তা তো দেখছিই। বকুল নমিতার প্রায় ফেটে-পড়া-মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা আক্ষেপের অনুভূতিতে কেমন বিষণ্ণ হয়ে যায়। সেই বিষণ্ণ গলাতেই বলে, আত্মীয়-সমাজের কাছে ছাড়াও আরো একটা হারানো দিক আছে নমিতা, সেটা হচ্ছে নিজের কাছে নিজেকে হারানো
নমিতা আরো একবার যেন কেঁপে উঠলো। তারপর বললো, আমি মুখসূখ একটু অতো কথা বুঝি না। আমি শুধু দেখাতে চাই আমি একেবারে ফেলনা ছিলাম না।
বকুল আর কথা বাড়ায় না।
বকুল আবার সাদাসিধে গলায় বলে, তা যাক, আজ হঠাৎ এসে পড়লে যে? এদিকে কোথাও এসেছিলে বুঝি?
না, আপনার কাছেই এসেছিলাম।
নমিতা ঈষৎ ক্ষুব্ধ গলায় বলে, আপনি আমায় মানুষ বলে গণ্য না করলেও আমি আপনাকে শ্রদ্ধাভক্তি করি। তাই জীবনে একটা নতুন কাজে নামবার আগে আপনাকে
বকুল লজ্জিত গলায় তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, একথা বলছো কেন নমিতা? “মানুষ” বলে গণ্য করি না এটা কেমন কথা? কী নতুন কাজে নামছে বলে শুনি।
নমিতা আবার দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, কাল থেকে আমার ছবির সুটিং আরম্ভ, মানে একটা কন্ট্রাক্ট হয়েছে। নায়িকার রোলই দিচ্ছে।
শুনে খুশী হলাম, বকুল বলে, একটা কার্মজীবন পেয়েছে, এটা মঙ্গলের কথা।
মঙ্গলের কথা?
তা নিশ্চয়। হয়তো এর মধ্যে থেকেই তোমার ভিতরের শিল্পী-সত্তা আবিষ্কৃত হবে।
বলছেন? নমিতা যেন উৎসুক গলায় বলে, আপনার কি মনে হয় আমার মধ্যে কিছু। আছে?
বকুল মনে মনে বলে, আপাততঃ তো মনে হচ্ছে না! তুমি শিল্পকে ভালবেসে এখানে আসছো না বাপু, আসছে নিজের মূল্য যাচাই করতে! তবু বলা যায় না, কার মধ্যে কি থাকে।
মুখে বলে, সকলের মধ্যেই কিছু না কিছু থাকে নমিতা, পরিবেশে সেটার বিকাশ হয়। হয়তো তুমি একজন নামকরা জাস্টিই হবে ভবিষ্যতে। খুব ভাগ্যই বলতে হবে যে এতো। শীগগির পন্থা পেয়ে গেছ। প্রথমেই নায়িকার রোল সহজে কেউ পায় না।
নমিতা একটুক্ষণ স্থিরচোখে তাকিয়ে রইলো বকুলের চোখের দিকে। তারপর আস্তে বললো, আমাকে দেখে কি আপনার মনে হচ্ছে ‘সহজেই পেয়েছি?
এবার বকুলই বুঝি কেঁপে উঠলো।
জলপাইগুড়ির নমিতা যে এমন একটা প্রশ্ন করে বসতে পারে, তা যেন ধারণা ছিল না বকুলের।
বকুলও আস্তে বললো, তা হয়তো মনে হচ্ছে না। তবু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো তোমার শিল্পী-জীবনটাই বড়ো হয়ে উঠুক। তীর্থযাত্রার পথেও তো কতো কাটা-খাঁচা থাকে, থাকে কাদালো!
নমিতার কাজলের গৌরব হঠাৎ ধূলিসাৎ হয়। নমিতা বোধ করি সেটা গোপন করতেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে নীচু হয়ে সকলের পায়ের ধুলো নিয়ে বলে, আপনার আশীর্বাদ সার্থক হোক। যাই।
আরে সে কি!
বকুল আবহাওয়াটা হালকা করতেই হালকা গলায়, এক্ষুনি যাবে কি? এক মিষ্টিমুখ করে খেতে পাবে নাকি? এতোদিন পরে এলে!
