পারুলের ঘরখানা তাই রিক্ততায় সুন্দর। যেমন সুন্দর পারুলের নিরাভরণ হাত দুখানা।
পারুলের ঘরে বাহুল্যের মধ্যে দেয়ালে একখানা বেশ বড় মাপের রবীন্দ্রনাথের ছবি। বাকী সমস্ত দেয়ালগুলোই শূন্য সাদা।
পারুলের ঘরটা দেখে বকুলের অবাক লাগছে, ভাল লাগছে। হেসে বললো, তোর ঘরবাড়ি দেখে আমার হিংসে হচ্ছে সেজদি!
আমার ঘর দেখে তোর হিংসে হচ্ছে?
হচ্ছে।
তাহলে কর হিংসে। তবে অতিবড় মুখ্যুরও এটা হতো না।
মুখ্যুর হয়তো হতো না। কিন্তু নিজেকে তো মুখ্যু ভাবি না।
পারুল বললো, কতদিন কারো খবর জানি না, বল শুনি, আমার অজ্ঞাতসারে এতোদিন কি কি ঘটেছে সংসারে?
বকুল হেসে উঠে উত্তর দেয়, ভাল লোককেই বলছিস! আমার জ্ঞাতসারের পরিধি বড় অল্প, সেজদি আমি বাড়িতে থেকেও কিছুই জানি না!
প্রসূন তো ফেরেনি?
ওই একটা দুঃখের ইতিহাস। শুনতে পাই চিঠির সংখ্যা কমতে কমতে ক্রমশই শুধু শূন্যের সংখ্যা।
ছোড়দার কথা ভাবলে বড় মন-কেমন করে। কেমন ডাঁটুসটি ছিল। নিজের ছেলেমেয়ে থেকেও যত যন্ত্রণা।
ওকথা থাক সেজদি, তোর কথা বল।
আমার? আমার আবার কথা কী রে? কথাকেই জীবন থেকে নির্বাসন দিয়ে বসে আছি আর সমাজ-সংসারের দিকে তাকিয়ে দেখছি।
দেখছিসটা কী?
দেখছি ওর বজ্রআঁটুনি থেকে কেমন গেরো ফস্কে পালিয়ে এসেছি!
ভাগ্যিস সেই “অ-কবি লোকটা” তোর জন্যে এমন একটা বাড়ি বানিয়ে রেখে গেছে, তাই না এত কবিত্ব তোর?
পারুল অকপটে বলে, তা সত্যি। শুধু এইটির জন্যেই এখন লোকটার প্রেমে পড়তে শুরু করেছি।
তারপর পারুল বললো, এবার তা হলে জিজ্ঞেস করি, বকুলের কাহিনীর কী হলো?
আমিও তো তাই ভাবি কী হলো। বকুল বললো।
তারপর আস্তে বললো, আর লিখেই বা কী হবে? নির্মল তো পড়বে না।
দুজনেই চুপ করে গেল।
হায়তো অনেকদিন আগে হারিয়ে যাওয়া নির্মল নামের সেই ছেলেটার মুখ মনে করতে চেষ্টা করলো।
অনেকক্ষণ পরে পারুল বললো, নির্মলের বৌ কোথায় আছে রে?
ঠিক জানি না, বোধ হয় ওর ছেলে যেখানে কাজ করে।
বকুল কি কোনো কারণেই কোনো দিন কারো সামনে নির্মলের নাম উচ্চারণ করেছে? কই মনে পড়ছে না! আজই হঠাৎ বলে বসলো, লিখেই বা কি হবে? নির্মল তো পড়বে না!
