আচ্ছা তুমি যাও, তোমাকে আর নামতে হবে না-আমি গিয়ে নিচ্ছি। বললেন ছোটবৌদি।
অনামিকা প্রমাদ গুনলেন। বললেন, আর বোলো না, সে এক পাগলের চিঠি! মোট কথা, ওইটাই জানিয়েছে।
অর্থাৎ ধরে নাও চিঠিটা তিনি দেখাবেন না।
ছোটবৌদি কালি মুখে বলেন, ওঃ! কিন্তু চিঠিটা তুমি পেয়েছো কখন? আমি তো এই বিকেলের ডাকের পর পর্যন্ত লেটার-বক্স দেখে এসেছি–প্রসূনের চিঠি এসেছে কিনা দেখতে।
ও! ডাকে তো আসেনি। একটা লোক এসে হাতে দিয়ে গেল।
লোক? কি রকম লোক? ছোটবৌদির কণ্ঠে আর্তনাদ।
অনামিকা মিথ্যা ভাষণ দিলেন না, বললেন, রামকালো একটা লোক—
রামকালো। অতএব নিশ্চিন্ত হতে পার।
আবার কী ভেবে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন অনামিকা, ছোড়দা কি কাল চন্দননগরে যাবে?
চন্দননগরে? তোমার ছোড়দা?
ছোটবৌদি তীক্ষ্ণ হন, প্রাণ থাকতে নয়। আর যদিও হঠাৎ বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে যেতে চায়, আমি ঘরে চাবি দিয়ে আটকে রেখে দেব।
অনামিকার পাশ কাটিয়ে ছোটবৌদিই আগে তরতরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যান।
অনামিকা আস্তে আস্তে সিঁড়ি উঠতে লাগলেন। তিনতলা পর্যন্ত উঠতে হবে।
এসে চিঠিখানা আবার হাতে নিলেন, কিন্তু পড়লেন না। ভাবতে লাগলেন, সনৎকাকার বাড়িতে একবার যাবার দরকার আর এখন আছে কিনা।
কাল সকাল! আর এখন আজ রাত্তির!
তার মানে আকাশে-বাতাসে কোথাও কোনখানে চিতার ধোঁয়াটুকুও নেই।
তবে আর ছুটোছুটিতে লাভ কী?
কিন্তু আগামী কাল? অথবা তার পরদিন? কি জন্যে? নীরুদার শোকে সান্ত্বনা দিতে? নাকি অভিযোগ জানাতে? অনামিকাকে কেন খবর দেওয়া হয়নি? অনামিকা পাগল নয় যে এই ধৃষ্টতাটুকু করতে যাবেন! না গেলে কী হয়! পরে কোনো একদিন দেখা হলে নীরুদা যদি বলে, কী, তুমি তো কাকাকে খুব ভালটাল বাসতে, কই মরে যাওয়ার খবর শুনেও তো এলে না একবার!
এই আক্রমণটুকু থেকে আত্মরক্ষা করতে?
দূর!
আগে, মানে অনেক দিন আগে হলে হয়তো এটা করতেন অনামিকা। নিজেকে ক্রটিশূন্য করবার একটা ছেলেমানুষী মোহ ছিল তখন। সেই ক্রটিশূন্য করবার জন্যে প্রাণপাত করেছেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে লড়েছেন, নিজের সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে থেকেছেন।
সেই ছেলেমানুষী মোহটা আর নেই।
ওই ব্যর্থ চেষ্টাটা যে শুধু নিজের ভিতরেই ক্ষয় ডেকে আনে, এটা ধরা পড়ে গেছে। অতএব নীরুদার সঙ্গে সৌজন্য করতে না গেলেও চলবে।
তবে?
