভাবলাম–ছোটবৌদি একটু থেমে বোধ করি নিজের দুর্বলতাটুকু ঢাকতেই এমনি হালকাভাবে বলবার মতো বলে ওঠে, বড়লোকের মেয়ে, না? বাবাঃ কী সাজ! যেন নেমন্তন্নয় এসেছে। কী বলছিল এতো?
বকুল মৃদু হেসে বলে, কী বলছিল? ও সিনেমায় নামছে, সেই খবরটা আমায় জানিয়ে প্রণাম করতে এসেছিল।
সিনেমায় নামছে? ভালো ঘরের মেয়ে?
বকুল হেসে ওঠে, কী যে বল ছোটবৌদি! ভালো ঘরের মেয়ে হবে না কেন? খুব ভালো ঘরের মেয়ে, ভালো ঘরের বৌ!
ছোটবৌদি বলে, তা বটে। এখন তো আর ওতে নিন্দে নেই। আগের মত নয়।
তারপর হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলে ওঠে ঘোটবৌদি, লক্ষ্মীছাড়া যদি এরকমও কিছু করতে!
বকুল স্তব্ধ হয়ে যায়।
বকুলের মনে পড়ে না–এ কথার বিরুদ্ধে হাজারো প্রতিবাদ করবার আছে। বকুলকে তাই চুপ করে থাকতে হয়।
শম্পা নামের মেয়েটা হারিয়ে গিয়ে যেন এ সংসারের সবাইকে হারিয়ে দিয়ে গেছে। পরাজিতের মূর্তিতে বসে আছে সবাই। যখন সে নিজে তেজ করে চলে গিয়েছিল, তখন এদের মধ্যেও ছিল রাগ অভিমান তেজ। কিন্তু এখনকার পালা আলাদা, এখন সে এই ভয়ঙ্কর পৃথিবীর কোনো চক্রান্তে হারিয়ে গেছে, কে জানে চিরকালের জন্যেই মুছে যাবে কিনা শম্পা নামটা!
অথচ শম্পার মা আর বাবা কিছুদিন আগেও যদি তাদের তেজ অভিমান অহঙ্কারকে কিছুটা খর্ব করতো, হয়তো সব ঠিকঠাক হয়ে যেতো। শম্পার মার ভিতরের হাহাকার তাই শোকের থেকেও তীব্র। শোকের হাহাকার বাইরে প্রকাশ করা যায়, অনুতাপের হাহাকার শুধু ভিতরকে আছাড় মেরে মেরে ভেঙে গুঁড়ো করে।
শম্পার মা-বাপ যখন পারুলের ছেলের চিঠিতে জেনেছিল শম্পা পারুলের কাছে গিয়ে আড্ডা গেড়েছে, তখন কেন ছুটে চলে যায়নি তারা? কেন অভিমানিনী মেয়ের মান ভাঙিয়ে বলে ওঠেনি, রাগ করে একটা কথা বলেছি বলে সেটাই তোর কাছে এতো বড়ো হয়ে উঠলো?
তা তারা করেনি।
নিষ্কম্প বসে থেকে আস্ত সুস্থ মেয়েটাকে হারিয়ে যেতে দিয়েছে। তাদের বয়েস, বুদ্ধি, বিবেচনা, হিতাহিতজ্ঞান কিছুই কাজে লাগেনি। একটা অল্পবয়সী মেয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেছে সেই সব জিনিসগুলো–বুদ্ধি, বিবেচনা, হিতাহিতজ্ঞান।
ছোটবৌদি বকুলকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার নিজেই কথা বলে, মনটা খারাপ হয়ে থাকলেই যতো আবোল-তাবোল চিন্তা আসে, এই আর কি! ওই মেয়েটা আইবুড়ো না বিয়ে হওয়া?
বিয়ে-হওয়া। ওর স্বামী সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে গেছে, সেই রাগে ও ঘর ছেড়ে
সাধু হয়ে গেছে? সেই রাগে? কী কাণ্ড! এতো এতো অসাধু স্বামী নিয়ে ঘর করছে মেয়েরা, আর
বকুল হেসে ফেলে বলে, আহা সে তো তবু ঘর করছে! সাধু স্বামী যে ওইটিতেই বাদ সেধেছে। অথচ মেয়েরা জানে ঘর করতে পাওয়াই মেয়েদের জীবনে চরম পাওয়া
ছোটবৌদিও হেসে ফেলে, সবাই আর ভাবে কই সে-কথা?
