হ্যাঁ, সংসারে যারা একটু উদারতা নিয়ে আসে, কেউ তাদের দেখতে পারে না।
পারুল একটু হাসলো, আজ এই একটা পুরনো মানুষ দেখে তোর বুঝি যতো পুরনো মানুষদের মনে পড়ছে?
বকুল ঠিক ওই কথাটার উত্তর না দিয়ে আস্তে বললো, মারা গেছেন সনৎকাকা।
মারা গেছেন!
পারুল হঠাৎ ফট করে একটা বেখাপ্পা কথা বলে বসলো, বললো, ওমা এতোদিন বেঁচে ছিলেন নাকি?
তারপর বোধ করি বকুলের মুখটা দেখতে পেয়ে বললো, কারুর কোনো খবর তো জানতে পারি না, রাখিও না। অনেক দিনের মানুষ তো, তাই ভাবছিলাম–
বকুল শান্ত গলায় বললো, হ্যাঁ, অনেক অনেক দিনের মানুষ।
ছিলেন কোথায়?
কলকাতাতেই। নীরুদার কাছেই থাকতে হয়েছে শেষ জীবনে। দিল্লীতে থাকতেন, নীরুদা রিটায়ার করে কলকাতায় এলে-কলকাতাতেই চলে এসেছিলেন। দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, নীরুর সংসারের মালপত্তরগুলোর মধ্যে আমিও তো একটা, আমায় নিয়ে আসা ছাড়া আর গতি কি ওদের?
পারুল একটু চুপ করে থেকে বলে, নীরুদা ভাইপো বলেই যে সনৎকাকাকে ওর সংসারের মালপত্রের সামিল হয়ে যেতে হয়েছিল, তা ভাবিস না বকুল। নীরুদা ওর নিজের ছেলে হলেও তফাৎ হতো না কিছু। খুব অবহেলার মধ্যে থাকতে হয়েছে বোধ হয়, না রে?
বকুল প্রায় হেসে উঠেই বলে, উঁহু, মোটেই না। আদর-যত্নের বহর দেখবার মতো। নীরুদার বৌ কোলের বাচ্চা ছেলের মত শাসন করে দুধ খাইয়েছে, ওষুধ খাইয়েছে, নীরু শহরের সেরা ডাক্তারদের এনে জড়ো করেছে।
অনেক টাকা ছিল বুঝি সনৎকাকার?: মুচকি হেসে বললো পারুল।
নাঃ, তুই দেখছি আগের মতই কুটিল আছিস, বকুল এবার গলা খুলে হেসে ওঠে, গঙ্গার এই পবিত্র হাওয়া তোর কোনো পরিমার্জনা করতে পারেনি। ঠিক আগের মতই কার পিছনের কারণটা চট করে আবিষ্কার করে ফেলতে পারিস।
তারপর আবার গম্ভীর হয়ে যায়, পারুলের মুখের সকৌতুকু রেখার দিকে তাকিয়ে বলে, ছিল বোধ হয় অনেক টাকা, মাঝে মাঝে গিয়েছি তো কখনো কখনো, একদিন বলেছিলেন, বরাবর ভাবতুম, সারাজীবন ব্যয়ের থেকে আয়টা বেশী হয়ে যাওয়ায় যে ভারটা জমে বসে আছে, মরার আগে সেট কোনো মিশনে-টিশনে গিয়ে দিয়ে যাবে, কিন্তু এখন দেখছি সেটা রীতিমত পাপকর্ম হবে। অতএব বরাবরের ইচ্ছেটা বাতিল করছি। তোর কি মনে হয়, এটাই ঠিক হলো না?
বললাম, আপনাকে আমি ঠিক-ভুল বোঝাবো?
