অবিশ্যি কাগজপত্রে ছাপা চেহারা নিয়ে কিছু হাসাহাসি করা যায়, কিন্তু মনের চেহারাটা যেন তার অনুকূল নয়। যেন সেই মনটা শুধু সেজদি বলে ডেকেই চুপ করে যেতে চায়। আর কোনো কথা নয়।
কিন্তু এ তো গেল সেজদির কথা।
আর সেই মেয়েটা? তাকে কি বলবেন? সে কি বলবে?
সে নিশ্চয় ছুটে এসে জড়িয়ে পিষে গায়ে নাক ঘষে একাকার করবে।
হাওড়া থেকে চন্দননগর, ইলেকট্রিক ট্রেনের ব্যাপার, তবু যেন মনে হচ্ছে পথটা ফুরোতে চাইছে না! সেই মেয়েটার প্রথম আবেগের ঝড়টা কল্পনা করতে করতে ধৈর্য কমে আসছে!
কিন্তু গতকাল থেকে অনামিকার জন্যে বুঝি ভাগ্যের হাতের চড় খাওয়াই লেখা ছিল। তাই সেই ঝড়টা এসে আছড়ে পড়লো না।
সেজদি ওকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো, আস্তে বললো, তুই!
তারপর আরো আস্তে আস্তে বললো, তুই এখন এলি!
হঠাৎ ভয়ানক একটা ভয়ে বুকটা হিম হয়ে গেল অনামিকার। মনে হলো গত কালকের মতো আজও বুঝি নিদারুণ একটা সংবাদ তার জন্যে অপেক্ষা করছে।
অনামিকা কি সিঁড়িতেই বসে পড়বেন?
পারুল বোধ হয় মুখ দেখে মনের কথা বুঝলো, তাই আস্তে বললো, ভয় পাস নে, তবে খবরটা সত্যিই খুব খারাপ। সেই ছেলেটা, জানিস তো সবই, ক’দিন আগে চলে গিয়েছিল, সকালে হঠাৎ কে একটা লোক এসে খবর দিল–
সেজদি একটু থামলো, তারপর বললো, সেই ছেলেটা বুঝি কোন্ কারখানায় কাজ করতো, সেখানে বুঝি কার সঙ্গে কী গোলমাল হয়েছিল, বোমাটোমা মেরেছে নাকি, বেঁচে আছে কি নেই, এই অবস্থা ছেলেটার। শোনামাত্রই মেয়েটা এমন করে চলে গেল, ভালো করে বুঝতেই পারলাম না।
অনামিকা নিঃশাস ফেলে বললেন, সেই লোকটা চেনা না অচেনা?
চেনা আবার কোথায়? একদম অচেনা।
কী আশ্চর্য, কালই ছেলেটার সঙ্গে আমার দেখা হলো। খবরটা আদৌ সত্যি না হতে পারে, কোনো খারাপ লোক কোনো মতলবে–
বলেছিলাম রে সেকথা, কানেই নিলো না, উন্মাদের মত ছুটে চলে গেল তার সঙ্গে। আর তুইও এতোদিন পরে আজ এলি বকুল!
বকুল নিঃশাস ফেললো।
বকুলের মনে হলো কোথায় যেন একটা বাক্স ছিল তার ভরা-ভর্তি, সেই বাক্সটা হঠাৎ খালি হয়ে গেলো। কিসের সেই বাক্সটা? কী ভরা ছিল তাতে?
.
চল, বসবি চল।
বললো সেজদি, তারপর প্রাথমিক অভ্যর্থনা-পর্বও সারলো। কিন্তু এতদিন পরে দুটি ভালোবাসার প্রাণ এক হয়েও কোথায় যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলো। সুরটা কেটে গেছে। মাঝখানে যেন একটা বোবা দেয়াল।
সেই একটা উন্মাদ মেয়ে বকুলের অনেক কষ্টের দুর্লভ আয়োজনটুকু ব্যর্থ করে দিয়ে চলে গেছে।
কিন্তু কোথায় গেল?
কোথায় খুজতে যাওয়া যাবে তাকে?
