একান্ত নিভৃতে, মনের অন্তরালে রয়েছে সেই নিঃশ্বাস। এত পূর্ণতার মধ্যেও কোথায় যেন একটা সগভীর শূন্যতা, সেই শূন্যতার ওপরই বুঝি পা রাখতে হয়েছে সত্যকে, তাই পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পাচ্ছে না।
সে শূন্যতা– সত্য আর এদের নয়। এ সংসার সত্যর নয়।
.
বিরাট কাজের বাড়িতে কে কোথায় ঠাঁই পেয়েছে কে জানে! মেয়েরা মেয়েমহলে, পুরুষরা বারমহলে। কোটাঘরে সব জামাই-কুটুম, আর নবনির্মিত আটচালার নিচে জ্ঞাত-গোত্তর,.. নবকুমার যে কোন্খানে আছে সত্য জানে না, মাঝে মাঝে সেটা মনে পড়ছে। আহা মানুষটা মুখচোরা লাজুক, কোথায় কি ভাবে আছে কে জানে! এসে অবধি তো দেখা হয় নি!… বাবা সহস্র কাজে বেড়াচ্ছেন, বাবার এমন সময় নেই যে জামাই নিয়ে তদারকি করে বেড়াবেন! যা করে পাঁচজনে.. কি ভাবছে ও আমাকে কে জানে!
থেকে থেকেই সেই মানুষটার কথা মনে পড়ছিল। মনকেমন মনকেমন ভাবটা ছিল, আবার একটু অহঙ্কারী অহঙ্কারী দুষ্টুবুদ্ধিও ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল একবার লোকটাকে ডেকে বলে, দেখছ তো? সবই দেখছ? বুঝতে পারছ, তোমার মা যতই হেলাফেলা করুন, নেহাৎ হেলাফেলা ঘরের মেয়ে আমি নই!
কিন্তু এসব বলার সুযোগ কোথা?
বিয়েবাড়ি নয় যে সবাই রঙ্গরসে মাতবে। মাতৃদায় উদ্ধার বলে কথা। তাছাড়া অনেকের মধ্যে একজন হলেও দীনতারিণীর পদটা বাড়ির গিন্নীর ছিল, ছোট ননদদের তিনি যতই ভয় করে চলে থাকুন, আর ছেলেকে যতই সমীহ করে আসুন, সবাই জানতো গিন্নী বলতে দীনতারিণীই। সেই গিন্নীর জায়গা শূন্য হয়ে গেলে সবাইয়েরই ফাঁকা ফাঁকা লাগে বৈকি। খেটে খেটেও জেরবার হচ্ছে সবাই, এর মাঝখানে কার এ কথা মনে উদয় হবে, সত্যর সঙ্গে সত্যর বরের দেখা করিয়ে দিই কোন ছলছুতোয়। তাছাড়া চাতক পক্ষীর অবস্থা তো নয় সত্যর। এই দীর্ঘকাল নিচ্ছিদ্র বরের ঘর করে এসেছে সে। সত্যর বরকে সত্যর দেখতে ইচ্ছে হবে, এ চিন্তা তাদের মনে উদয় হবার কথা নয়।
উদয় হচ্ছে এক ভুবনেশ্বরীর।
কিন্তু সে তো সব দিকেই বন্দিনী। একে তো শাশুড়ী মরার নিয়ম-নীতির দায়, তার উপর মেয়ের ভয়ের দায়। ওরকম চেষ্টা করতে গেলে সত্য যে ক্ষেপে উঠবে না, এ প্রতিশ্রুতি কে দেবে ভুবনেশ্বরীকে?
কিন্তু সত্যর মা কি সত্যকে সবটা বুঝে উঠতে পেরেছে?
পারে নি।
সত্য যে ছলছুতো খুঁজে বেড়াচ্ছিল, এ তার ধারণার বাইরে।
তা অবশেষে হয়ে গেল যোগাযোগ।
নিয়মভঙ্গের যজ্ঞি মিটতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেছল, সত্য পুকুরঘাট থেকে আঁচিয়ে একবার নিজের মামার বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিল মামীদের সঙ্গে, জোরপায়ে ফেরার সময় নেড়ুর সঙ্গে দেখা।
নেড়ু দাঁড় করালো।
মুখটা রহস্যে উদ্ভাসিত করে বলল, এই সত্য, তোর ভূতের ভয় আছে?
