তারপর যখন বিয়ে-হয়ে-যাওয়া পারুল মাঝে মাঝে এসেছে, রাত ভোর করে গল্প করেছে। বকুলের খাতা তখন আস্তে আস্তে আলোর মুখ দেখছে।
আর পারুলের খাতা আলোর মুখ দেখবার কল্পনা ত্যাগ করে আস্তে আস্তে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। সন্দেহবাতিক অথচ একেবারে পত্নীগত প্রাণ স্বামী অমলবাবু’র পুঞ্জীভূত আক্রোশ যে ওই খাতাটারি উপরই, সেটা বুঝে ফেলে ঔদাসীন্যের হাসি হেসে খাতাটা বাক্সের নীচে পুরে ফেলেছে পারুল।
বকুল বলতো, ইস! এখানেও নিয়ে আসিসনি? আমি তো দেখতাম!
পারুল বলতো, দৃর! আর লিখিই না। কী হবে কতকগুলো বাজে কথা লিখে?
ওটা পারুলের বিনয়, লেখাটা ছাড়তে পারেনি সে, শুধু তাকে একেবারে গভীর অন্তরালের বস্তু করে রেখেছিল।
এখনো কি লেখে না মাঝে মাঝে?
বকুল বললল, লক্ষ্মীটি সেজদি, বার কর না, দেখি এই অনির্বচনীয় নিরালায় কি লিখেছিস তুই এতোদিন ধরে?
পারুল হাসলো, উঠলো, কিন্তু আলো জ্বালাতে গিয়ে দেখলো কোন্ ফাঁকে ফিউজড হয়ে বসে আছে।
দেখলি তো–, ছেলেমানুষের মত হেসে উঠলো পারুল, আমার জীরনের এবং কবিতার এটা হচ্ছে প্রতীক! আলো ফিউজড!
বকুল হাসলো না, একটু চুপ করে থেকে বললো, ভোরের গাড়িতে যাবার কথা, তোর তো অনেক আগে উঠে গুছিয়ে-টুছিয়ে নেওয়ার দরকার ছিলো, অন্ধকার হয়ে থাকলো-
পারুলের গলার সেই হাসির আমেজটা মুছে গেল, পারুল বললো, না রে, আমি আর যাচ্ছি না।
যাচ্ছিস না?
না! ভেবে দেখছি আমার এই যাওয়াটার কোনো মানে হবে না। তোর পায়ে পায়ে ঘুরে শুধু বাধাই সৃষ্টি করবে। তাছাড়া, একটু ক্ষুব্ধ হাসি হেসে বললো, সেটা অবশ্য আমার ইচ্ছের ফসল, তবু ভাবছি, যদি মেয়েটা কোনো ঘটনার চাপে আবার ফিরে আসে আজকালের মধ্যে?
কথাটা অযৌক্তিক নয়।
বকুল বললো, তবে ঘুমো। আমি যাবার সময় ডেকে তুলে বলে যাবো।
পারুল বললো, তার থেকে তুই ঘুমো, আমিই তোকে ডেকে তুলে দেবো।
হেসে ফেললো আবার দু’জনই। জানে ঘুম কারুরই হবে না।
২১. বকুল যখন বাড়ির সামনে
বকুল যখন বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামলো, তখন আকস্মিক ভাবেই ছোড়দার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল ঢলঢলে একটা গেঞ্জি আর আধময়লা একটা ধুতি পরে। গেঞ্জির গলার ফাঁক দিয়ে পৈতের একটুখানি দেখা যাচ্ছে।
ছোড়দাকে দেখে বাড়ির বামুনঠাকুর-টাকুর মনে হচ্ছে, বকুলের আবার ছোড়দাকে দেখে মন-কেমন করলো। ছেলেবেলায় সব ভাইদের মধ্যে ছোড়দাই সবচেয়ে শৌখিন ছিলো।
বলতে যাচ্ছিল, কী ছোড়দা, এখানে দাঁড়িয়ে যে? তার আগেই ছোড়দা বলে উঠলো, কী, তুই আজই ফিরে এলি যে?
