ছোটকাকা ভাইপোর কথা শেষ করতে দেননি, প্রবোধচন্দ্রের উত্তরাধিকারীর কণ্ঠে বলেছিলেন, আমি বলবো চুরি করতেই পাঠিয়েছি। তোমরা–তোমরা দুই স্বামী-স্ত্রীতে মিলে নিঃশব্দে বসে সিঁদ কেটে কেটে এ বংশের মানসম্ভ্রম, সভ্যতা-ভব্যতা সব কিছু চুরি করেছ ওই মেয়েটিকে দিয়ে।
ও বাবা, ছোটকাকা যে খুব ঘোরালো উপমা-টুপমা দিচ্ছো দেখছি! তাহলে বলতে হয়, ডাকাতির ভারটা তুমি বোধ হয় তোমার নিজের মেয়ের ওপর দিয়েছো?
তখনো শম্পা পালায়নি।
কিন্তু উড়ছিল তো?
সেই আকাশে উড়ন্ত চেহারাটা সকলেরই চোখে পড়েছিল।
ছোটকাকা তথাপি বলেছিলেন, বাপ-কাকাকে অপদস্থ করার মধ্যে কোনো সভ্যতা নেই অপূর্ব! বললেন প্রবোধচন্দ্রের ছোট ছেলে। যৌবনকালে নিজের যার ওইটাতেই ছিল রীতিমত আমোদ।
কিন্তু যৌবনকাল তো চিরকালের নয়, যৌবনকাল কখন কোন্ ফাঁকে তার ঔদ্ধত্য আর উন্নাসিকতা, অহমিকা আর আত্মমোহ, প্রতিবাদ আর পরোয়াহীনতার পোর্টফোলিওটি ফেরত নিয়ে নিঃশব্দে সরে পড়ে। হৃতসর্বস্ব প্রৌঢ়ত্ব তখন আপন অতীতকে বিস্মৃত হয়ে যৌবনের খুঁত কেটে বেড়ায়, যৌবনের ঔদ্ধত্য দেখে ক্রুদ্ধ হয়।
অপূর্বর ছোটকাকা হলেন ক্রদ্ধ, বললেন, আমার মেয়েকে আমি কিছু আর প্রশংসা করে বেড়াচ্ছি না, আর প্রশ্রয়ও দিচ্ছি না তাকে। তাছাড়া বাড়ির মধ্যে নাচুক, কুঁদুক, যা হয় বরুক, বাইরে বংশের প্রেসটিজের প্রশ্ন আছে।
মেয়েরা চাকরি করলে বংশের প্রেটিজ চলে যায়, একথা এযুগে বড়ো হাস্যকর ছোটকাকা।
চাকরি করাটাই দোষের এ কথা তো তোমাকে বলিনি, ওই চাকরিটা ভদ্রলোকের মেয়ের উপযুক্ত নয়, সেটাই বলেছি।
ধারেকাছে কোথায় অলকা ছিলো, সে এসে পড়ে খুব আস্তে বলেছিল, একথা এখানে যা বললেন, বাইরে বলবেন না ছোটকাকা! বরং খোঁজ নিয়ে দেখবেন, যেসব মেয়েরা ওখানে রয়েছে, তারা কী রকম ঘর থেকে এসেছে।
ছোটকাকা একবার দিশেহারার মত চারিদিকে তাকিয়ে বোকার মত বলেন, তারা বাঙালী নয়।
বলা বাহুল্য এবার হেসে না উঠে পারেনি অলকা, বলেছিল, বাঃ, তাহলে আপনার মতে যারা বাঙালী নয়, তারা ভদ্রলোক নয়?
সেকথা হচ্ছে না, ছোটকাকা তীব্র হন, তোমার তো চিরকালই এঢ়েতর্ক, তাদের সমাজে যা চলে আমাদের সমাজে তা চলে না। বাঙালীর একটা আলাদা কালচার আছে–
ওই থাকার আনন্দেই আমরা মরে পড়ে আছি ছোটকাকা, কোন্ কালে মরে ভূত হয়ে যাওয়া কালচারের শবসাধনা করছি! আমি ওসব মানি না। আমি বিশ্বাস করি যুগের সঙ্গে পা ফেলে চলতে হবে।
কিন্তু পরে, এই অপূর্বই তবে ছোটকাকার মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ব্যঙ্গ-হাসি না হেসে উদ্বিগ্নের ভূমিকা নিয়েছিল কেন? উদ্যোগী হয়ে পিসিকে জেরা করতে গিয়েছিল কেন, তার ঠিকানার সন্ধানে?