না, আজ যাই—
বলে নমিতা তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু তারপরই নমিতা আশ্চর্য এ কাণ্ড করে বসে!
নমিতা সারা শরীরে একটি বিশেষ ভঙ্গীতে হিল্লোল তুলে মোচড় খেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, জলপাইগুড়ির নমিতা একদিন আপনাকে তার জীবন নিয়ে গল্প লিখতে বলেছিল, তাই না? সে লেখার আর দরকার নেই, জলপাইগুড়ির নমিতা মরে গেছে; তার নতুন জন্মের নামটা আপনকে বলা হয়নি-~~-নাম হচ্ছে “রূপছন্দা”! বুঝলেন? রূপছন্দা। হয়তো ভবিষ্যতে তার কথা নিয়ে লেখবার জন্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যাবে, সাক্ষাৎকারের জন্যে বাড়িতে ভিড় জমবে।…আচ্ছা চলি। ছবিটা রিলিজ করলে আপনাকে নেমন্তন্নর কার্ড দিয়ে যাবো।
আকস্মিক এই আঘাতটা হেনে নমিতা দ্রুত গিয়ে গাড়িতে ওঠে। রাস্তার ধারের ওই মস্ত গাড়িটা যে নমিতার, ও-বাড়ি থেকে আসবার সময় সেকথা স্বপ্নেও ভাবেনি বকুল। এখন দেখলো দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো উর্দি পরা ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়ালো, নমিতা উঠে পড়ালো।
বকুল একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
বকুলের বুক থেকে একটা নিঃশ্বাস পড়লো। বকুলের অনেকদিন আগের পড়া একটা প্রবন্ধর কথা মনে পড়লো! বাজে প্রবন্ধ, লেখকও অখ্যাত, এবং ভাষাও ধারালো ছিল বলে মনে পড়ছে না, কিন্তু তার যুক্তিটা ছিল অত।
লেখকের বক্তব্য ছিল–ইহ-পৃথিবীতে আত্মপ্রতিষ্ঠার মূল্য দিতে আত্মবিক্রয় না করছে কে? অর্থোপার্জনের একমাত্র উপায়ই তো নিজেকে বিক্রি করা। কেউ মগজ বিক্রি করছে, কেউ অধীত বিদ্যা বিক্রি করছে, কেউ চিন্তাকল্পনা স্বপ্নসাধনা ইত্যাদি বিক্রি করছে, কেউবা স্রেফ কায়িক শ্রমটাকেই। মেয়েদের ক্ষেত্রেই বা তবে শরীর বিক্রিকে এমন মহাপাতক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে কেন? বহুক্ষেত্রেই তো তার একমাত্র সম্বল ওই দেহটাই।
লেখকের যুক্তি সমর্থনযোগ্য এমন কথা ভাবতে বসলো না বকুল, শুধু হঠাৎ সেটা মনে পড়লো।
কিন্তু এ কথাও তত জোর গলায় বলে উঠতে পারলো না ওর সামনে নমিতা, তোমার ওই রূপছন্দা হয়ে ওঠার কোনো দরকার ছিল না। জগতে বহু অখ্যাত অবজ্ঞাত অবহেলিত মানুষ আছে, থাকবে চিরকাল। তোমার সেই জলপাইগুড়ির “নমিতা বৌ” হয়ে থাকাই উচিত ছিল। তাতেই সভ্যতা বজায় থাকতো, থাকত সমাজের শৃঙ্খলা, আর তোমার ধর্ম।
পিছনে কখন ছোটবৌদি এসে দাঁড়িয়েছিল টের পায়নি বকুল। চমকে উঠলো তার কথায়।
মেয়েটা কে বকুল?
বকুলের কাছে যারা আসে-টাসে বা অনেকক্ষণ কথা বলে, বসে থাকে, চা খায়, তাদের সম্পর্কে ছোটবৌদির কৌতূহল এবং অগ্রাহ্য-সংমিশ্ৰিত মনোভাবের খবর বকুলের অজ্ঞাত নয়, অলক্ষ্য কোনো স্থান থেকে তিনি এদের দেখেন শোনেন এবং প্রয়োজন-মাফিক অবহেলা প্রকাশও করেন, কিন্তু এমনভাবে ধরা পড়েননি কোনোদিন। না, একে ধরা পড়া বলা যায় কি করে, বরং বলতে পারা যায় ধরা দেওয়া।