এই স্বীকারোক্তি বকুলের নিজের কানেও কি অদ্ভুত লাগলো না? বকুল নিজেই কি আশ্চর্য হয়ে গেল না? বকুল কি কখনো ভেবেছে লিখে কি হবে, নির্মল তো পড়বে না।
ভাবেনি, ওই ভাবনাটুকু ভাববার জন্যে যে একান্ত গভীর নিভৃতিটুকুর প্রয়োজন তা কোনো দিন বকুলের জীবনে নেই। বকুল হাটের মানুষ, কারণ কুল স্বেচ্ছায় হাটে নেমেছিল, তার থেকে কোনো দিন ছুটি মিললো না তার। তাই নিজেই সে কোনোদিন টের পায়নি অনেক গভীরে আজও একদার সেই ছদ্মবেশহীন বকুল উদাসীন মনে বসে ভাবে, সে-কথা লিখে কি হবে, নির্মল তো পড়বে না।
আজ এই নিতান্ত নির্জন পরিবেশ, এই গঙ্গার ধারের বারান্দার ঝোড়ো হাওয়া আর আবাল্যের সঙ্গিনী সেজদির মুখোমুখি বসে থাকা–সকলে মিলে যেন সেই কুণ্ঠিত সঙ্কুচিত লাজুক বকুলকে টেনে তুলে নিয়ে এলো তার অবচেতনের গভীর স্তর থেকে।
হয়তো শুধু এইটুকুও নয়, মস্ত একটা ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে সেই মেয়েটার গড়গড়িয়ে চলে যাওয়া গাড়ির চাকাটা। ওই মেয়েটা বকুলকে ধিক্কার দিয়েছে, ধিক্কার দিয়েছে বকুলের কালকে। সেই কাল মাথা হেঁট করে বলতে বাধ্য হলো, তোমাদের কাছে আমরা হেরে গেছি। আমরা জীবনে সব থেকে বড়ো করেছিলাম নিন্দের ভয়কে, তোমরা সেই জিনিসটাকে জয় করেছে। তোমরা বুঝেছো ভালবাসার চেয়ে বড়ো কিছু নেই, তোমরা জেনে নিয়েছে, নিজের জীবন নিজে আহরণ করে নিতে হয়, ওটা কেউ কাউকে হাতে করে তুলে দেয় না। সেই জীবনকে আহরণ করে নিতে তোমরা তোমাদের রথকে গড়গড়িয়ে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারো কাটাবনের উপর দিয়ে।
বকুলের ছদ্মবেশটা অনেক পেয়েছে, অনেক পাচ্ছে, হয়তো আরো অনেক পাবে। সেখানে কতো ঔজ্জ্বল্য, কত সমারোহ, কিন্তু ছদ্মবেশ যখন খুলে রাখে বকুল, কী নিঃস্ব, কী দীন, কী দুঃখী!
কিন্তু শুধুই কি একা বকুল? ক’জনের জীবন ভিতর-বাহির সমান উজ্জ্বল?
সনৎকাকাকে তোর মনে পড়ে সেজদি? অনেকক্ষণ পরে বললো বকুল।
পারুলের সঙ্গে সনৎকাকার তেমন যোগাযোগ ছিল না, পারুল তো অনেক আগেই বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিল।
সনৎকাকার এক বিশেষ বন্ধু একদা মহা সমারোহে একখানি পত্রিকা খুলে বসেছিলেন, সেই পত্রিকার সূত্রেই বকুল পেয়েছিল একটি বিশাল বটছায়া। বকুল কি তার আগে কোনো দিন জেনেছিল জগতে ছায়া আছে? বকুল জানতো জগতে শুধু প্রখর রৌদ্র থাকে। বকুল কি জানতো জগতে আলো আছে? আকাশ আছে? ওসব জানবার অধিকার মুক্তকেশীর মাতৃভক্ত পুত্র প্রবোধচন্দ্রের সংসারভুক্তদের ছিল না।
সনৎ নামের সেই মানুষটি প্রবোধচন্দ্রের অচলায়তনের গণ্ডি ভেঙে বকুলকে আকাশের নিচে নিয়ে গিয়েছিলেন, নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য এক জগতে। সনৎকাকার সাহায্য না পেলে বকুলের জীবনের ইতিহাস অন্য হতো।
পারুল জানে, তবু হয়তো সবটা জানে না। তাই পারুল বললো, ওমা মনে থাকবে না কেন? বাবার সেই কি রকম যেন, ভাই না? অন্য জাতের মেয়ে বিয়ে করে জাতেঠেলা হয়েছিলেন? ওঁর সেই বন্ধুর কাগজেই তো তোর প্রথম লেখা বেরোয়? বাবা ওঁকে দু’চক্ষে দেখতে পারতেন না, তাই না রে?