কারণ আছে, গূঢ় কারণ।
যুগের সঙ্গে পা ফেলে চলতে গিয়ে হঠাৎ পা ফসকে অপূর্বর মেয়ে সত্যভামা তখন আবার দিনকয়েকের জন্যে মামার বাড়ি বেড়াতে গেছে, ব্যঙ্গ-হাসির প্রতিক্রিয়াটা যদি সহসা সেই মামার বাড়ির ঠিকানাটা আবিষ্কার করে বসে।
কিন্তু মেয়ে যদি স্বাস্থ্যশক্তি উদ্ধার করে মামার বাড়ি থেকে ফিরে এসে আবার পরোয়াহীনতার ভূমিকা নেয়, অপূর্বর তবে আবার যুগের সঙ্গে পা মেলানো ছাড়া উপায় কি? নতুন এই পালা বদলের পালায় অপূর্বর মেয়ে ক্যাবারে নাচে রপ্ত হয়েছে। অপূর্ব কথাচ্ছলে লোককে শুনিয়ে বলে, মেয়ের ব্যাপারে ওর মা যা ভাল বুঝছে করছে, আমি ওর মধ্যে নাক গলাতে যাই না। আজকের সমাজে কী চলছে আর কী না-চলছে ওর মাই ভালো বোঝে।
অতএব অন্যেরাও ভালো বুঝে চুপ হয়ে গেছে। অপূর্বর মা’র ছেলে-বৌয়ের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ অনেক দিন, মেয়েরা আসে, মায়ের ঘরে বসে মীটিং করে, চলে যায়, অলকা বলে, আমার শাপে বর। নইলে ওই চারখানি ননদিনীর হ্যাঁপা সামলাতে হতো বারো মাস।
অপূর্বও সেটা স্বীকার করে বৈকি।
সত্যভামার এই নৃত্য তো শুধুই ভূতের নেত্য নয়। ও থেকে পয়সা আসে ভালোই। তবে? এও তো একটা চাকরির বাজার আগুন, সংসারের চাল বেড়ে গেছে যথেষ্ট, একার উপার্জনে চাল বজায় রেখে চলেই না তো! মেয়ে এবং ছেলে যখন সমাজে সমান বলে স্বীকৃত, তখন বাপের সংসারের অচল রথকে সচল করে তোলার দায়িত্ব মেয়ে বহন করলেই বা লজ্জা কি?…কিন্তু প্রবোধচন্দ্রও তো লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে অন্তরীক্ষ থেকে বজ্র নিক্ষেপ করলেন না কোনো দিন? যাতে ভিটেটা তার কলঙ্ক সমেত চুর্ণ হয়ে যায়?
কিন্তু লজ্জা আশপাশের লোকের।
তাই অনামিকা তার ছোটবৌদির আক্ষেপের মুখে বলে ফেললেন, মেয়েকে নিজের মনের মতো করে মানুষ করার নমুনা তো দেখলাম!
বলেই বুঝলেন, খুব অসতর্ক হয়ে গেছে। এই অসতর্কতা ছোটবৌদিকে শক্রশিবিরে টেনে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কী আর করা! হাতের ঢিল মুখের কথা একই বস্তু, এ তো চিরকালের কথা।
ছোটবৌদি অবশ্যই ফোঁস করে উঠলেন।
বললেন, সবাই সমান নয় ছোটঠাকুরঝি। রাগের সময় উনি ঠাকুরঝি শব্দটা ব্যবহার করেন। বললেন, অলকার সঙ্গে আমার তুলনা করো না। কিন্তু দেখাতে পেলাম না, এই আমার দুর্ভাগ্য!
অনামিকা এই আক্ষেপের মুখোমুখি কতোক্ষণ আর দাঁড়িয়ে যুঝবেন, বললেন, আচ্ছা খবরটা ছোড়দাকে দিও–
চলে যাবার জন্যে পা বাড়ালেন। ছোটবৌদি বললেন, চিঠিটা কই?
অনামিকা বললেন, চিঠিটা! সে তো আমার ঘরেই রয়েছে।
