অনেকখানি গলাকাটা ব্লাউজের ওপরকার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে নমিতা যে কণ্ঠাভরণখানি স্থাপিত করেছে তার দুতিতেও চোখ ঝলসায়। নমিতার মাথার উপর দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের গোপুরম সদৃশ একটি খোঁপা, নমিতার উগ্ৰ পেণ্ট করা মুখটায় একা ভাবলেশশূন্য ভাব, আর নমিতার লম্বা ছুঁচলো নখগুলো অদ্ভুত চকচকে একটা রঙে এনে করা।
বকুলের হঠাৎ একটা বাজে প্রশ্ন মনে এলো। জলপাইগুড়ি ছেড়েই কি নখ রাখতে শুরু করেছিল নমিতা, না হলে এতো বড় বড় হলো কী করে! নানা ছাদের নকল নখ যে বাজারে কিনতে মেলে, এটা বকুলের জানা ছিল না। বকুল চিরদিনই অলক্ষিত একটা জগতের রহস্য যবনিকা উন্মোচনের চেষ্টায় বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরছে, লক্ষিত জগতের হাটে যে কতো কী রহস্যের বেচাকেনা চলে, তার সন্ধানই রাখে না।
নমিতা বললো, অনেক দিন ধরেই ভাবছি, হয়ে উঠছে না। কতকটা সাহসের অভাবেও বটে।
নমিতার যা কিছু আড়ষ্টতা এখন বোধ করি শুধু পোশাকে গিয়েই আশ্রয় নিয়েছে, কথাবার্তার স্বরে লেশমাত্রও নেই।
বকুল চমৎকৃত না হয়ে পারে না।
বকুল তাই একটু চমৎকার হেসে বলে, কেন, সাহসের অভাব কেন?
অভাব হওয়াই তো উচিত। বললো নমিতা হাতের দামী ব্যাগটা মৃদু মৃদু দোলাতে দোলাতে।
বকুল বললো, বসো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?
তারপর বললো, উচিত কেন? এটা তো তোমার চেনা জায়গা। আমিও অপরিচিত নই।
নমিতা বসলো।
তারপর কাজলটানা চোখটা একটু তুলে বললো, তা ঠিক। আপনি আমার চেনা, কিন্তু আমি কি আপনার চেনা? আমাকে কি আপনার আর জলপাইগুড়ির নমিতা বলে মনে হচ্ছে?
বকুল হেসে ফেলে, তা অবশ্য ঠিক হচ্ছে না।
এটাই চেয়েছিলাম আমি, নমিতা বেশ দৃঢ় আর আত্মস্থ গলায় বলে ওঠে, চেয়েছিলাম আমার সেই দীনহীন পরিচয় মুছে ফেলতে। তাই আমার নিজের কাছ থেকেই অতীতটাকে মুছে ফেলেছি।
বকুল ওর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায় একটু। পেন্ট-এর প্রাণহীন সাদাটে রঙের নীচে থেকে একটা উত্তপ্ত রক্তোচ্ছাস ঠেলে উঠতে চাইছে যেন। তার মানে মুছে ফেলার নিশ্চিন্ততাটুকু নিতান্তই আত্মসন্তুষ্টি। ওই ঠুনকো খোলাটায় একটু টোকা দিয়ে দেখতে গেলেই হয়তো কাজলের গৌরব বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।
বকুল সেই টোকা দেওয়ার দিকে গেল না
বকুল ঐ ঠুনকোটাকেই শক্ত খোলা বলে মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে বললো, তা ভালো। দুটো জীবনের ভার বহন করা বড় শক্ত। একটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলে বাকি ভারটা সহজ হয়ে যায়।
ঠিক বলেছেন আপনি, নমিতা যেন উল্লসিত গলায় বলে, আমিও ঠিক তাই ভেবেছিলাম। এখনো ভাবছি।
বকুল কৌতুকের গলায় বলে উঠতে যাচ্ছিল, মহাজনেরা একই পদ্ধতিতে ভাবেন কিন্তু থেমে গেল। এই মেয়েটার সঙ্গে এ কৌতুকই কৌতুককর।
বকুল খুব সাদাসিধে গলায় বললো, এখন আছো কোথায়?