সনৎকাকা বললেন, তা বললে কি হয়? শিশুদের তো বড়দের বুদ্ধি নেওয়া উচিত, আর আমার এখন দ্বিতীয় শৈশব চলছে।
বলেছিলাম, অবশ্য হেসেই বলেছিলাম, বোধ হয় এটাই ঠিক, কারো আশাভঙ্গের অভিশাপ লাগবে না।…কিন্তু ভারী দুঃখ হয়েছিল সেদিন। অনেক সমারোহের আড়ালে হঠাৎ যখন ভিতরের নিতান্ত দৈন্যটা ধরা পড়ে যায়, দেখতে কী করুণই লাগে! শুধু অনেক টাকা থাকলেও কিছু হয় না রে সেজদি, গদি বজায় রাখতে অনেক খাটতে হয়। ওদের দুজনের ছলনায় গড়া ওই উচ্চ আসনটি বজায় রাখতে কম খাটতে হয়েছে বুড়ো মানুষটাকে। ও-বাড়িতে গিয়ে বসলেই কী মনে হতো জানিস, যেন স্টেজে একটা নাটক অভিনয় হচ্ছে, সনৎকাকাও তার মধ্যে একটি ভূমিকাভিনেতা।
পারুল বলে, তোর এখনো এই সব নাটক-ফাটক দেখে আশ্চর্য লাগে, এটাই যে ভীষণ আশ্চর্যি রে!–মোহন শোভন মাঝে মাঝে দু’এক বেলার জন্যে বৌ ছেলে নিয়ে বেড়াতে আসে, দেখলে তোর নিশ্চয় খুব ভাল লাগতো। অভিনয়ের উৎকর্ষও তো একটা দেখবার মতো বস্তু।
তাহলে আর বলার কি আছে? বকুল বলে, এই রকমই হয় তাহলে?
ব্যতিক্রমও হয় বৈকি, নাহলে ইহসংসার চলছে কিসের মোহে? তবে তোর নিজের জীবনেই কি তুই দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পেরেছিস! জানি না ঠিক, পরলোকগত প্রবোধচন্দ্রের সংসারমঞ্চের মধ্যে তোকে যারা দেখছে, দেখার চোখ থাকলে তারাও হয়তো তাই বলবে।
বকুল নিঃশ্বাস ফেলে বলে, হয়তো তা নয়; হয়তো তাই। ক’জন আর তোর মতো মঞ্চ থেকে সরে পড়ে দর্শকের চেয়ারে বসে থাকতে জানে?
বলেছিস হয়তো ভুল নয়, পারুল মৃদু হেসে বলে, ওই চেয়ারের টিকিটটা কাটতে তো দাম দিতে হয় বিস্তর। বলতে গেলে সর্বস্বান্ত হয়েই কিনতে হয়।
বকুল একটু চুপ করে থেকে বলে, তোর আর আমার মনের গড়ন চিরদিনই আলাদা। আমার হচ্ছে সব কিছুর সঙ্গেই আপন, আর তোর কোনোদিন কোনো অপছন্দর সঙ্গেই আপস নেই।
বহুদিন পরে কম বয়সের মতো প্রায় রাত কাবার করে গল্প করলো বকুল আর পারুল।
যখন ছোট ছিল, যখন মনের কোনো বক্তব্য তৈরী হয়নি, তখনো ওরা দুই বোন এমনি গল্প করেছে অনেক রাত অবধি, বাবার ঘুম ভাঙার ভয়ে ফিসফিস করে।
মা-বাবার ঘরের পাশেই তো ছিল ওদের দুই বোনের আস্তানা! সরু ফালিমতো সেই ঘরটায় এখন সংসারের যত আলতুফালতু জঞ্জাল থাকে। বকুল কোনো কোনো দিন ওদিকের ঘরে যেতে গেলে দেখতে পায়, ঘরটাকে এখন আর চেনা যায় না। অবশ্য তখনো যে একেবারেই শুধু তাদের দুই বোনের ঘর ছিল তা নয়, সে ঘরে দেয়াল ঘেষে ট্রাঙ্কের সারি বসানো থাকতো। থাকত জালের আলমারি, জলের কুঁজো। বকুল-পারুলের জন্যে খাট চৌকিও ছিল না, রাত্রে মাটিতে বিছানা বিছিয়ে শুতো দুজনে। তবু ঘরটাকে ঘর বলে চেনা যেতো, এখন আর যায় না।
যখন চেনা যেতো, তখন দুটি তরুণী মেয়ের অপ্রয়োজনীয় অবান্তর অর্থহীন কথায় যেন মুখর হয়ে উঠতো। রাত্রি না হলে তো পারুলের কবিতার খাতা উদঘাটিত হতো না। বকুলের খাতা তখনো মানসলোকে।
