বকুল যেন অবাক হয়ে ঘরটার পুরনো চেহারাটা দেখছিল। বকুলদের বাড়িতে ঘর-দালান গলা-দরজাগুলো ছাড়া আর কোথাও কিছু আছে যাতে বকুলের মার হাতের স্পর্শ আছে!
আস্তে বললো, ঘরটার কোনোখানে কিছু বদলাওনি, নড়াওনি! অবিকল রয়েছে সব! কী আশ্চর্য!
মাধুরী বিষণ্ণ একটু হেসে বললো, জিনিসপত্র নাড়িয়ে আর কী নতুনত্ব আনবো ভাই, জীবনটাই যখন অনড় হয়ে বসে আছে!
বকুল ঘাড় নীচু করে বসেছিল।
বকুল এবার সোজা হয়ে বসে বললো, অনড় হয়ে থাকতে পারছো কই! জীবনের মূল শেকড় ধরে তো নাড়া দিচ্ছে আজকের যুগ!
তা দিচ্ছে বটে–মাধুরী বললো, শুনেছো তাহলে?
শুনলাম ছোড়দার মুখে, বকুল বললো, শুনে বিশ্বাস করতে দেরি লাগলো। ছেলেটার। বয়েস হিসেব করতে গিয়ে সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল।
তোমার কি, আমারই গুলিয়ে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে, সত্যিই কি ওর তের বছর বয়েস!
বকুল একটু চুপ করে থাকে বলে, এখন আছে কেমন?
ডাক্তার তো বলছে সারতে সময় লাগবে। আর চিরকালের মতই অকর্মণ্য হয়ে গেল। ডান হাত তো উড়েই গেছে। গলাটা বুজে গেল বলেই বোধ করি চুপ করে গেল মাধুরী।
কোনো কথা খুঁজে না পেয়েই বোধ করি বকুল বললো, দেখতে যাও?
মাধুরী জানলার বাইর চোখ ফেলেছিল, বললো, একদিনই দেখতে যেতে দিয়েছিল। পুলিসের হেপাজতে তো? ওর মা-বাপও তাই! একদিনের জন্য এসেই চলে গেল। বললো, দেখতেই যখন দেবে না! আর
কেমন একটু হেসে থেমে বললো মাধুরী, আর বললো, সেরে উঠে যাবজ্জীবন জেল খাটুক এই আমাদের প্রার্থনা।
বকুল মাধুরীর মুখের দিকে চেয়ে দেখল।
কেউ যদি এখন মাধুরীকে দেখিয়ে বলে, একদা এ স্বর্ণ-গৌরাঙ্গী সুন্দরী ছিল, এর হাসি দেখলে মনে হতে মাধুরী নাম সার্থক, তাহলে লোকে হেসে উঠবে। অতো ফর্সা রং যে এতো কালো হয়ে যেতে পারে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। পুড়ে যাওয়ার মত সেই জ্বলে যাওয়া রঙের মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে বকুল। মাধুরীর সামনের চুলে কালোর চেয়ে সাদার ভাগ বেশী। মাধুরীর শীর্ণ গালে পেশীর রেখা।
অথচ বকুল প্রায় ঠিকঠাকই আছে।
বকুলের নিজের মেজদিই বলে গেছে-থাকবে না কেন বাবা! শশুরবাড়ির গঞ্জনা খেতে হয়নি, সংসার-জ্বালা পোহাতে হয়নি, আমাদের মতন দু’বছর অন্তর আঁতুড়ঘরে ঢুকতে হয়নি, যেমন ঝিউড়ি মেয়ে ছিল তেমনিই রয়ে গেছে। নইলে বকুলই মার পেটের মধ্যে নিরেস ছিল।
তার মানে বুকুলের মার পেটের সরেস চেহারার সন্তানরা ওই সব জ্বালায় বদলে গেছে। কিন্তু মাধুরী-বৌ?
