কিন্তু অনভ্যাসের বশে পারলো না বকুল।
ওই অন্তরঙ্গতার সুর অনেকদিন হারিয়ে ফেলেছে বকুল। অথবা ছিলই না কোনোদিন। হয়তো তাই–ছিলই না কোনোদিন।
ছেলেবেলা থেকেই অদ্ভুত একটা নিঃসঙ্গতার দুর্গে বাস বকুলের।
সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা নেই তার, ক্ষমতা নেই কারো অন্তরঙ্গ হবার। সে দুর্গের একটি মাত্রই দরজা আছে, সে দরজার চাবি তো অন্যের কাছে।
অথচ লোকে কত সহজেই অন্তরঙ্গ হতে পারে। ওই ছোটবৌদির ব্যাপারেই দেখেছে একদা যখন বড়বৌদির সঙ্গে মুখ-দেখাদেখি নেই, সেইরকম সময় হঠাৎ ছোটবৌদির বাবা মারা যাওয়ার খবর এলো। বকুল কাঠ হয়ে ছোটবৌদির ধারে-কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো, দেখলে বড়বৌদি কী অবলীলায় ছোট জাকে তুলে ধরে প্রায় বুকে টেনে নিয়েই পৃথিবীর নিয়তি বোঝাতে বসলেন। বোঝাতে বসলেন, মা-বাপ চিরদিনের বস্তু নয়।
যেন আর সবাই চিরদিনের।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল বড়বৌদি ছোট জাকে জোর করে তুলে শরবৎ খাওয়াচ্ছেন, হবিষ্যিকালে নেশার জিনিস খেতে নেই এটা মানলেও চা খেতে বিধান দিচ্ছেন এবং ছোট জা’র চতুর্থীর যোগাড় করে দিতে কোমরে আঁচল জড়িয়ে খাটছেন।
দেখে দেখে বকুল হাঁ হয়ে গেছে। বকুলের সাধ্য নেই অমনটি করবার।
কিন্তু ওই না-পারাটা যে একটা বড় রকমের অক্ষমতা, এটা কোনোদিন মনে আসেনি বকুলের। আজ হঠাৎ বকুল টের পেল মস্ত একটা অক্ষমতা আছে তার। তবু বকুল যেটা পারে সেটা করলো। গলাটা নরম করে আস্তে বললে, বারণ করাটা বাজে কথা বৌদি, ওর সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি।
দেখাই হয়নি? ছোড়দার প্রশ্নটাই করলো ছৌটবৌদি। তবু স্বরের পার্থক্য।
ছোড়দা কেমন যেন অবাক তার হতাশ গলায় উচ্চারণ করেছিল প্রশ্নটা। ছোটবোদির গলায় অবিশ্বাসের আঁজ।
সহসা কেঁদে-ওঠা গলায় এই ঝাঁজটা খুব বেমানান লাগলো, আর আরো বেচারী লাগলো মানুষটাকে।
বকুল আস্তে বললো, সত্যিই দেখা হয়নি ছোটবৌদি। আমি যাওয়া মাত্রই সেজদি বলে উঠলো, তুই আজ এলি বকুল? কালকে এলেও মেয়েটার সঙ্গে দেখা হতো।
এতোদিন তো ছিল-
প্রশ্ন না উক্তি?
ঝাঁপসা গলায় যেটা উচ্চারণ করলো শম্পার মা?
