পারুল বলে, যার যেমন মনের গড়ন। তুই যদি সাহস করে বেরিয়ে আসতে পারতিস, দেখতিস সেটাই মেনে নিতে লোকে।
সেই কথাই তো হচ্ছে, সাহস কই?
পারুল একটু হেসে ফেলে, তুই এতো বড় লেখিকা-টেখিকা, তবু তোর থেকে আমার সাহস অনেক বেশী। এই দ্যাখ একা রয়ে গেছি। আত্মীয়জনের নিন্দের ভয় করি না, ছেলেদের রাগের ভয় করি না, চোরের ভয় ভূতের ভয় কিছুই করি না!
তেমনি সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছিস। সবাই তোকে ত্যাগ দিয়েছে– বললো বকুল ঈষৎ হেসে।
পারুল আবার হাসলো। বললো, যারা অতি সহজেই আমাকে ত্যাগ দিতে পারে, তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদে ক্ষতিটা কোথায় বল? যেটা নেই, সেটা হারানোয় আবার লোকসান কি? সবটাই তো শূন্যের ওপর।
তোর হিসেবটাই কি সম্পূর্ণ ঠিক সেজদি? ও পক্ষেও তত এরকম একটা হিসেব থাকতে পারে? বকুল বলে, সোজাসুজি তোর ছেলেদের কথাই ধর, ওরাও তো ভাবতে পারে, মার মধ্যে যদি ভালবাসা থাকতো, মা কি আমাদের ত্যাগ করতে পারতো?
ব্যাপারটা ভারী সূক্ষ্ম রে বকুল, ও বলে বোঝানো শক্ত, অনুভবেই ধরা যায় শুধু। তুই তো আবার ওরসে বঞ্চিত গোবিন্দদাস! জগতের যে দুটি শ্রেষ্ঠ রস, তার থেকে দিব্যি পাশ কাটিয়ে কাল্পনিক মানুষদের দাম্পত্যজীবন আর মাতৃস্নেহ নিয়ে কলম শানাচ্ছিস। আমি ওদের মুক্তি দিয়েছি, ওরা বলছে, “মা আমাদের ত্যাগ করেছে”, আমি যদি ওদের আঁকড়াতাম ওর বলতো, ওরে বাবা, এ যে অক্টোপাশের বন্ধন! তবেই বল, মার মধ্যে যদি সত্যি ভালবাসা থাকে, তবে সে কী করবে? নিজের সুনাম-দুর্নাম দেখবে? না সন্তানকে সে অক্টোপাশের বন্ধন থেকে মুক্তি দেবে?
তোর কি মনে হয় সবাই ওই বন্ধনটাই ভাবে?
তোর কি মনে হয়?
কি জানি!
আরে বাবা সেটাই তো স্বাভাবিক। পারুল বলে, পাখির ছানাটা যখন ডিম থেকে বেরিয়ে আকাশে উড়তে যায়, তখন কি সে আহা এতোদিন এর মধ্যে ছিলাম ভেবে সেই ডিমের খোলাটা পিঠে নিয়ে উড়তে যায়? যদি বাধ্য হয়ে তাকে সেটাই করতে হয়, ওড়ার আকাশটা তার ছোট হয়ে যাবে না?
তবে আর দুঃখ করবার কি আছে?
কিছু নেই। এটা শুধু আলোচনা। আর এটা তো আজকের কথা নয় রে, চিরদিনের কথা। আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে, কই সে নিধি?