মাধুরী-বৌয়ের তো ওসব কিছু না।
মাধুরী-বৌ বরের সঙ্গে বাসায়-বাসায় ঘুরেছে, শ্বশুরবাড়ির গঞ্জনা কাকে বলে জানেনি। মাধুরী সেই কোন্ অতীতকালে দু’বার আঁতুড়ঘরে গিয়েছিল, আর যায়নি, তবে?
যখন মাঝে মাঝে ছুটিছাটায় আসতো নির্মল, তখন মাধুরী কেমন দেখতে ছিল মনে আনতে চেষ্টা করে বকুল।
কিন্তু তখন কি মাধুরীর দিকে চোখ থাকতো বকুলের?
তবু ভেবে মনে আনলো, সেই স্বর্ণচাপা রংটাই মনে পড়লো, অথচ এখন রংজ্বলা মাধুরীকে বকুলের থেকে ময়লা লাগছে।
বকুল মনে মনে বললো, আমি তোমার কাছে মাথা হেঁট করছি। তোমার ভালবাসায় সর্বস্ব সমর্পণ ছিল।
বকুল ওই ক্ষুব্ধ হাসির ছাপ লাগা মলিন মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললো, মাও বললো এই কথা?
মা-ই বেশী করে বললো। তার সঙ্গে অবশ্য আমাকেও অনেক কিছু বললো। মাধুরী শীর্ণ মুখে আর একবার তেমনি হেসে বললো, বলতেই পারে। বিশ্বাস করে আমার কাছে ছেলে রেখে দিয়েছিল–
আর একটু চুপ করে থেকে বললো, ভগবানের সহস্র নামের মধ্যে দর্পহারী নামটাই প্রধান নাম, বুঝলে বকুল! মনে মনে দর্প ছিল বৈকি। দর্প করেই তো ভেবেছিলাম, ঘুষখোর বাবা তার লোভী মার কাছে থেকে ছেলেটা খারাপ হয়ে যাবে। আমার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখি ওদের আওতামুক্ত করে। ধারণা ছিল না জগৎ-সংসারে আরো কতো আওতা আছে!
কিন্তু শেষের কথাগুলো কি চমকে-ওঠা বকুলের কানে ঢুকেছিল?
ঘুষখোর বাবা এই শব্দটুকুই যেন বকুলের অনুভূতিটাকে ঝাঁপসা করে দিয়েছিল। ঘুষখোর! নির্মলের ছেলে ঘুষখোর!
বকুল একটু পরে বলে, তোমার ছোট ছেলে?
ছোট? সে তো অনেকদিনই নিজেকে সকলের আওতামুক্ত করে স্বাধীনতার সুখের স্বাদ নিচ্ছে। ময়ূরভঞ্জে চাকরি করে, সেখানেই বিয়ে-টিয়ে করেছে, আসে না–
মাধুরী-বৌয়ের ছেলেরা এমন উল্টোপাল্টা হলো কেন?
মনে মনেই প্রশ্ন করেছিল বকুল! তবু মাধুরী উত্তরটা দিলো, বললো, আমাদের অক্ষমতা। ছেলেদের ঠিকমত বুঝতে পারিনি। লেখাপড়া শেখানোটাই মানুষ করার একমাত্র উপায় বলে ভেবেছি। সেই ভাবনাটা যে ঠিক হয়নি সে-কথা যখন বুঝতে পারলাম তখন আর চারা নেই। ..তোমার নির্মলদা মানুষটা ছিলেন বড়ো বেশী ভালোমানুষ, আর আমি?