এতোদিন যে ছিল সেখানে, সে খবর তো শম্পার মার জানা। শুধু কিছুতেই নত হবো না এই নীতিতেই চুপ করে ছিল। হয়তো বা নিরাপদ একটা আশ্রয়ে আছে জেনে নিশ্চিন্তও ছিল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে মনটা ভেঙে আসছিল বৈকি।
শান্ত বাধ্য বিনীত সন্তানের বিচ্ছেদব্যথা মাতৃহৃদয়কে যত কাতর করে, তার চেয়ে অনেক বেশী কাতর করে উদ্ধত অবাধ্য দুরন্ত সন্তানের বিচ্ছেদব্যথা। সেই অবাধ্য সন্তানের স্মৃতিমন্থনে যে দুঃসহ বোঝা জমে ওঠে, সে বোঝা তো আপন অপরাধের বোঝ।
অবাধ্য সন্তানকে যে নিষ্ঠুর শাসন না করে উপায় থাকে না, কটু কথা না বলে উপায় থাকে, দুর্ব্যবহার না করে পারা যায় না, সেইগুলোর স্মৃতি তীক্ষ্ণধার অস্ত্রের মতো প্রতি মুহূর্তেই তো ক্ষতবিক্ষত করতে থাকে সেই হৃদয়।
সমস্ত নিষ্ঠুর শাসন শতগুণ হয়ে ফিরে আসে নিজেরই কাছে। শম্পার মার এই ভিতরে ভিতরে গুঁড়ো-হয়ে-যাওয়া মনটা বাইরে শক্ত হয়ে থাকবার সাধনায় আরো গুঁড়ো হচ্ছিল, তাই বুঝি মনে মনে একান্তভাবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিল, বকুল তাদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে মেয়েটাকে নিয়ে আসবে!
বকুলের কথা সেই লক্ষ্মীছাড়া মেয়েটা অগ্রাহ্য করতে পারবে না।
বকুলের কথায় সেই প্রত্যাশার পাত্রটি চূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়লো, শম্পার অহঙ্কারী মা তার চিরদিনের অহঙ্কারটাকেও তাই আর ধরে রাখতে পারলো না।
বকুল সেই গুঁড়ো হয়ে যাওয়া অহঙ্কার আর গুড়ো হয়ে যাওয়া প্রত্যাশার পাত্রখানা দুটোই দেখতে পেলো। বকুল নিঃশ্বাস ফেলে বললো, আমার ভাগ্য। ছিল তো এতদিন, পরশু পর্যন্ত ছিল। কাল আমি গেলাম, আর কালই শুনলাম। মুশকিল এই–কোথায় যে যেতে পারে বোঝা যাচ্ছে না–।
তারপর বকুল আস্তে আস্তে সাবধানে পারুলের কাছে শোনা ঘটনাকে ব্যক্ত করে।
ছোটবৌদির কান্নার চোখ শুকিয়ে উঠেছিল, পাথরের মত বসে থেকে সবটা শুনে বলে ওঠে সে, এ আমাদের পাপের ফল বকুল, বুঝতে পারছি। সব জেনেও আমরা–ওকে আর ফিরে পাব না বকুল! ওকে নিশ্চয় কোনো বদমাইস ভুল বুঝিয়ে নিয়ে গেছে। ঠিকই হয়েছে, উচিত শাস্তি হয়েছে আমার। চিরদিন তোমার উপর একটা হিংসের আক্রোশে ওকে আমি মায়ের প্রাণটা বুঝতে দিইনি, আর ওকেও বুঝতে চেষ্টা করিনি।
বকুল চমকে তাকায়।
এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তির সামনে বকুল আর একবার মাথা নত করে। এ সত্য বকুলের অবোধ্য ছিল না, কিন্তু ওই মানুষটারও যে সে বোধ ছিল, তা তো কোনোদিন বিশ্বাস করেনি। ভেবেছে নিতান্তই অবচেতনে এটা করে চলেছে ও।
অথবা হয়তো সত্যিই তাই।
শুধু আজকেই মেয়েটাকে সত্যিই হারিয়ে ফেলে ওর বোধের দরজা খুলে গেল। আঘাতই তো রুদ্ধ চৈতন্যকে ঘা মেরে জাগায়!
বকুল ওকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে না, নিজেও যে সে ওই হাহাকারের শরিক! বকুল শুধু নরম গলায় বলে, ছোড়দার সঙ্গে পরামর্শ করে দেখি কী করা যায়। কিন্তু নির্মলদের বাড়ির কী কথা বলছিলো ছোড়দা?
ছোটবৌদি কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, সে-ও এক কাণ্ড!..বারো-তেরো বছরের ছেলেটা, কিনা বোমা বানাতে গিয়ে হাত-পা উড়িয়ে হাসপাতালে গেছে!
বোমা বানাতে গিয়ে?
অবাক হয়ে তাকায় বকুল।
