থামলো মাধুরী! নিরাভরণ হাতটা তুলে কপালে উড়ে আসা একটা মাছি তাড়ালো।
তারপর আস্তে বললো, শুধু আমার বুবুনই নয় বকুল, দেশ জুড়ে হাজার হাজার বুবুন এইভাবে প্রতিনিয়ত গ্রাসিত হচ্ছে। কিন্তু এর মূলে হয়তো আরো গভীর কারণ আছে। আজকের ছেলেমেয়েদের সব চেয়ে বড়ো যন্ত্রণা তারা শ্রদ্ধা করবার মত লোক পাচ্ছে না। ওদের মনের নাগাল পায়, এমন মা-বাপ পাচ্ছে না। ওদেরকে ভালবাসার বন্ধনে বাঁধতে পারে, এমন ভালবাসার দেখা পাচ্ছে না। আমরা আমাদের নিজের মনের মত করে ভালবাসতে জানি, ওদের মনের মত করে নয়।.. হয়তো আগের যুগ ওতেই সন্তুষ্ট থাকতো, এ যুগের মন-মেজাজ দৃষ্টিভঙ্গী আলাদা, কারণ যে কারণেই হোক এদের চোখ কান বড় অল্প বয়সেই খুলে গেছে। এরা তাই “লোভ”কে লোভ বলে বুঝতে শিখেছে, দুর্নীতিকে দুর্নীতি বলে চিনতে শিখেছে। তাই এদের সবচেয়ে নিকটজনদের ওপরই সব চেয়ে ঘৃণা।
তুমি তো খুব ভাবো, আস্তে বলে বকুল।
মাধুরী বোধ করি এতোক্ষণ একটা আবেগের ভরেই এতগুলো কথা বলে চলছিল, হঠাৎ লজ্জা পায়। লজ্জার হাসি হেসেই বলে, এতো কাল এতো সব কিছুই ভাবিনি বকুল। যেদিন বুবুনের বোমা বানানোর খবর পেলাম, খবর পেলাম চিরদিনের মতো অকর্মণ্য হয়ে যাওয়ার, তখন থেকে ভাবতে শিখেছি। ভাবতে ভাবতেই যেন চোখ খুলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বুঝতে পারছি–ওদের মধ্যেকার ভালোবাসতে না পারার ভার, শ্রদ্ধা করতে না পারার ভার, চোখ খুলে যাওয়া মনের জ্বালার ভার ওদের মধ্যে সব কিছু ধ্বংস করবার আগুন জ্বালিয়েছে। নইলে অতটুকু একটা ছেলের মধ্যে এতো ঘৃণা এতো অবজ্ঞা আসে কোথা থেকে? যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম, বলো কী জানো?–কী দেখতে এলে? যেমন কর্ম তেমনি ফল? ভাবো, তবু জেনে রাখো যে হাতটা আস্ত আছে, সেই হাতটা দিয়েই আবার ওই কাজই করবো দেখো। সেই অবধি ভেবেই চলেছি। আর ভাবছি আমাদের বুদ্ধিহীনতা, আমাদের অন্ধতা, আর আমাদের আপাত-জীবনের প্রতি লোভই আমাদের এই ভাঙনের পথে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। মাধুরীবৌ আবার একটু লজ্জার হাসি হাসলো, বললো, এই দ্যাখো থামবো ভেবেও আবার বড়ো বড়ো কথা বলে চলেছি। আসল কথা, এমন একটি বড়োসড়ো লেখিকাকে দেখেই জিভ খুলে গেছে। সত্যি ভাই, কথা বলতে পাওয়াও যে একটা বড়ো পাওয়া, সেটা যত দিন যাচ্ছে তো টের পাচ্ছি। তোমার সঙ্গে কথা কয়ে অনেকদিন পরে যেন বাচলাম।
বকুলের বার বার ইচ্ছে হচ্ছিল একবার জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছিল নির্মলদার? কিন্তু কিছুতেই ওই নামটা উচ্চারণ করতে পারলো না।
যেন ওই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে একটি পবিত্র বস্তুর শুচিতা নষ্ট হয়ে যাবে, যেন একটি গভীর গম্ভীর সঙ্গীত হালকা হয়ে যাবে।
মাধুরী বললো, এতোক্ষণ শুধু নিজের কথাই সাতকাহন করলাম, তোমার কথা একটু বলল শুনি।
আমার আবার কথা কী? বকুল ঈষৎ হেসে বলে, আমার তো আর ছেলে বৌ নাতি নাতনী নেই যে তাদের নিয়ে কিছু কথা জমে আছে!
