অতএব নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোট সুটকেসটা গুছিয়ে নিচের তলায় নামতে হলো অনামিকাকে।
চাকরটাকে ডেকে বললেন, ছোটমা কোথায় রে?
ছোটমা? তিনি তো এখন পূজোর ঘরে
শুনে বিস্মিত হলেন অনামিকা, ছোটবৌদির এ উন্নতি কবে হলো? জানতেন না তো? যাক কতো কি-ই তো ঘটছে সংসারে, তিনি আর কতটুকু জানেন? এ একটা অদ্ভুত জীবন তার, না ঘরকা না ঘাটকা। এ সংসারে আছেন, কিন্তু এর সঙ্গে যেন সম্যক যোগ নেই। যেহেতু যথারীতি অন্য সংসারে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হননি, সেইহেতু অনামিকা যেন একটা বাড়তি বস্তুর মতো এখানে চেপে বসে আছেন। আজন্মের জায়গা, তবুজম্মগত অধিকারটুকু কখন যে চলে যায়। মেয়েদের জীবনে এ একটা ভয়ঙ্কর কৌতুক।
আচ্ছা, বাড়ির কোনো ছেলে যদি অবিবাহিত থাকে, এমন তো অনেকেই থাকে, আরো কি এই রকম কেন্দ্রচ্যুত হয়ে বাড়তিতে পরিণত হয়?
ভাবতে ভাবতে আবার দোতলায় চলে এলেন অনামিকা, ছোড়দার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, ছোড়দা।
ছোড়লা সাড়া দিলেন না, চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন। কুঞ্চিত, অপ্রসন্ন মুখ।
অনামিকা ওঁর প্রশ্নের অপেক্ষা রাখলেন না, বললেন, ছোটবৌদি তো শুনেছি পুজোর ঘরে নাকি, ওকে একটা কথা বলার ছিলো, তুমি বলে দিও, আজ যেন আমার, মানে-আজ কাল পরশু এই দুটো-তিনটে দিন যেন আমার রান্না-টান্না করতে দেয় না। আমি একটু যাচ্ছি- বলেই মনে হলো কথাটা খুব বেখাপ্পা ভাবে বলা হলো।
ছোড়দা চায়ের পেয়ালা শেষ করে শ্লেষাত্মক গলায় বলেন, তিনদিনের জন্যে? সভাটা কোথায়?
ছোড়দা কি বুঝতে পারেননি, অনামিকা কোথায় যাচ্ছেন! অনামিকার মনে হলো বুঝতে পেরেও ছোড়দা যেন ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটাকে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন।
অনামিকারই ভুল। গোড়াতেই স্পষ্ট পরিষ্কার গলায় বললেই ভালো হতো, ছোড়দা, আমি দিন তিনেকের জন্যে চন্দননগরে সেজদির কাছে বেড়াতে যাচ্ছি।
এবার বললেন, না, সভাটভা তো না, সেজদির কাছে একটু বেড়িয়ে আসতে যাচ্ছি।
সেজদির কাছে? মানে চন্দননগরে? ছোড়দা তিক্ত গলায় বলেন, আশা করি আহ্লাদ করে কাউকে নিয়ে আসবে না?
নিয়ে? কাকে? অনামিকাও এবার প্যাঁচ কষলেন, বললেন, নিয়ে আসার কথা কী বলছো?
কী বলছি, তুমি একেবারেই বুঝতে পারেনি এটা আশ্চর্যের কথা! তুমিই গতকাল জানিয়েছ তোমার সেই ধিঙ্গী ভাইঝি চন্দননগরে আর এক আশ্রয়দাত্রীর কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এবং বোঝা যাচ্ছে আজ তুমি সেখানে ছুটছে–
অনামিকা মৃদু হেসে বলেন, ছুটছি হয়তো এমনিই। মনটা ভালো লাগছিলো না তবে হয়তো অজানিতে তাকে দেখতেই ছুটছি, আনবার কথা ভাবতে যাবো কোন সাহসে ছোড়দা? কার বাড়িতে নিয়ে আসবো একটা বেয়াড়া দুষ্ট বুদ্ধিহীন মেয়েকে?