বকুল দেখতে পেলো ছোড়দা গাড়ির মধ্যে অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
হয়তো বকুলের চোখের ভ্ৰম, হয়তো বকুলের মনের কল্পনা, তবু বকুলের মনে হলো, সেই সন্ধানী দৃষ্টির অন্তরালে একটি প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল, সেটা নিভে গেল।
বকুল মিটার দেখে ভাড়া চুকিয়ে ফিরে তাকিয়ে বললো, চলেই এলাম।
তারপর আর প্রশ্ন করবে না ছোড়দা, জানা কথা। হয়তো অন্যদিন হলে বকুলও আর কথা বলতো না, আজ কি জানি কেন নিজে থেকে বললো, মেয়েটার সঙ্গে দেখা হলো না।
অসতর্কেই বোধ হয় ছোড়দার মুখ থেকে প্রায় আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এলো, দেখা হলো না?
নাঃ! কালই সকালে চলে গেছে।
ছোঁড়দা একটু চুপ করে থেকে বললো,গেলেন কোথায়?
চসেজদি তো বললো, কলকাতাতেই ফিরে এসেছে। একটু গোলমেলে ব্যাপার আছে। বললো, কারণ ভাবলো বলাই উচিত।
ছোড়দা ধিক্কারের গলায় বলে উঠলো, ভালো। এ যুগের ছেলেমেয়েরা তো গোলমাল বাধানোই বাহুদুরি বলে মনে করেন। নির্মলের ছেলের অতোটুকু ছেলেটা যা করেছে–আচ্ছা শুনো পরে, এখন বাড়ির মধ্যে যাও।
নির্মলের ছেলের অতোটুকু ছেলেটা যা করেছে
এটা আবার কোন্ ভাষা?
বকুল ওই শব্দ ক’টার অর্থ আবিষ্কার করতে পারে না। অবাক হয়ে ছোড়দার মুখের দিকে নয়, নির্মলদের বাড়িটার দিকে তাকায়। যেন বাড়িটার ওই জীর্ণ দেয়ালটার গায়ে অর্থটা লেখা আছে।
ওই বাড়িটা থেকে নির্মল নামের অস্তিত্বটা কত-কতোদিন আগে যেন মুছে গিয়েছিল, ওর দিকে তাকিয়ে দেখার কথা আর মনে পড়েনি এতো দিন।
বদলির চাকরি করতে নির্মল, ছুটিতে ছুটিতে বাড়ি আসত, সে ঘটনা কবেকার? বকুল তার সব খবর জানত বৌদিদের কলকাকলীর মধ্যে থেকে। কানে এসেছে মা-বাপ মারা যাওয়ার পর নির্মল আর কলকাতায় আসে না, ছুটি হলে বরং অন্য দেশে যায়। নির্মলদের ঘরগুলো চাবি বন্ধই পড়ে থাকে।
আর বাকি সারা বাড়িটা?
যেটা নাকি নির্মলের প্রবল প্রতাপ জেঠিমার দখলে ছিল? সেটার দখলদার তখন জেঠিমার দুই ভাইপো। জেঠিমা যখন নিঃসন্তান, তখন তার ভাইপোরা তার উত্তরাধিকারী হবে এটাই স্বাভাবিক। শেষ বয়সে তাকে দেখবার জনোও তো লোক চাই?
সেই নিঃসন্তানা ভদ্রমহিলা, শ্বশুরকুলের যাদের জন্যে জীবনপাত করলেন, জা, দ্যাওর, দ্যাওরপো, দ্যাওরঝি ইত্যাদি, তারা কি তাঁকে দেখলো? জা দ্যাওর দিব্যি তার আগে মরে কর্তব্য এড়িয়ে গেল, আর দ্যাওরপো ল্যাওরপো-বৌ বাসায় গিয়ে মজায় কাটাতে লাগলো, তিনি তবে পিতৃকুলের শরণ নেবেন না কী করবেন?
দ্যাওরপোরই না হয় চাকরি; কী করবে পরের দাসত্ব, কিন্তু বৌ থাকতে পারতো না ছেলেদের নিয়ে কলকাতায়? কলকাতায় ছেলেদের পড়াবার মত ইস্কুল নেই? তাই নানাস্থানী বাপ শেষ অবধি ছেলেদের বোর্ডিঙে, হোস্টেলে রেখে মানুষ করছে। তা তো নয়, ‘কর্তা-গিন্নী’ কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারবেন না!
