ভাবছিলাম। ছেলেটা এতদিন থাকলো, অসুখে ভুগলো, মায়া-টায়া পড়ে গেল—
পারুল চুপ করে গেল।
আরো কিছুক্ষণ কথা হলো, লোকটা সত্যি কথা বলেছে কিনা এই নিয়ে। এইভাবে কত জোচ্চুরিই ঘটছে শহরে।
তবু শম্পা নামের সেই মেয়েটাকে তো হারিয়ে যেতে দিতে পারা যায় না! অনেকক্ষণ পরে বকুল বলে, তখনই যদি ওই ওর সঙ্গে চলে যেতিস!
পরে একশোবার তাই ভাবলাম রে, কিন্তু ব্যাপারটা এত আকস্মিক ঘটে গেল! কে ডাকছে বলে নিচে নামলো, তার দুমিনিট পরেই উর্ধ্বমুখ হয়ে উঠে এসে বলল, সেজপিসি, সত্যবানকে বোমা মেরেছে, বোধ হয় মরে গেছে, আমি যাচ্ছি।
যাচ্ছিস? কোথায় যাচ্ছিস? কে বললো?–এসব প্রশ্নের উত্তরই দিলো না, যেমন অবস্থায় ছিল তেমনি অবস্থায় নেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নামলাম, দেখলাম লোকটাকে, কলকারখানার লোকেরই মত, গুছিয়ে কথা বলতেও জানে না। যা বললো তার মর্মার্থ ওই। …তাও যে একটু জেরা করবো তার সময়ই পেলাম না। পোড়ারমুখো মেয়ে বলে উঠলো, জিজ্ঞেস করবার সময় অনেক পাবে পিসি, এখনো যদি একেবারে মরে গিয়ে না থাকে তো গিয়ে দেখতে পাওয়া যাবে। বলে লোকটা যে সাইকেল-রিকশায় চেপে এসেছিল সেইটায় চড়ে বসলো। তার পাশাপাশি। চোখের সামনে গড়গড় করে চলে গেল রিকশাটা।
ওরা গড়গড় করে চলে যেতে পারে। নিঃশ্বাস ফেলে বলে বকুল, জল মানে না, আগুন মানে না, কাঁটাবন মানে না, গড়গড়িয়ে এগিয়ে যায়! এ শক্তি ওরা কোথা থেকে আহরণ করেছে কে জানে!
পারুল মৃদু হেসে বলে, তোদেরই তো জানবার কথা, সমাজতত্ত্ব আর মনস্তত্ত্ব, এই নিয়ে কাজ যাদের। তবে আমি ওই অকেজো মানুষ, গঙ্গার ঢেউ গুনে গুনে যেটুকু চিন্তা করতে শিখেছি, তাতে কী মনে হয় জানিস? সব ভয়ের মূল কথা হচ্ছে অসুবিধেয় পড়ার ভয়। সেই ভয়টাকে জয় করে বসে আছে ওরা।
বকুল আস্তে বলে, অসুবিধেয় পড়ার ভয়!
তা নয় তো কি বল? আমি বলছি অসুবিধের, তুই না হয় বলবি ‘বিপদে’র। তা ওই “বিপদ” জিনিসটাই বা কি? “অসুবিধে”ছাড়া আর কিছু আমাদের অভ্যস্ত জীবনের, আমাদের অভ্যস্ত দৈনন্দিন জীবনযাত্রার কোথাও একটু চিড় খেলেই আমরা বলি “কি বিপদ”। তাই উচ্চ থেকে তুচ্ছ বিশৃঙ্খলা মাত্রেই আমাদের কাছে বিপদ। রোগশোকও যতটা বিপদ, ছেলের চাকরি যাওয়াও ততটাই বিপদ।…জামাইবাড়ির সঙ্গে মতান্তর, পড়শীর সঙ্গে মতান্তর, দরকারী জিনিস হারানো, দামী জিনিস খোয়া যাওয়া, বাজার দর চড়ে ওঠা, পুরনো চাকর ছেড়ে যাওয়া সবই আমাদের কাছে বিপদ! তার মানে ওই সব কিছুতেই আমাদের অসুবিধে ঘটে।…আবার মোহনের বৌ তো চাকরের একটু অসুখ করলেই “কী সর্বনাশ! এ কী বিপদ!” বলে “সারিডন” খেয়ে শুয়ে পড়ে।
হেসে ওঠে দুজনেই।
