তা জগৎসংসারে সবাই যখন আপন স্বার্থটি দেখছে, জেঠিমাই বা কেন না দেখবেন? দেখেছেন তিনি। ভাইপোদের আনিয়ে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এসব খবর ছিটকে ছিটকে কানে এসেছে বকুলের, তার সঙ্গে এও কানে এসেছে, একেই বলে রাজা বিনে রাজ্য নষ্ট! কী বাড়ি কী হলো! কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে ওই জেঠির ভাইপো দুটো বাড়িটাকে যেন নরককুণ্ডু করলো গো! করবে না কেন, নিজেদের পিতৃপুরুষের ভিটে তো নয় যে মনে একটা ইয়ে আসবে? তাই সারা বাড়িটার খোপে খোপে ভাড়াটে বসিয়েছে। এখানে টিনের ঘের, ওখানে ক্যাম্বিসের পর্দার আড়াল, সেখানে নিরাবরণ ইটের দেওয়াল তোলা আবরণ, এমন কি গেটের ধারের চাকরের ঘরটাতে পর্যন্ত পানের দোকানদার বসিয়েছে।
অতএব নরককুণ্ডু বলাটা আতিশয্য নয়। তবে? কে তাকাতে যায় নরককুণ্ডুর দিকে? বকুলদের তিনতলার সিঁড়ির থেকে নামতে মাঝামাঝি চাতালটা থেকে যে ছোট্ট বারান্দাটুকু যেন আকস্মিকভাবে বেরিয়ে পড়েছে, সেখান থেকেও শুধু ওদের বাড়ির সেই কোণের দিকটা। দেখা যায়, যেদিকটা চাবিবন্ধ পড়ে থাকে।
তারপর তো হঠাৎ একদিন খবর এলো, ওই অংশের মালিক ছুটি পেয়ে অন্যত্র চলে গেছে, আর কোনোদিন এসে ওই তালার চাবি খুলবে এমন আশা নেই।
নির্মলের বৌ হয়তো কদাচ কখনো এসেছে, তারপর ছেলের কাছে কোথায় যেন থেকেছে সেই ছেলে যে এতো বড়ো হয়ে গেছে, যার ছেলে একটা গোলমাল বাধাতে পারে, এটা বুঝতে সময় লাগলো বকুলের।
তারপর আস্তে আস্তে মনে পড়ল, অসম্ভব হতে যাবে কেন? দিন মাস বছর গড়িয়ে চলেছে নির্ভুল নিয়মে।
আমরা যদি কাউকে ভুলে যাই, ভুলে থাকি, সে কি বাড়তে ভুলে যাবে? কিন্তু সেই অতোটুকু টা কতটুকু? কোথায় বসে বাধালো সে গোলমাল? ওই জরাজীর্ণ দেয়ালটার ওধারের চাবিবন্ধ ঘরগুলোর চাবি খোলা হয়েছে নাকি? রাস্তা থেকে শুধু সামনের ওই পানের দোকানটা, আর দোতলার বারান্দার রেলিং-এর জানলার কার্নিশে ভাড়াটেদের ঝুলন্ত জামা কাপড় গাছা লুঙ্গি বিছানা শতরঞ্জি ব্যতীত আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না।
তবু বোকাটে চোখে ওই বাড়িটার দিকেই তাকালো বকুল। যেন ছোড়দার বলা ওই শব্দগুলোর পাঠোদ্ধার হবে ওখানের দেয়ালে দেয়ালে।
ছোড়দা যে বকুলকে বাড়ির ভেতরে যেতে বললো সেকথা ভুলে গিয়ে বকুল আস্তে বললো, কতো বড়ো ছেলে?
আরে কতো বড়ো আর হবে! বছর বারো-তেরো! নিজেরও তেমন সাতসকালে বিয়ে হয়েছিল, ছেলেরও তো তাই দিয়েছিল। দিয়েছিল ভালই করেছিল, জীবনের কাজ-কর্তব্য চুকিয়ে গেছে। আমারই কিছু হোলো না। যাক শুনো পরে
ছোড়দার কথায় যেন একটা ক্ষুব্ধ আক্ষেপের সুর! যেন নির্মল নামের সেই চালাকচতুর লোকটা বকুলের ছোড়দার থেকে জিতে গেছে!