ছোড়দার কি একটু আগের চা-টা গলায় বেধেছিল? তাই হঠাৎ অমন বিষম খেলেন? কাসতে কাসতে সময় চলে গেল অনেকটা। তারপর বললেন, সেকথা বলতে পারো না তুমি, বাবা তোমার এ বাড়ির ওপর বেশ কিছু অধিকার দিয়ে গেছেন।
অনামিকা তেমনিই হেসে বলেন, আমি তো সেই অদ্ভুত বাজে ব্যাপারটাকে বাবার ছেলেমানুষী ছাড়া আর কিছুই ভাবি না ছোড়দা। নেহাৎ তোমাদের গোত্রেই রয়ে গেলাম, তাই তোমাদের বাড়িতেও থেকে গিয়েছি। যাক ওকথা, আমি তাহলে বেরুচ্ছি।
ছোড়দা এবার দাদাজনোচিত একটি কথা বলেন, একাই যাচ্ছো নাকি?
যদিও একা বেড়ানোর অভ্যাস অনামিকার আদৌ নেই, সভাসমিতির ব্যাপারে এখানে সেখানে যাচ্ছেন বটে সর্বদা, সে তো তারা গলবস্ত্র হয়ে নিয়েই যায়। যাবার ঠিক করে ফেলার আগে সামান্য একটু চিন্তা যে না করেছেন তাও নয়, তবু খুব হালকা গলাতেই উত্তর দিলেন, এই তো এখান থেকে এখান, সকালের গাড়ি, এর আর একা কি?
ছোড়দা আর কিছু বললেন না, ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন, আর ছোড়দার শুধু ঢিলে গেঞ্জি পরা পিঠটা দেখে অনামিকার মনটা হঠাৎ কেমন মায়ায় ভরে গেল। কী রোগা হয়েছে ছোড়দা! পিঠের হাড়টা গেঞ্জির মধ্যে থেকে উঁচু হয়ে উঠেছে। বেচারী! মুখে তেজ দেখিয়ে মান বজায় রাখে, ভিতরে ভিতরে তুষ হয়ে যাচ্ছে বৈকি।
রাগ, দুঃখ, অপমান, লজ্জা, দুশ্চিন্তা, মেয়ের প্রতি অভিমান~-সব কিছুর ভার আর জ্বালা। নিজের মধ্যেই বহন করে চলেছে ও।
একটু অন্তরঙ্গ গলায় একটু কিছু ভালো কথা বলতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু কী-ই বা বলবেন।
ছোড়দা যদি অন্য ধরনের রাগ দেখিয়ে বলতো, যাচ্ছিস যদি তো সেই পাজী মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে চলে আয়–, তাহলে হয়তো সেই অন্তরঙ্গ হবার সুবিধেটা হতো।
কিন্তু যদি আর হয়তোগুলো চিরদিনই চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ হওয়া ছাড়া আর কোনো কাজে লাগে না।
.
নিজ মনে ভাবনা করার পক্ষে রেলগাড়ি জায়গাটা আদর্শ। একগাড়ি লোকের মধ্যেও তুমি দিব্য নিশ্চিন্ত মনে একা থাকতে পারো। তোমার মুখ দেখে কেউ মনের ভাব পড়বার চেষ্টা করবে না।
অনামিকা দেবী এখন তাই ভাবতে পাচ্ছেন, সেজদির সঙ্গে প্রথম দেখার অবস্থাটা কেমন হবে! দেখেই কি উচ্ছসিত হয়ে ছুটে আসবে সেজদি? না শান্ত গম্ভীর অভ্যর্থনায় জমানো অভিমান প্রকাশ করবে?
অনামিকা কি তবে গিয়েই হৈ হৈ করবেন? উঃ সেজদি, কতোদিন পরে দেখলাম তোকে!…অথবা, কী রে চিনতে-টিনতে পারছিস, না চেহারাটা ভুলেই গেছিস? না, ও কথায় আবার উল্টো চাপ পড়তে পারে, সেজদি হয়তো ফট করে উত্তর দিয়ে বসবে, চেহারা ভোলবার জো কি? কাগজপত্রে তো মাঝে মাঝেই চেহারা দেখতে পাওয়া যায়?