তোমার তো শত শত ছেলেমেয়ে, তাদের সুখদুঃখ ভাঙাগড়ার সংসারটি নিয়ে তুমি তো সদা ব্যস্ত বাবা!
তা বটে।
এত অদ্ভুত ভালো লেখো কী করে বল তো? মাধুরী হাসে, আমি তো ভেবেই পাই না, কী করে এমন করে ঠিক মনের কথাটি বুঝতে পারো। তোমার লেখার এমন গুণ যেন প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের সঙ্গে চিন্তার সঙ্গে মিলে যায়। পড়লে মনে হয় যেন আমার কথা। ভেবেই লিখেছে। এতে প্লটই যে কোথায় পাও বাবা, ভেবে অবাক লাগে।
এ কথার আর উত্তর কি? চুপ করে থাকে বকুল।
কেমন করে বোঝাবে লেখার মধ্যে প্লটটাই সর্বাপেক্ষা গৌণ। ওটার মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। তবু কেউ যখন বলে ভাল লাগে, তখনই একটা চরিতার্থতার স্বাদ না এসে পারে না। অনেক শুনেছে বকুল এ কথা। সব সময়ই শোনে তবুনতুন করে একটা সার্থকতার সুখ পেলো। আস্তে বললো, পড়োটড়ো?
ও বাবা! পড়বো না? ওই নিয়েই তো বেঁচে আছি। মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, যদি বই জিনিসটা না থাকতো, কী উপায়ে দিনগুলো কাটাতাম।
এই সামান্য কথাটুকুর মধ্য দিয়েই একটা শূন্য হৃদয়ের দুঃসহ ধরা পড়লো। নিজের উপর ধিক্কার এলো বকুলের।
বকুলের এতো কাছাকাছি থেকে এইভাবে দুঃসহ শূন্যতার বোঝা নিয়ে পড়ে আছে মাধুরী, অথচ বকুল কোনোদিন তার সন্ধান নেয়নি। বকুল ভালবেসে নিজের দু’খানা বই নিয়ে এসে বলেনি, মাধুরী-বৌ, তুমি গল্পের বই ভালেবাসো
তবু বর্তমানের সমস্যাটা ওই শূন্যতার থেকে অনেক বাস্তব।
বুবুনের ব্যাপারে কী ভাবছে মাধুরী সেটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল বকুল, বাড়ি থেকে ওদের ঝি এলো ডাকতে, পিসিমা, আপনাকে একজন মেয়ে এসে খুঁজছে।
মুল বিরক্ত গলায় বলে, আশ্চর্য! একটু এসেছি, এর মধ্যেই– কী নাম? কোথা থেকে এসেছ?
ঝি সুবাসিনী বললো, কী জানি বাবা, কী যেন বললো!
২৩. বাইরে থেকে ঢুকতেই
বাইরে থেকে ঢুকতেই সামনের ঘরখানা বাইরের লোকের বসবার ঘর। বকুল ও-বাড়ি থেকে চলে এসে ঘরে পা দিয়েই সেকেণ্ড কয়েক প্রায় অভিভূতের মত তাকিয়ে রইলো।
বকুলের অভিভূত অবস্থার মধেই জলপাইগুড়ির নমিতা নমিত হয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বললো, আবার এলাম আপনার কাছে
নিচু হয়ে প্রণাম করার সময় নমিতাকে খুব আড়ষ্ট দেখতে লাগলো। কারণ নমিতা তার পরনের সাটিনের শাড়িটা আষ্টেপৃষ্ঠে ‘পিন’ মোরে এমন ভাবে গায়ে জিয়ছে যে কোনোখানে ভাজ রাখেনি। নিচু হবার পর উঠে দাঁড়াতেই মিতার কণাভরণের ঝাড় এমন ভাবে দুলে উঠলো যে সারা ঘরের দেওয়ালে যেন তার ঝিলিক খেলে গেল। ওই ঝাড়লণ্ঠনের মতো গহনাটার দোদুল্যমান পাথরগুলো নকল বলেই বোধ করি এতো ঝকমকে।