বকুলের চিন্তার মধ্যে এখন আর ওই বয়েসের অঙ্কটা ঢুকলো না, ওর শুধু মনে হলো জীবনের কাজ-কর্তব্য বলতে কি ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে ফেলা? ছোড়দা সেটা পেরে ওঠেনি বলে ছোড়দা ক্ষুব্ধ?
ছোড়দা আবারও নির্দেশ দিলল, শুনো পরে।
কী সেই গোলমেলে ব্যাপারটা, যা অতোটুকু ছেলের দ্বারা সংঘটিত হতে পারে? রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর প্রশ্ন চলে না। তবু বকুল আর একটা কথা বললো, বললো, তুমি এসময় এভাবে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে?
ছোড়দা যেন আত্মধিক্কারের গলায় বলেন, আমাদের আবার এভাবে সেভাবে! দাঁড়িয়ে আছি বাড়ির মধ্যে ছটফটানি ধরলো বলে!
তোমার–, থেমে গেল বকুল।
বকুলের হঠাৎ মনে পড়লো, শীগগিরের মধ্যে রিটায়ার করার কথা ছিল ছোড়দার, বোধ হয় সেই ঘটনাটাই ঘটেছে। তাই তোমার অফিসের বেলা হয়ে যাচ্ছে না? বলতে গিয়ে থেমে গেল।
ভিতরে ঢুকতেই আর এক পরম লজ্জার মুখোমুখি দাঁড়াতে হলো বকুলকে। বকুল সত্যিই এটা ভাবেনি। ওকে ঢুকতে দেখেই ছোটবৌদি বলে উঠলো, পেয়ারের ভাইঝিকে নিজের তিনতলায় নিয়ে তোলোগে বাবা, তোমার দাদা দেখলে পরে আগুন হয়ে উঠবে। একেই তো নানা কাণ্ডয় ক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
তার মানে এরা ধরেই রেখেছিল বকুল খবর পেয়ে শম্পাকে আনতে ছুটলো! এবং এ-ও ধরে রেখেছিল, আমরা যতই বারণ করি ও যা করতে যাচ্ছে ঠিকই তা করবে!
ছোঁড়দার ওপর মায়া হয়েছিল, কিন্তু এখন যেন আর সে-বস্তুটা তেমন এলো না বকুল নিজস্ব স্থিরতার খোলসে ঢুকে পড়ে বললো, গাড়ি থেকে নামতেই ছোড়দাও এইরকম কী এক বললো, মানে বুঝতে পারিনি, তোমার কথারও পারছি না। আমি শম্পাকে নিয়ে এসেছি এরকম একটা ধারণা কেন হলো তোমাদের।
ছোটবৌদি এই পরিষ্কার ধারালো কথাটার উত্তরের দিক দিয়ে গেল না, কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখে বললো, আসেনি?
বকুল তেমনি স্থির গলায় বলে, আসার কথাটাই যে উঠছে কেন তা বুঝছি না, তাছাড়া তোমরা তো বিশেষ করে বারণ করে দিয়েছিলে!
হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটলো।
অপ্রত্যাশিত এবং অভূতপূর্বও বটে।
ছোটবৌদিকে কে কবে কেঁদে ফেলতে দেখেছে?
অন্তত বকুল কখনো দেখেনি এটা নিশ্চিত। সেই হঠাৎ কেঁদে ফেলা বিকৃত গলায় বলে উঠলো ছোটবৌদি, সেই বারণ করাটাই এতো বড়ো হলো তোমার কাছে?
বকুল স্তব্ধ হয়ে গেল।
বকুলের নিজেকে হঠাৎ ভারী ছোট মনে হলো। বকুল বরাবর যাকে (অস্বীকার করার উপায় নেই) মনে মনে প্রায় অবজ্ঞাই করে এসেছে, সে যেন সহসা বকুলের থেকে অনেকটা উঁচু আসনে উঠে গেল।
বকুলের ইচ্ছে হলো ছোটবৌদির খুব কাছে সরে যায়, ওর গায়ে একটু হাত ঠেকায়, মমতার গলায় বলে, ওটা আমি মনের দুঃখে বলেছিলাম ছোটবৌদি, ওর সঙ্গে দেখা হলে হয়তো নিয়ে না এসে ছাড়তাম না, কিন্তু দেখাই হয়নি!
