আবেগের মাথায় বেশী কিছু বলে ফেলার আগে সত্য সামলে দেয়, দুগগা দুগগা, ও কি কথা! তুমি হলে স্বামী, গুরুজন। রাজকন্যের কথা নয়, তবে প্রাণটা হু-হু করতে পারে কি না!
একশোবার পারে। হাজারবার পারে।
বলে নবকুমার অসমসাহসিকতায় ভর করে হাতটা বাড়িয়ে সত্যর কাঁধে একটা হাত রাখে।
তা সত্য কি এই স্নেহস্পর্শে অথবা প্রেমস্পর্শে পুলকিত হয় না? হয়। তবু মেয়েলী সাবধানতায় চুপি চুপি বলে, এই সরে দাঁড়াও, কে কমনে দেখে ফেলবে, এরপর আর তাহলে জনসমাজে মুখ দেখাবার জো রইবে না! খিড়কির পুকুর বৈ গতি থাকবে না!
নবকুমার কিন্তু এ ভয়ে ভীত হয় না। বরং আরও একটা হাত স্ত্রীর আরও একটা কাঁধে দিয়ে ঈষৎ আকর্ষণের ভঙ্গীতে বলে, কেন, পরপুরুষ নাকি?
না হোক, লোক-লজ্জা বলে একটা জিনিস তো আছে।
সে যদি বলল, এখানে নিরালায় চুপি চুপি দেখাতেই নিন্দে হতে পারে, কিন্তু তোমার ভাই তো বলেছে এখানে কেউ আসে না।
তা আসে না বটে…
সন্ধ্যের অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে
নবকুমার হঠাৎ একটা কবি-কবি কথা বলে বসে, তা সত্যি। তোর বাবাকে ইয়ে শ্বশুরঠাকুরকে দেখলে আমার এমনি বটবৃক্ষের কথা মনে আসে। বিরাট বটবৃক্ষ।
সত্য চমকে ওঠে।
সত্য অভিভূত হয়!
আর তারই আবেগে হঠাৎ লোকলজ্জা ভুলে নবকুমারের হাত দুটো হাতে চেপে ধরে বলে, সত্যি বলছ? আমার বাবাকে তোমার ভাল লেগেছে?
ভাল লাগার কথা বলতে পারছি না, বলছি ভক্তির কথা সমীহের কথা। বিরাট বটবৃক্ষ দেখলে যেমন সমীহ আসে
কথা কয়েছ বাবার সঙ্গে?
কথা? ওরে বাস! তিনি কোথায়, আমি কোথায়? কত ব্যস্ত মানুষ, দূরে থেকেই দেখছি
সত্য আবৃছা বিহ্বল গলায় আস্তে বলে, বাবাকে সবাই দূরে থেকেই দেখে। সবাই। মা পর্যন্ত। শুধু এই সত্য মুখপুড়ীই
লোকলজ্জা আরও বিস্মৃত হয়ে সত্য নবকুমারের তৃষিত বক্ষে মাথাটা রাখে।
নবকুমারও অবশ্য বেশ কিছুটা সময় এই মধুর আস্বাদের সুযোগ গ্রহণ করে নেয়, তারপর চুপি চুপি বলে, নতুন জামাই, প্রথম এলাম এমন একটা শোক-দুঃখুর উপলক্ষে। কারুর বে-থায় এলে অবিশ্যিই আমাদের দুজনকে ঘর দিত, কি বলো?”
সত্য এই মেয়েলী কথাটা শুনে হেসে ফেলে। হেসে বলে, দিলেই বুঝি নিতাম?
নিতে না?
পাগল! ঘটে লজ্জা নেই বুঝি? বর বস্তুটা শ্বশুরবাড়িতেই ভাল, বুঝলে?
