নির্মলের বংশধর না ছেলেটা? সে গিয়েছিল বোমা বানাতে?
ছোটবৌদি বলে, তাই তো খবর! কুসঙ্গে পড়ে যা হয়! কোথায় কোন বস্তির মধ্যে কার কোন্ আড্ডায় এই সব চলছিল, আশেপাশেরও কেউ জানতো না, হঠাৎ বোমা ফেটে–
কোথায় ছিল ওরা? যন্ত্রের মত উচ্চারণ করে বকুল।
ওমা, এইখানেই তো আজ কতোদিন আছে নির্মলবাবুর বৌ। তা বছর দেড়েক তো হবেই। ছেলে তো বদলির জ্বালায় সাতঘাটের জল খেয়ে বেড়ায়, বাপের চাকরিটাই পেয়েছে, কোম্পানী দিয়েছে দয়াধর্ম করে! নাতিটার পড়া হচ্ছে না বলে ঠাকুমা তাকে নিয়ে এসে ওই পচা বাড়ির মধ্যেই এসে বাস করছিল। ইস্কুলে ভর্তিও করে দিয়েছিল, কিন্তু মেয়েমানুষে ঘরে বসে কেমন করে জানবে গুণধর নাতি ইস্কুলে যায় না, মাইনেগুলো নিয়ে পার্টির চাঁদা দেয়, তার নিজের ধ্বংসের পথ পরিষ্কার করতে–
কিন্তু ছোটবৌদির এসব কথা কি আর মাথায় ঢুকছিল বকুলের?
বকুলের মাথার মধ্যে যেন একটা ইঞ্জিন চলতে শুরু করেছিল ওর সেই প্রথম কথাটার পর থেকেই।
নির্মলবাবুর বৌ তো অনেক দিনই এখানে রয়েছে।
অথচ বকুল তার খোঁজ রাখে না! বকুল তাকে দেখতে যায়নি।
মাধুরী-বৌ কি জানছে বকুলকে কেউ বলেনি একথা? কেউ খবরটা দেয়নি? না, একথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। নির্মলের বৌ জানছে, জেনে নিশ্চিন্ত আছে, বকুল নামের সেই মেয়েটা ‘অনামিকা দেবী’ হয়ে গিয়েছে। যশের, খ্যাতির আর অর্থের অহঙ্কারে ‘বকুল’কে সে জীর্ণ বস্ত্রের মত ত্যাগ করেছে।
হয়ত একটু দার্শনিক হাসি হেসেছে নির্মলের বৌ।
কিন্তু এখন কোন্ কাজটা করবে বকুল?
অপরাধীর মুখ নিয়ে সেই দার্শনিক হাসির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে যাবে–বিশ্বাস করো আমি জানতাম না, আমায় কেউ বলেনি!
নাকি শম্পা নামের বিদ্যুতের শিখাটুকু কোথায় হারিয়ে গেল তার খোঁজ করতে ছুটবে? আস্তে আস্তে উঠে গেল তিনতলায় নিজের এলাকায়।
টেবিলে তাকিয়ে দেখলো, অনেকগুলো চিঠি এসে জমে রয়েছে। যত্ন করে পেপার-ওয়েট চাপা দিয়ে রেখে গেছে কেউ।
হঠাৎ যেন অবাক হয়ে গেল বকুল।
ভাবলো আমি এই সংসার থেকে এই সেবা-যত্ন-সহৃদয়তা পাই, কিন্তু কোনোদিন তো ভেবে দেখিনি এগুলো পাচ্ছি! জন্মসূত্রের অধিকারে এগুলো প্রাপ্য বলেই ভেবেছি, অথবা কিছু ভাবিনি। হয়তো ভেবে দেখা উচিত ছিল, হয়তো সেটা দেখলে আমার প্রকৃতিতে কিছু বদল হতো। নিজের চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পেতাম।
উঠে দাঁড়ালো। এদিকের জানলাটা খুলে দেখলো। কিন্তু জানলাটা থেকে তো শুধু পেছনের দেয়ালটাই দেখা যায় ও-বাড়ির।
শ্যাওলা-পড়া নোনাধরা বিবর্ণ।
আমাদের মনগুলোও ক্রমশ এইরকমই হয়ে যায়, এইরকম শ্যাওলা-পড়া নোনাধরা বিবর্ণ।
ভাবি সেই বিবর্ণ চেহারাটা অন্যের চোখে পড়ে না। কিন্তু সত্যি কি পড়ে না?