মাধুরী আবার একটু ব্যঙ্গমাধানো ক্ষুব্ধ হাসি হাসলো, আমি একেবারে স্রেফ হিন্দু নারী। পতি ছাড়া অন্য চিন্তা নেই–অতএব চোখ-কান বন্ধ করে শুধু চুপ করে গেল।
বকুল কিন্তু ওই জীবনে বিধ্বস্ত মুখটার মধ্য থেকেও একটা আশ্চর্য উজ্জ্বল আলোর আভাস দেখতে পেলো। বকুলের মনে হলো বিধ্বস্ত, কিন্তু ব্যর্থ নয়।
মাধুরী তারপর বললো, কিন্তু ওসব তো সাধারণ ঘটনা, জানা জগতের কথা–এই তেরো বছরের ছেলেটাই আমায় তাজ্জব করে দিয়েছে। বড়ো বড়ো কথা বলত ইদানীং। জেঠিমার যে ওই ভাইপোরা আছেন সারা বাড়িটা জুড়ে, তাদেরই কার একজনের ছেলের সঙ্গে খুব মেলামেশা ছিল। দুজনে খুব কথাবার্তা বলতো, কানে আসতো। ছেলেমানুষের মুখে পাকা কথা শুনে হাসি পেতে। বলতো, এই বুর্জোয়া সমাজের মৃত্যুদিন আসছে, ওরা নিজেরাই নিজেদের কবর রচনা করেছে, নিজেদের চিতা বানিয়েছে।…বলতো, বিপ্লব আসছে, তাকে রোখবার ক্ষমতা অতিবড় শাসকেরও নেই। আরো কত কী-ই বলতো ভাই দুজনে ওদের দালানে বসে। চোখে ঠুলি বেঁধে বসে থাকলেই কড়া রোদকে অস্বীকার করা যায় না, রোদ তার নিজের কাজ করে, চামড়া পোড়ায়। জেঠিমার ভাইপোর ছেলেটা তো কত বড়ো, তবু বুবুন যেন তার সমান সমান এইভাবে আড্ডা দিতো…আমি ভাবতাম বুবুন ওই শোনা কথাগুলো আওড়াচ্ছে, হাসি পেতো। বলতাম, বুবুন, বুর্জোয়া বানান জানিস? বলতাম, বুবুন, দেশে বিপ্লবের রক্তগঙ্গা বওয়াবার ভারটা তাহলে তোরাই নিয়েছিস? তুই আর তোর ওই পন্টুদা?…ও এই ঠাট্টায় লজ্জা পেত না, কেমন একরকম অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাতে।…ক্রমে ক্রমে সেই চোখে ফুটে উঠতে দেখলাম অবজ্ঞা, ঘৃণা, বিদ্বেষ আর নিষ্ঠুরতা। তবু তখনো তার গুরুত্ব বুঝতে পারিনি ভাই। বরং মাঝে মাঝেই বলেছি, তোর ওই পন্টুদার সঙ্গে মেশাটা কমা দিকি! ও তোর বয়সী নাকি? যতো রাজ্যের পাকা কথা তোর মাথায় ভরছে!…ক্রমশ দেখলাম ওদের। সেই আড্ডা-আলোচনাটা কমে গেল, পন্টুকে তো বাড়িতে দেখতেই পাওয়া যায় না। বুবুনও যথাসময়ে খেয়ে ইস্কুলে যায়। ইস্কুল থেকে ফিরতে অবশ্য দেরি হতো বিস্তর, রাগ করলে বলতো, কাজ ছিলো।…যদি রেগে বলতাম, তুই এতোটুকু ছেলে, তোর আবার কাজ কি? অবজ্ঞার দৃষ্টি হেনে বলতো, বোঝবার ক্ষমতা নেই। জানো তো শুধু সুশীল সুবোধ বালকদের খাইয়ে খাইয়ে মোটা করতে! তবু তোমায় বলবো কি বকুল, ধারণা করতে পারিনি বুবুন ইস্কুলে যায় না, ইস্কুলের মাইনেটা নিয়ে পার্টিকে চাদা দেয়,.বোমা তৈরীতে যোগ দেয়। বরং ভেবেছিলুম পন্টুর প্রভাবমুক্ত হয়েছে বোধ হয়! কে ভেবেছে পন্টু ওকে গ্রাস করেছে!…