এটা অবশ্য বকুলের প্রতি কটাক্ষপাত।
অবহাওয়াটা যে কিঞ্চিৎ হালকা হয়ে গেল এতে যেন ছোটবৌদির প্রতি কৃতজ্ঞ হয় বকুল। হেসে হেসে বলে, তা যে মেয়ের ভাগ্যে ঘর-বর না জোটে তার আর উপায় কী?
ওই এক ধাঁধা
ছোটবৌদি বলে, তোমার বাপ-ভাই বিয়ে দিলেন না, না তুমিই করলে না তা জানি না। আমি তো তখন তোমার দাদার চাকরির চাকায় বাধা হয়ে দিল্লী-সিমলে টানাপোড়েন করছি
এই সব কথা কোনদিন বলেনি বকুলের ছোঁটবৌদি। অদ্ভুত ভাবে বদলে গেছে মানুষটা। স্বল্পভাষীত্বের গৌরব নিয়েই এ সংসারে বিরাজিত ছিল সে। হঠাৎ যেন কথা বলার জন্যে পিপাসার্ত হয়ে উঠেছে।
তা বটে। বকুল কথায় সমাপ্তিরেখা টেনে দেয়।
চলো খেতে চলো–
বলেও আবার দাঁড়ায় শম্পার মা, বলে ওঠে, আমার পোড়ামুখে বলার মুখ নেই, তবু তুমি বলেই বলছি-ও-বাড়ির খবর জানো?
ও-বাড়ি!
ও-বাড়ি মানে তোমাদের পুরনো বাড়ি গো। তোমার কাকা-জ্যাঠার বাড়ি।
ওঃ! কী হয়েছে? কেউ মারা-টারা–
থেমে যায়। ঠিক যে কে কে আছে সেখানে তা ভাল করে জানে না বকুল। জ্যাঠামশাই এবং কাকারা এবং তাদের পত্নীরা যে কেউই অবশিষ্ট নেই তা জানে। না, বোধ করি ছোটখুড়ী ছিলেন অনেক দিন, আসা-যাওয়া বিরল হয়ে গেছে।
অতএব থেমেই যায়।
ছোটবৌদি মাথা নেড়ে বলে, না, মারা-টারা যাওয়া নয়, ও-বাড়ির জ্যাঠার নাতনী সাইকেলে বিশ্বপরিভ্রমণের দলে মিশে পাড়ি দিয়েছে। ছটা ছেলে আর তার সঙ্গে কিনা ওই একটা মেয়ে। মেয়েকে খুব আহ্লাদী করে মানুষ করেছেন আর কি!
বকুল একটু অবাক না হয়ে পারে না সত্যিই। দর্জিপাড়ার গলির তাদের ওই নিকট আত্মীয়দের কোনোদিনই ভাল করে তাকিয়ে দেখেনি। এইটুকুই শুধু ধারণা ছিল ওরা বেশ পিছিয়ে থাকা, ওদের গলি ভেদ করে সূর্য সহজে উঁকি মারতে পারে না। ওর জেঠতুতো দাদার বৌয়ের অনেকদিন আগের দেখা চেহারাটা মনে পড়লো, একগলা ঘোমটা, নরম-নরম গলা, বয়সে ছোট ছোট দ্যাওর-ননদদের পর্যন্ত ঠাকুরপো ঠাকুরঝি ডেকে কী সমীহ ভাবে কথা বলা! আর মনে পড়লো তার বা হাতখানা। অন্তত ডজন-দেড়েক লোহাপরা দেখেছে তার হাতে শাখা-চুড়ির সঙ্গে। কথার মাঝখানে কেন কে জানে, যখন-তখন সেই লোহাপরা হাতটা কপালে ঠেকাতেন আর দু’কানে হাত দিতেন! মনে হতো–সর্বদাই অপরাধের ভারে ভারাক্রান্ত।