নবকুমার অভিমানভরে বলে, বুঝলাম। তাই এই হতভাগা চলে যাবার পর আরও দু’মাস ভাল করে থাকা হবে।
সত্যর মনের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ-শিহরণ খেলে যায়। দু’মাস কি কত মাস কে জানে! পিস্ঠাকুমা তো সেই মোক্ষম কথাটা বলে বসেছে। আসার সময় সদুদি যা বলে ভয় জন্মিয়ে দিয়েছিল।… ক্রমশ সত্যও যেন অনুভব করছে, শরীরের মধ্যে কোথাও একটা অস্বস্তি বাসা বেঁধেছে… মনে হচ্ছে যেন গলার কাছটাতেই প্রধান অস্বস্তি। কেবলই যেন ভেতর থেকে ঠেলা মারছে, খাদ্যবস্তু নামতে চায় না, উঠে আসার তাল করে।….. ওই খাওয়া থেকেই ধরে ফেলেছে পিসঠাকুমা। আর সঙ্গে সঙ্গে নানাখানা বিষয়ের উপদেশ দিয়ে জব্দ করেছে। তার মধ্যে প্রধান নিষেধ ছিল… সাজ-সন্ধ্যেয় আগানেবাগানে গাছতলায় না যাওয়া।
তা সত্য নিষেধটা মানছে ভাল!
হঠাৎ একটু চঞ্চল হয়ে ওঠে সত্য। বলে, যাই রাত হয়ে যাচ্ছে, বকবে!
এখানে আবার বকবে কে? নবকুমার নিশ্চিন্তে বলে, এখানে তো তুমি মহারানী। নেড়ু আমায় সব বলেছে। কী আদুরে মেয়ে তুমি, কী লাঞ্ছনাতেই পড়েছ–
সত্য এবার নিজস্ব দৃঢ়তায় ফেরে।
দৃঢ়স্বরে বলে, ওসব কথা বলছ কেন? যার যা নিয়তি। শ্বশুরঘরে বকুনি-ঝকুনি আর কোন মেয়েটার নেই? ছাড়ো ওকথা। যাচ্ছি–
নিতান্তই যাবে? কি আর বলব? আবার কবে দেখা হবে?
তা কি করে বলি!
আমি তো এই সামনের বুধবারে চলে যাব, তার মধ্যে একবার হবে না?
আচ্ছা দেখি!
নবকুমার আস্তে আস্তে বলে, ইচ্ছে হচ্ছে এখানেই থেকে যাই। কী বাড়ি! সদাই সরগরম! আর আমাদের বাড়িতে যেন
তা হোক। নিজের যা তাই ভাল। সত্য আবার দৃঢ়স্বরে বলে, তুমিও কালে-ভবিষ্যতে দশের একজন হবে, তোমার সংসারও তেমনি সরগরম হবে।
আমার? হু! সে যাক্, কবে আবার গরীবের ঘরে যাবে?
সত্য ঝপ করে বলে বসে, বলতে পারছি না, ছ মাস এক বছরও হতে পারে
ছ মাস এক বছর! নবকুমার বিহালভাবে বলে, তার মানে?
আছে মানে। বলে হঠাৎ তুরিগতিতে দৌড় দেয় সত্য।
যদিও ঘরে-পরে সবাই বলছে, কী বড়ই হয়েছে সত! বলছে, রূপ যেন ফেটে পড়ছে, কী বাড়বাড়ন্ত গড়নই হয়েছে– তথাপি দৌড়ঝাপের কমতি নেই তার
তবে পিসঠাকুমার সামনে আর দৌড়ঝাঁপ চলবে না মনে হচ্ছে।
নবকুমার অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আকাশপাতাল চিন্তা করে। তারপর সিদ্ধান্তে আসে কিছুই নয়, মেয়ে অনেক দিন শ্বশুরঘর করছে, মা-বাপ এবার হাতে পেয়ে আটকে ফেলবে।
.
হেসে খেলে পাড়া বেড়িয়ে বেড়াচ্ছিল সত্য, এখানে আসার প্রাক্কালে সদু যে সন্দেহ প্র! করেছিল সেটাকে চোখ বুজে অস্বীকার করে। ভিতরে যদি কোনো অস্বস্তির আলোড়ন অজানা এক ভয়ের ছায়া ফেলেও থাকে, বাইরের আলোড়নে সেটা মুছে গেছে।
চট করে কারো সন্দেহও আসে নি, কারণ সত্য কতক্ষণই বা কার চোখের ওপর আছে? যজ্ঞের আনুষঙ্গিক জের নিয়ে ব্যস্ত সবাই। হঠাৎ একদিন সন্দেহ জাগল ভুবনেশ্বরীর। যে মা চোখ দুটো সহস্র কাজের মধ্যেও সত্যর চোখ-মুখের কাছাকাছিই আছে।