ভূতের ভয়!
হুঁ হুঁ, গেছো ভূতের ভয়! নির্ঘাত আছে, তাই না?
নির্ঘাত আছে!, সত্য মুখ নেড়ে বলে, এলেন আমার গণকার ঠাকুর!
নেই ভয়? ঠিক বলছিস? এই ঝিকিমিকি বেলায় তোদের সেই বটগাছতলায় যেতে পারিস? সে যেতে আর হয় না। হুঁ, জনমনিষ্যি যায় না সেখানে।
ওরে আমার কে রে? কেউ যায় না সেখানে? তুই যাস না তাই বল। তুইও কম খেলিস নি সেখানে, তবু মায়ামমতা নেই। আমাদের কথাই আলাদা, আমি আর পুণ্যি যাই নি যেন।
তা হঠাৎ ন্যাকা হচ্ছিস কেন রে নেড়ু? পেঁচার চোখ গুনতে যেতাম না আমরা?
আরে সে তো আগে। এখন শ্বশুরঘর করে করে সাহস হরে যায় নি?
ইল্লি রে! গেলেই হল! চল্ না দেখিয়ে দিচ্ছি, একপোর রাত অবধি বসে থাকতে পারি, তা জানিস?
বলে গটগট করে এগিয়ে যায় সত্য নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে, এই কনে দেখা আলোতেও যেখানটা গভীর অন্ধকার।
কিন্তু কে ওখানে?
কে! কে!
প্রায় চেঁচিয়েই উঠছিল সত্য, সামলে নিল নেড়ুর ভয়ে। শুনতে পেলে আর রক্ষে রাখবে? সত্যর ভয়ের কথা ঢাক পিটিয়ে বেড়াবে।… কিন্তু লোকটা যে এদিকেই আসছে! পালাবে সত্য? উঁহু, এ নির্ঘাত নেড়ুর কোন কারসাজি, তা নইলে–
হঠাৎ একটা সম্ভাবনায় পা থেকে মাথা অবধি একটা তড়িৎপ্রবাহ বয়ে যায়, আর পরক্ষণেই সম্ভানাটা প্রত্যক্ষের মূর্তিতে দেখা দেয়!
ইস তুমি! তুমি এখানে যে—
জেনে বুঝেও বিস্ময়ের ভান করে সত্য।
নবকুমার হতাশ গলায় বলে, কেন আর, তোমারই দর্শন আশায়! উঃ বাপেরবাড়ি এসে একেবারে ডুমুরের ফুল হয়ে গেছ, লোকটা মরল কি বাঁচল খোঁজও নেই!
সত্য পুলক গোপনের ব্যর্থ চেষ্টায় হেসে ফেলে বলে, আহা, কথার কি ছিরি রে! আমিই তো খোঁজ করে বেড়াব!
তা একবার দেখা তো দেবে? আমি হতভাগ্য যাই অনেক বুদ্ধি খেলিয়ে—
তা তো দেখতেই পাচ্ছি। নেড়ু ছাড়া আর কারুর কানে গেছে নাকি?
নাঃ, শুধু ও_
যাক, তবে ঠিক আছে। নেড়ু বিশ্বাসঘাতক নয়। তা বলি দরকারটা কি?
দরকার! নবকুমার আরো হতাশ গলায় বলে, বিনি দরকারে বুঝি নিজের পরিবারকে একটু দেখতে ইচ্ছে করে না? তোমার মতন পাষাণহৃদয় তো নয়?
পাষাণহৃদয়! তা বটে।
সত্য অনুচ্চস্বরে হেসে ওঠে। তারপর বলে, কেমন লাগছে?
খুব ভালো। নবকুমার অকপটে বলে, মাইরি বলছি, স্বপ্নেও ভাবি নি শ্বশুরবাড়িটা আমার এমন! কী ঐশ্বয্যি, কী দবদবা! দেশটাও চমৎকার! মা গঙ্গা দেখলে প্রাণ জুড়োয়!
সত্য একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, তবেই বোঝ, মেয়েমানুষকে কতটি ত্যাগ করতে হয়!
তা সত্যি।
নবকুমার আরও একবার অকপটে স্বীকার করে, এসে অবধি সেই কথাই ভাবছি। বলতে গেলে তুমি তো একটি রাজকন্যে। সে তুলনায় আমি
