সন্দেহ জাগতেই চুপি চুপি সারদার কাছে ব্যক্ত করল ভুবনেশ্বরী, আর সারদাও লক্ষ্য ঘনীভূত করে নিঃসংশয় হল।
ব্যস, মুহূর্তে এ-মুখ থেকে ও-মুখ, এ-কান থেকে ও-কান। গ্রামসুদ্ধ মহিলা খবরটা জেনে ফেললেন একটা বেলার মধ্যেই। মহিলাদের মারফৎ পুরুষরাও।
কিন্তু রামকালীর কানে উঠতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। কারণ মাতৃবিয়োগের পর থেকে বাড়ির ভিতর শুচ্ছিলেন না রামকালী। পুরোপুরি কালাশৌচের কালটা যে এই নিয়মেই চলবেন তিনি, সেটা যেন অদৃশ্য কালিতে লেখা হয়ে গিয়েছিল।
ভুবনেশ্বরী তবে কোন উপায়ে এই ভয়ঙ্কর আনন্দের বার্তাটা তার কানে পৌঁছে দেবে?
উপায় হচ্ছে না, অথচ এই অপরিসীম আনন্দের ভাবটা একা একা বহন করাও কঠিন মনে হচ্ছে।
দু’দিনেই দু বছর হয়ে ওঠে ভুবনেশ্বরীর।
তবু এ ইচ্ছেও হচ্ছে না, আর কেউ বলে ফেলুক। এই মধুর সুন্দর ভয়ঙ্কর রমণীয় খবরটি ধীরে ধীরে একটি উপহারের মত ধরে দেবে স্বামীকে, এই বাসনায় মর্মারিত হয়ে ওঠে ভুবনেশ্বরী।
কিন্তু নিজ কণ্ঠে সে উপহার দেওয়া আর ঘটে উঠল না তার। রামকালীর খেতে বসার সময় হঠাৎ মোক্ষদা দুম করে বলে বসলেন। বললেন, বললে তোমার মাথায় থাকবে কিনা জানি না, তবু বলা কর্তব্য তাই বলছি, দাদামশাই হতে চললে!
রামকালী চমকে তাকালেন।
কথাটা ঠিক বোধগম্য হল না।
মোক্ষদা এসব পছন্দ করেন না। অতএব তিনি আরও স্পষ্ট প্রখর ভাষায় বলে ফেলেন, বাংলা বৈ উর্দু ফার্সি বলছি না বাবা, বলছি সত্যর ছেলেপুলে হবে!
রামকালী সহসা বিষম খেলেন।
জলের গ্লাসটা মুখে ঠেকিয়ে নামিয়ে রাখলেন, তাপর ঘাড় নিচু করে যেন পাতের ভাতের মধ্যে কথাটার অর্থ খুঁজতে লাগলেন।
না, কথা তিনি এখন কইবেন না। আচমন করে বসেছেন। কালাশৌচের বছরটা রীতিমত বিধিনিষেধের মধ্যে থাকতে চান। এসবে বিশ্বাসী তিনি কোনদিনই নন, কিন্তু মানুষের মন যে কত জটিল জিনিস, দীনতারিণীর মৃত্যুতে তা আর একবার দেখা গেল– রামকালীর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আচারনিষ্ঠা দেখে।
কথা কইবেন না। অতএব উত্তরও মিলবে না।
তবু এই সময়টুকু ছাড়া রামকালীকে পাচ্ছে কে? কাজেই যাবতীয় জ্ঞাতব্য বিষয় এই সময়েই রামকালীর কর্ণকুহরে ঢালার পক্ষে প্রকৃষ্ট।
বিষম খাওয়া শেষ হলে মোক্ষদা আর একবার বলেন, আমি এই জানিয়ে দিলাম, এখন তোমার গুণবতী বেয়ানকে জানাবার কি ব্যবস্থা করবে তা দেখ! মাগীকে তো দিয়ে থুয়েও মন পাওয়া যায় না! এক ঝাক মণ্ডা আর এক জালা তেল দিয়ে পাঠাও কাউকে, তার সঙ্গে পাদ্য-অর্ঘ্য!
.