তবে চলে যাওয়া যায় চন্দননগরে।
বহুদিনের অদেখা সেজদির কাছে গিয়ে দাঁড়ানো যায়। একটা আগ্রহ অনুভব করলেন, ডাযেরী বইয়ের পাতাটা খুলে দেখলেন আগামী কাল এবং পরশু-তরশু, এই দু-তিনদিনের মধ্যে কোথাও কোনো ফাঁদে পড়ে আছেন কিনা।
দেখলেন নেই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু বাড়িতে কি বলবেন কথাটা?
বলবো না ভাবতেও লজ্জা করছে, বলে কয়ে যাবো ভাবতেও খারাপ লাগছে। শম্পার মা বাপ স্থির হয়ে বসে রইলো, আর পিসি ছুটলো–এটা মেয়েকে আস্কারা দিয়ে নষ্ট করবার আর একটি বৃহৎ নজীর হয়ে থাকবে।
থাক! কী করা যাবে?
ঠিক এই মুহূর্তে কোথাও একটু চলে যাবার জন্যও মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
গতকাল সকালে মারা গেছেন সনৎকাকা, এই শহরেরই এক জায়গায়, অথচ অনামিকা যথানিয়মে খেয়েছেন ঘুমিয়েছেন, ওই পাড়ারই কাছাকাছি রাস্তা দিয়ে গাড়ি করে বেরিয়ে গেছেন রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা পালন করতে।
হঠাৎ আবার অনেক দিন আগের সেই একটা দিনের কথা মনে পড়লো। মানুষ কী পারে আর কী না পারে! সেদিনও তো সভা করেছেন অনামিকা, যেদিন নির্মলের খবরটা পেয়েছিলেন সভামণ্ডপে দাঁড়িয়ে।
সত্যদ্রষ্টা কবি বলে রেখেছেন, জানি এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে, কাটবে গো দিন যেমনি আজও দিন কাটে
পরম সত্য তাতে আর সন্দেহ কী! তবু সেই দিন কাটার অন্তরালে কোথাও কি একটু সুর কেটে যায় না?
নিঃশাস পড়লো মৃদু-গভীরে।
শুয়ে পড়লেন ঘরের আলো নিভিয়ে। আর হঠাৎ মনে হলো, তখন ছোটবৌদির সঙ্গে বৃথা কথায় সেই সুরের তার যেন ছিঁড়েখুঁড়ে ঝুলে পড়ে গেলো। অনামিকা একটি মধুর গভীর সুরের আস্বাদ থেকে বঞ্চিত হলেন।
শোকেরও একটি আস্বাদ আছে বৈকি। গভীর গম্ভীর পবিত্র।
পবিত্র মাধুর্যময় গভীর-গম্ভীর সেই আস্বাদনের অনুভূতিটি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে গেল। সেগুলিকে কুড়িয়ে তুলে নিয়ে আর সম্পূর্ণতা দেওয়া যাবে না। আর ফিরে পাওয়া যাবে না সেই প্রথম মুহূর্তের স্তব্ধতা। এও একটা বড় হারানো বৈকি।
পারিবারিক জীবনে এমন কতকগুলো ব্যাপার আছে, যেগুলো নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও না করে উপায় নেই। না করলে পারিবারিক আইন লঙ্ঘন করা হয়।
আপন গতিবিধির নিখুঁত হিসেব পরিবারের অন্যান্য-জনের কাছে দাখিল করা তার মধ্যে একটি। তোমার হঠাৎ ইচ্ছে হলে কোথাও চলে যাবার ক্ষমতা তোমার নেই, মনের উপর চাপানো আছে ওই আইনভার।
চলে যাওয়াটাই তো শেষ কথা নয়। তার পেছনে ফিরে আসা বলে একটা কথা আছে। ফিরে আসার পর পরিজনেরা জনে জনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে শুধোবে না, কী আশ্চর্য, না বলে চলে গেলে? কোথায় গেলে কাউকে জানিয়ে গেলে না?
পারিবারিক শাস্ত্রে এটা খুব গর্হিত অপরাধ। যেন অন্যদের অবমাননা করা। যেন ইচ্ছে করে স্বেচ্ছাচারিতার পরাকাষ্ঠা দেখানো।