২২. মাধুরী বৌ বললো
মাধুরী বৌ বললো, কী যে বলো ভাই! তুমি ইচ্ছে করে আমাকে ভুলে গেছো, এই রুপ ভাববো আমি? জানি তুমি কতো ব্যস্ত মানুষ?
তারপর সেহে বললো, তুমি আমাদের মেয়েদের গৌরব। কতো নামডাক তোমার, কত ভক্ত তোমার। তার মধ্যে আমিও একজন।
বকুল ওর নিরাভরণ এক হাত মুঠোয় চেপে চুপ করে বসেছিল, আস্তে তাতে একটু চাপ দিয়ে বললো, অনেকের মধ্যে একজন মাত্র, এই কথাটা তোমার সম্পর্কে বোল না।
মাধুরী চুপ করে রইল।
বকুল তাকিয়ে দেখল ঘরটার দিকে। আশ্চর্য, বকূলের ছেলেবেলায় বকুল এই ঘরটার যা সাজসজ্জা দেখেছে, এখনো অবিকল তাই রয়েছে। সেই একদিকের দেয়ালে দুদিকে দুটো থামের মতো মেহগনি পালিশের স্ট্যাণ্ডের ওপর লম্বা একখানা আরশি দাঁড় করানো। সেই ঘরে ঢুকেই সামনের দেয়ালের উঁচুতে একটা হরিণের শিঙের ব্র্যাকেটের ওপর পেতলের লক্ষ্মীমূর্তি, সেই সারা দেওয়াল জুড়ে ফটোর মালা, সেই আরশির স্ট্যাণ্ডটার মতই মোটা মোটা বাজুদার উঁচু পালঙ্ক, তার ওধারে মাথাভরা উঁচু আলনা, তার কোলে একটা সরু-সরু পায়া ছোট্ট টেবিলে দু’চারটে বই, এধারের দেয়ালে টানা লম্বা বেঞ্চের ওপর সারি সারি ট্রাঙ্ক, বাক্স, হাতৰাষ্ট্র।
শুধু সব কিছুতে সময়ের ধুলোয় ধূসর বিবর্ণ ছাপ।
আরশির কাঁচে গোল গোল কালো দাগ, ফটোগুলি মলিন হলুদ, ট্রাঙ্ক বাক্সর ঢাকনিগুলো জীর্ণ, আর দেয়ালগুলো বালি-ঝরা স্যাৎসেঁতে বোবা-বোবা।
চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন শুধু আলনাটার। তখন ওই আলনার গায়ে ঝোলানো থাকতো চওড়া-চওড়া পাড়ের হাতে কোচানো শাড়ি, আর লম্বা লম্বা সেমিজ। এখন সে আলনায় কুলছে পাট করা ধোয়া থান, আর সাদা ফর্সা সায়া ব্লাউজ।
এ ঘরটা নির্মলের মার ঘর ছিল। বাড়ির মধ্যে এই ঘরটাতেই বকুলের অবারিত অধিকার ছিল। নির্মলের মা পশম বুনতেন। বকুল বসে বসে দেখতো আর বলতো, বাবাঃ, ওই সরু সরু দুটো কাঠি দিয়ে এইটুকুন এইটুকুন ঘর তুলে বড়ো বড়ো জিনিস তৈরী! দেখলেই আমার মাথা ঝিমঝিম করে, তার শিখবো কি!
নির্মলের মা হাসতেন। বলতেন, শিখলে দেখবি নেশা লেগে যাবে।
তাহলে বাবা শিখেই কাজ নেই আমার।
নির্মলের মা বলতেন, না শিখলে বিয়ে হবে না। মিষ্টি হাসি, মিষ্টি কথা, মিষ্টি মানুষ।
বড়ো জায়ের ভয়ে সদা সন্ত্রস্ত। সুবিধে পেলেই এই ঘরটির মধ্যেই যেন আত্মগোপন করে থাকতেন।
মাধুরী-বৌও কি তিনতলার এই ঘরটা নিজের জন্যে বেছে নিয়েছে পৃথিবী থেকে আত্মগোপন করে থাকবার জন্যে? কিন্তু আজকের পৃথিবী কি কাউকে নিজের মধ্যে নিমগ্ন থাকতে দেয়? লুকিয়ে থাকা নিজস্ব কোটর যদি কোথাও থাকে, তার ওপর আঘাত হেনে হেনে। পেড়ে না ফেলে ছাড়ে?