তারপর পারুল আবার বলে, এই সব দেখেশুনে অর্থাৎ এতোকাল ধরে মানবচিত্ত আর সমাজচিত্র অনুধাবন করে বুঝে নিয়েছি, সব ভয়ের মূল কথা ওই বিপদের ভয়। এই যে আমি কাল থেকে তো-শতবার সেই ‘না-দেখা’ হাসপাতালটার আশেপাশে ঘুরে মলাম, কই যা থাকে কপালে বলে বেরিয়ে পড়তে তো পারলাম না! ভয়ে হলো, কি জানি বাবা, কত রকম বিপদে পড়ে যেতে পারি! ওরা সেই ভয়টা করে না। ওরা শুধু ভেবে নেয়, এইটা আমায় করতে হবে, আর সেই করাটার জন্যে যা করতে হয় সবই করতে হবে। অসুবিধেয় পড়বে, বিপদ হবে, এ চিন্তার ধার ধারে না।
গঙ্গার খুব হাওয়া উঠেছে, গা শিরশির করে উঠছে, তবু বসেই থাকে ওরা।
বকুল অন্যমনস্ক গলায় বলে, আরো একটা বড় জিনিসের ভয় করে না ওরা, সেটা হচ্ছে লোকনিন্দের ভয়! “লোকে কি মনে করবে”, এ নিয়ে এ যুগ মাথা ঘামায় না। যেটা নাকি আমাদের যুগের সর্বপ্রধান চিন্তার বস্তু ছিল।
পারুল একটু হাসলো, তা বটে। আমার একজন সম্পর্কে দিদিশাশুড়ী ছিলো, বুড়ী কথায় কথায় ছড়া কাটতে, বলতো, যাকে বলো ছিঃ, তার বইলো কী? বলতো, যার নেই লোভয়, সে বড় বিষম হয়।
আমাদের কাল আমাদের ওই জুজুর ভয়টা দেখিয়ে দেখিয়ে জব্দ করে রেখেছে! বকুল বললো নিঃশ্বাস ফেলে, অথচ ওই মেয়েটা যেদিন চলে এলো কত সহজেই চলে এলো! বাপ বললো, আমার বাড়িতে এসব চলবে না
মেয়ে বললো, ঠিক আছে, তবে আমি চললাম তোমার বাড়ি থেকে। ব্যস হয়ে গেল। এক মিনিট সময়ও ভাবলো না, এই আশ্রয় ছেড়ে দিয়ে আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, একবারও ভাবলো না আমার এই চলে যাওয়াটা লোকে কি চক্ষে দেখবে। মেয়েমানুষ দৈব দুর্বিপাকে পড়েও যদি একটা রাত বাড়ির বাইরে থাকতো, তার জাত যেতো–এ তো এই সেদিনের কথা।
উলঙ্গের নেই বাটপাড়ের ভয়–, পারুল বলে, যারা জাত শব্দটাকেই মানে না, তাদের আর জাত যাবার ভয় কি? এরা দেখছে সুবিধাবাদীরা ধুনি জেলে জ্বেলে ধোয়ার পাহাড় বানিয়ে বলছে, এ হচ্ছে অলঙ্ঘ্য হিমালয়। ব্যস, অলঙ্ঘ্য। যেই না এ যুগ তাকে ধাক্কা দিয়ে দেখতে গেল, দেখলো পাথর নয়, ধোঁয়া,-পার হয়ে গেল অবলীলায়।
হুঁ, মেয়েটাও তাই চলে গেল, মিথ্যে পাহাড়টা ফুটা করে। যে মুহূর্তে জানলো, বাবার এখানে আমার যা কিছু থাক, মর্যাদা নেই, সেই মুহূর্তেই ঠিক করে ফেললো, অতএব এখানটা পরিত্যাগ করতে হবে।–এমন মনের জোর…আমাদের ছিল কোনো দিন? কতো অসম্মানের ইতিহাস, কত অমর্যাদার গ্লানি বহন করে আশ্রয়টা বজায় রেখেছি। এখনো রাখছি–এখনো স্থিরবিশ্বাস রাজেন্দ্রলাল স্ট্রীটের ওই ইটের খাঁচাখানার মধ্যেই বুঝি আমার মর্যাদা, আমার সম্মান। ওর গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এলেই লোকে আমার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকাবে। ওই খাঁচাটার শিকগুলোয় মরচে পড়ে গেছে, তবু তাই আঁকড়েই বসে আছি।