তা যে লোকটা খবর দিতে এসেছিল, সেই লোকটা যদি খাঁটি হয় তো খোঁজবার জায়গা আছে, এন্টালির কাছে একটা অখ্যাতনামা হাসপাতালের নাম করেছে সে। আর খাঁটি না হলে তো কথাই ওঠে না। যে মেয়েটা হারিয়ে যাবো প্রতিজ্ঞা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তবু হারিয়ে যেতে পারেনি, তার দুষ্ট নক্ষত্র এইবার সেই যোগাযোগটা ঘটিয়ে দিলো। এই অসংখ্য লোকের ভিড়ে ভরা পৃথিবীর কোন একখানে হয়তো হারিয়ে গেল সে।
অনেকক্ষণ পরে গঙ্গার ধারের সেই বারান্দাটায় বসলো দুজনে, আর এতক্ষণ পরে শম্পার কথা ছাড়া একটা কথা বললো বকুল। বললো, তুই যে কেন এখান থেকে একদিনের জন্যেও নড়তে চাস না তা বুঝতে পারছি সেজদি!
পারছিস?–সেজদি হাসে, তুই কাজের সমুদ্রে হাবুডুবু খাস, আর আমি অকাজের অবসরে গঙ্গাতীরে বসে বসে ঢেউ শুনি।
তোকে দেখে আমার হিংসে হচ্ছে সেজদি। মনে হচ্ছে যদি তোর মতো জীবনটা পেতাম।
পারুলের অভ্যস্ত কৌতুকপ্রিয়তা জেগে ওঠে। পারুল বলে, ওরে সর্বনাশ, বাংলাদেশ তাহলে একটি দুর্দান্ত লেখিকা হারাত না?
ক্ষতি ছিল না কিছু।
লাভ ক্ষতির হিসেব কি সব সময় নিজের কাছে থাকে? পারুল বলে, মেয়েটা কি বুঝলো, তার এই পাগলের মতো ছুটে চলে যাওয়ায় কোথায় কি লোকসান হলো?
অর্থাৎ ঘুরেফিরে সেই মেয়েটার কথাই এসে পড়লো।
অদ্ভুত মেয়ে! পারুল আবার বলে, দুর্লভ মেয়ে! ওকে ওর মা-বাপ বুঝতে পারলো না। অবশ্য না পারাই স্বাভাবিক। সাধারণতঃ যে মালমশলা দিয়ে আমাদের এই সংসারী মানুষগুলো তৈরী হয়, ওর মধ্যে তো সেই মালমশলার বালাই নেই। যা আছে সেটা সংসারী লোকেদের অচেনা।
তোর মধ্যেও তো তেমনি উল্টোপাল্টা মালমশলা, বকুল আস্তে হাসে, তোকেও তাই কেউ বুঝতে পারলো না কোনো দিন সেজদি।
আমার কথা ছেড়ে দে, নিজেকে নিয়ে নিজেই বইছি।
মোহন-শোভনের খবর কী রে সেজদি?
ভালো, খুব ভালো। প্রায় প্রায় আরো পদোন্নতির খবর দেয়, পুরনো গাড়ি বেচে দিয়ে নতুন গাড়ি কিনেছে, সে খবর জানায়।
বকুল একটু তাকিয়ে থেকে বলে, আচ্ছা সেজদি, পৃথিবীতে সত্যিকার আপন লোক বলতে তাহলে কি কিছুই নেই?
থাকবে না কেন? পারুল অবলীলায় বলে, তবে তাকে সম্পর্কের গণ্ডির মধ্যে খুঁজতে যাওয়া বিড়ম্বনা! দৈবক্রমে যদি জুটে যায় তো গেল!
ভেবেছিলাম দু’তিনদিন থাকবো, বকুল বলে, কিন্তু আমার ভাগ্যে অতো সুখ সইলে তো!
পারুল হৈ-হৈ করে ওঠে না, বলে, তাই দেখছি। কাল থেকে কত-শতবার যে আমি কলকাতায় চলে গিয়েছি, আর এই হাসপাতালটা খুঁজে বেড়িয়েছি তার ঠিক নেই। কিন্তু সত্যিকার কিছু করার ক্ষমতা নেই, তুই এলি, তোর সঙ্গে যেতে পারা যায়।
তুই যাবি?