খুব খারাপ জায়গায়–, নমিতা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বললো, সে আপনাকে বলা যায় না।
বকুল এবার একটু কঠিন হলো। বললো, থাকার জায়গাটা খারাপ হলেও তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে খারাপ নেই, বেশ ভালোই আছে।
হা, ভালো ভালো জামাকাপড় গহনা-টহনা পরেছি-নমিতা হঠাৎ বুনোর মতো বলে ওঠে, এটাই সংকল্প করেছি, যদি নামতেই হয় তত শেষ পর্যন্ত নেমে দেখবো। পাতাল থেকে যদি রসাতলেও যেতে হয় তাই যাবো।
বকুলের মনে হলো, নখটা না হয় নমিতা জলপাইগুড়ি ছেড়ে অবধিই রাখতে শুধু করেছে, কিন্তু কথাগুলোও কি সেই ছাড়া থেকে শিখতে শুরু করেছে? না দীর্ঘদিন ধরে শিখে শিখে পুঁজি করছিলো?
বকুল আর একটু কঠিন আর নির্লিপ্ত গলায় বললো, নিজের জীবন নিয়ে নিজস্ব সঙ্কল্পের অধিকার সকলেরই আছে, কিন্তু আমার কাছে এসেছ বলেই জিজ্ঞেস করছি নমিতা, তুমি কি নামবার সংকল্প নিয়েই তোমার দীনহীন পরিচয়ের আস্তানা থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিলে?
নমিতা হঠাৎ যেন কেঁপে উঠলো।
তারপর আস্তে বলল, জানি না। এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি শুধু ওদের সকলকে দেখাতে চাই, শুধু দুটি খেতে-পরতে দেওয়ার বিনিময়ে যার মাথাটা কিনে রেখেছি ভেবেছিল, সে অতো মূল্যহীন নয়।..আর-আর আমার সেই স্বামীকেও দেখাতে চাই, উচিতমতো ট্যা-খাজনা না দিয়েও চিরকাল সম্পত্তিকে অধিকারে রাখা যায় না। সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়।
বকুল এই প্রগলভ কথার উত্তর দেবে কি দেবে না ভেবেও বলে ফেলে, তুমি তো দেখছি এই ক’দিনে অনেক কথা শিখে ফেলেছে।
নমিতা নড়েচড়ে বসে।
নমিতা হাতব্যাগের মুখটা একটু খুললো, ছোট্ট একটি রুমাল বার করে মুখটা একটু মুছে নিয়ে বেশ দৃঢ় গলায় বলে, এই ক’দিনে? মোটেই তা নয়, অনেক অনেক দিন ধরে এসব ভাবনা ভেবেছি, এসব কথা শিখেছি। তবু চেষ্টাও করে চলেছিলাম, যে গণ্ডির মধ্যে জন্মেছি, আছি, সেখানেই যাতে থাকতে পারি। কিন্তু হঠাৎ চোখটা খুলে গেল। মনে হলো–এই “ভালো থাকার” মানে কী? এই সৎ জীবনের মূল্য কী? একজন লক্ষ্মী বৌকে ওরা দাম দেয়? ‘আমি’ মানুষটাকে দাম দিচ্ছে? তখনই ঠিক করলাম নিজের দাম যাচাই করতে বেরোবো। ভয় ছিলো, লেখাপড়া শিখিনি, সহায়-সম্বল কেউ নেই, এই অচেনা পৃথিবীতে কোথায় হারিয়ে যাবো! হঠাৎ সে ভয়ও একদিন দূর হয়ে গেল। আমার বাপের বাড়ির আত্মীয়রা আবার যখন আমাকে জলপাইগুড়িতে ঠেলে দেবার চেষ্টা করলো, তখনই হঠাৎ মনে হলো, কাঁদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবার ভয়? বাইরের জগতে মেয়েমানুষের দুটো ভয়। একটা যা সব মানুষেরই আছে, প্রাণের ভয়। সেটা আমার মতো মেয়ের পক্ষে বেশী নয়। আর একটা ভয়দুর্গতিতে পড়বার ভয়। তা মনে যদি সঙ্কল্প করে নিই যে কোনো দুর্গতিই আসুক লড়ে দেখবো, তাহলে আর ভয় কী রইলো? তারপর তো দেখছেনই।