মনের মানুষ ওটা হচ্ছে সোনার পাথরবাটি, বুঝলি সেজদি! ও কেউ পায় না। বকুল বলে, তবু গোবিন্দভোগ না জুটলে খুদকুঁড়ো দিয়েই চালাতে হবে।
চালাক। যাদের চলতেই হবে, তারা তাই করুক। পারুল বলে, যে পথের ধারে বসে পড়েছে, তার সঙ্গে পথ-চলাদের মিলবে না। বসে বসেই দেখবে সে, চলতে চলতে তার জন্যে কেউ বসে পড়ে কিনা।
বাতাস জোরে উঠেছিল, পরস্পরের কথা আর শোনা যাচ্ছিল না। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গল্প করাটা হাস্যকর, সে চেষ্টা করলো না।
শীত করছিল, গায়ে আঁচল টেনে চুপ করে বসে দেখতে লাগলো ঝোড়ো হাওয়ায় গঙ্গার দৃশ্য।
কিন্তু ‘ঝড়ের মুখে থাকবোই’ বললেই কি আর সত্যি বসে থাকা যায়? কতক্ষণ পরে পারুল বললো, ঘরে চল।
পারুলের ঘরের অনাড়ম্বর সাজসজ্জা চোখটা জুড়িয়ে দিল বকুলের। কত স্বল্প উপকরণে চলে যায় পারুলের।
রাজেন্দ্রলাল স্ট্রীটের বাড়িটার কথা মনে পড়লো বকুলের। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বস্তুর ভারে ভারাক্রান্ত সেই বাড়িখানা যেন কুশ্রীর পরাকাষ্ঠা দেখাতে ‘ডিবি’ হয়ে বসে আছে। ওকে হালকা করতে পারবে, এমন সাধ্য আর কারো নেই। অলকার ছিল সাধ্য, অলকা সে সাধ্যকে কাজে লাগিয়েছে। অলকা তার অংশের যতো ‘ডেয়ো ঢাকনা’ শাশুড়ীর ঘরে চালান করে দিয়ে নিজের অংশটুকু সাজিয়ে-গুছিয়ে সুখে কালাতিপাত করছে।
আর অলকার শাশুড়ী?
তিনি এই পুরনো সংসারের যেখানে যা ছিল, সব বুকে করে নিয়ে এসে নিজের ঘরের মধ্যে পুরে রেখেছেন। ছিরিছাঁদহীন সেই সব আসবাবপত্র কেবলমাত্র বড়গিন্নীর মূঢ়তার সাক্ষ্য বহন করছে।
সে ঘরে যে কী আছে আর কী নেই।
বকুল অবশ্য দৈবাৎই বাড়ির সব ঘরে দালানে পা ফেলবার সময় পায়, তবু যেদিন পায়, সেদিন বড় বৌদির ঘরে ঢুকলে ওর প্রাণ হাঁফায়।
বকুল জানে না বাড়িতে যত দেশলাই বাক্স খালি হয়, সেগুলো কোন্ মন্ত্রে বড়বৌদির ঘরে গিয়ে ঢোকে? আর বড় বৌদির কোন্ কর্মেই বা লাগে তারা? বকুল জানে না কোন কর্মে লাগে তার, বাড়ির ইহজীবনের যত তার-কেটে-যাওয়া ইলেকট্রিক বালব, সংসারের সকলের পচে ছিঁড়ে যাওয়া শাড়ির পাড়, যাবতীয় খালি হয়ে যাওয়া টিন কৌটো শিশি বোতল।
বৈধব্যের পর থেকে যেন বড় বৌদির এই জঞ্জাল জড়ো করার প্রবৃত্তিটা চতুগুণ বেড়েছে। একটা মাত্র বালিশেই তো চলে যায় তার, অথচ মাথার শিয়রে চৌকিতে অন্তত ডজনখানেক বালিশ জড়ো করা আছে তার ভাল-মন্দয় ছোটয়-বড়য়।
ওনার এই কুড়িয়ে বেড়ানো দেখে কেউ হাসলে খুব বিরক্ত হয়ে বলেন, রাখবো না তো কি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে?…গেলে আমায় আর কেউ করে দিতে আসবে? একটা জিনিস দরকার পড়লে তক্ষুনি কেউ যোগান দিতে আসবে?
বড় বৌদির ছেলে মা সম্পর্কে উদাসীন বলেই কি এমন দুশ্চিন্তা ওঁর?
কিন্তু পারুলের ছেলেরা?
তারাই বা মা সম্পর্কে এত কি সচেতন?
অথচ পারুল কোনো দিন তাদের কাছ থেকে কিছুর প্রত্যাশা করে না। পারুল যেন সব কিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। মনে হয় দরকার নামক বস্তুটাকে পারুল জীবন থেকে নির্বাসন দিয়েছে।