রামকালী খেয়ে চলেছেন, ওদিকে ভুবনেশ্বরীর চোখে জল। যে খবর শুনে রামকালীর আহ্লাদে প্রাণ উথলে ওঠার কথা, সেই খবর দেওয়া হল কিনা তার মৌনকালে। কেন খাবার সময় ছাড়া আর দেয়া যেত না?
তাছাড়া ভুবনেশ্বরীর আর আকাঙক্ষা আর উদ্বেগ আনন্দে কম্পমান হৃদয়টি তার দল মেলে বিকশিত হয়ে উঠতে পেল না।
অবিশ্যি এত সুচারু করে কি আর ভাবতে পারল ভুবনেশ্বরী?
তা নয়।
শুধু চোখের সেই জলের ধারাটা যেন অবিরল হয়ে উঠল নানা অনুভূতি আর অব্যক্ত বেদনার ধাক্কায়।….
মোক্ষদা শেষ অস্ত্রটি ত্যাগ করে, আর একটা কথা না বলে বাচছি না, মেয়ে তো তোমার এতদিন শ্বশুরঘর করেও কিছুমাত্তর বদলায় নি! যে ধিঙ্গী সেই ধিঙ্গী! সাঁঝ-সন্ধ্যের মানে না, ডিঙানো মাড়ানো গেরাহ্য করে না, আগান-বাগান, ঘাট, পুকুর, ছিষ্টি মাড়িয়ে বেড়াচ্ছে! আমি বারণ করতে গিয়ে শুধু হাস্যাস্পদ হয়েছি মাত্তর, এখন তুমি দেখ যদি শাসন করতে পারো!
রামকালীর কি আজ গলা দিয়ে ভাত নামছে না? তাই এত দেরি হচ্ছে খেয়ে উঠতে?
মোক্ষদার এত অবসর নেই বসে থাকবেন, বড়বৌমা দেখো শ্বশুর আর কিছু নেয় কিনা বলে চলে যান মোক্ষদা।
রাগ হয়েছে তাঁর। হলেই বা মৃত্যুশোক, তাই বলে এমন সুখবরে মুখটা প্রসন্ন করবে না? এত কী! যাক, সত্যর শ্বশুরবাড়ি খবর পাঠানোর ব্যবস্থা তাকেই করতে হবে। এ তিনি জানেন। এটা মেয়েলি কাজ।
সারদা অদূরে বসে আছে পাখা হাতে, তার ওপরই শ্বশুরকে দেখার নির্দেশ।
হ্যাঁ, সারদাই বসে একগলা ঘোমটা দিয়ে। এটা তার সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য। দীনতারিণী, মোক্ষদা, কাশীশ্বরী, শিবজায়া যে কেউই কাছে থাকুন, খাওয়ার তদারকি করুন, সারদা তফাৎ বাচিয়ে বসে পাখা নাড়বেই।
আর কে করবে?
ভুবনেশ্বরী তো আর এই একবাড়ি গিন্নীর সামনে লজ্জার মাথা খেয়ে স্বামীর খাওয়ার তদারক করতে আসবে না।
মোক্ষদা চলে যেতে রামকালী উঠলেন।
দাওয়ার ধারে চকচকে করে মাজা গাড় ও তার উপর পাট করা কাঁচা গামছা রক্ষিত আছে আঁচানোর জন্যে, তবু হঠাৎ কি ভেবে চলে গেলেন ঘাটে। হবিয্যের সময় ঘাটে মুখ প্রক্ষালন করাটা বিধি ছিল বটে, কিন্তু এখন কেন?
যে জন্যেই যান–
আজ ভুবনেশ্বরী ভয়ঙ্কর এক অসমসাহসিক কাজ করে বসল। দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের পিছনে গলির বেড়ার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে, মেয়েঘাটের আবরু স্বরূপ আড়াল করা যে ঝোঁপঝাড়গুলো আছে, তার পাশ দিয়ে এগিয়ে প্রায় পুরুষঘাটের কাছ-বরাবর দাঁড়িয়ে থাকল।
রামকালী হাতমুখ ধুয়ে ফেরার পথে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, এ কী, তুমি এখানে?
ভুবনেশ্বরী ঘোমটার মধ্যে থেকেই রুদ্ধকণ্ঠে বলে, তা কি করবো! চোরে কামারে তো দেখা নেই, একটা কথার দরকার থাকলে–
