হয়তো ছিল হয়তো আছে, কিন্তু এই জন্মান্তর পার হয়ে আসা মেয়েটাকে কি আর এখন সেই খাঁজে ধরবে? কোনো মেয়েকেই কি ধরে? গোত্রান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই কি অন্তরের বিরাট একটা পরিবর্তন হয় না?
যে মেয়েটা হয়তো উঠতে বসতে বকুনি খেয়েছে আর নিতান্ত অবহেলায় খেলে খেলিয়ে বেড়িয়েছে, সে হয়ে ওঠে আদরের অতিথি, সমীহর কুটুম্ব। কোন্খানে তবে আশ্রয় পাবে সেই মেয়েটা?
এত বড় কাজের বাড়ি, তবু ওরা সত্যর সঙ্গে সঙ্গে ফিরছে। সারদা, ভুবনেশ্বরী, শিবজায়ার নাতনী দুটো, এমন কি মোক্ষদা পর্যন্ত। সত্য কি খাবে, সত্য কোথায় শোবে, সত্য কোথায় বসবে সত্যর কিছু চেয়ে না পাওয়া হল কিনা এই সব। ভুবনেশ্বরীর তো কথাই নেই। তার শাশুড়ী গেছেন, মহা অশৌচ, ছুঁয়ে নেড়ে কিছু করার ক্ষমতা নেই, তবু বলে বলেই যা পারে।
ব্যাপারটা স্বস্তিকর নয়, এ যেন প্রতি মুহূর্তে মনে পড়িয়ে দেওয়া, তুমি কুটুম, তুমি অতিথি!
একসময় ঝেঁজেই উঠল সত্য। মা’র ওপরই উঠল।
কী চাও বল তো তোমরা? এক্ষুনি আবার শ্বশুরবাড়ি চলে যাই? বাবাঃ, তোমাদের এই আদরের ঠ্যালা সামলানো আমার কম্ম নয়। বাড়িতে তো আরো শ্বশুরতি মেয়ে এসেছে, কই তাদের নিয়ে তো এত হৈ-চৈ করছ না?
কথাটা সত্যি।
আরো শ্বশুরঘর করা মেয়ে এসেছে। পুণ্যি তো এসেইছে, কুঞ্জর দুই গিন্নীবান্নী মেয়ে এসেছে, শিবজায়ার মেয়ে এসেছে, রামকালীর যে ছোট খুড়ো নেই তার তিনটে মেয়ে এসেছে, কুঞ্জর সহোদর বোনেরা এসেছে, তারা ঝকের কৈ হয়ে রয়েছে। শুধু সত্যকে নিয়েই
ভুবনেশ্বরী মেয়ের এই ঝঙ্কারে অপ্রতিভ হয়ে বলে, তারা সবাই পেরায় পেরায় আসে। তোর মতন কে এমন ঘরবসতে গিয়ে একেবারে তিন-চারটে বছর।
কথা শেষ করতে পারে না ভুবনেশ্বরী।
সত্য মা’র এই রুদ্ধবাক মুখের দিকে তাকিয়ে একটু নরম হয়ে বলে, বুঝলাম। কিন্তু আছি তো দিনকতক। কাজ মিটতেই তো পালাচ্ছি না, সে কথা হয়ে গেছে ওখানে। তখন কোরো মেয়েকে আদরগোবর। এখন তোমার শাশুড়ীর ছেরাদ্দ, এখন মানায় মেয়ে নিয়ে সোহাগ করা?
ভুবনেশ্বরী সজল চোখে বলে, কদিন থাকবি তুই-ই জানিস!
থাকবো বাবা, মাস দুই অন্তত থাকবো, হয়েছে সে-কথা।… চল পুণ্যি, আমাদের সেই বটতলার খেলাঘরটা দেখে আসি!
বলে পুণ্যির হাতটা চেপে ধরে প্রায় টেনেই বার করে নিয়ে যায় তাকে সত্য খিড়কির দোর দিয়ে।
.
ওদের এই খেলাঘর’টা বাস্তবিকই একটি মনোরম ঠাঁই। স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে প্রশংসা অর্জন করতে পারে ওরা।
প্রকাণ্ড একটা বুড়ো বটগাছ ঝুরি নামিয়ে নামিয়ে খানিকটা জায়গা এমন একটি ছায়াপূর্ণ আশ্রয়গৃহ নির্মাণ করে রেখেছে যে, দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলেও বোধ করি সেই গৃহবাসীর মাথা ভিজবে না। রোদের তো কথাই নেই, প্রায় প্রবেশ নিষেধ তার।
এইখানেই সত্যদের শৈশবের খেলাঘর। তা শ্বশুরবাড়ি যাবার কদিন আগে অবধিও খেলেছে সে। এখনই পরিত্যক্ত ভূমি। এখনকার ছোটদের অন্য খেলাঘর।
নিকানো-চুকোনো গাছের গোড়াটা এখন ধূলোভর্তি হয়ে থাকলেও সারি সারি ছোট্ট ছোট্ট উনুনগুলো এখনও পুরনো স্মৃতি বহন করে পড়ে আছে ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে।
কী যত্নেই এই উনুনগুলি পেতেছিল ওরা!…
কিছুক্ষণ গোড়ায় বসেই থাকল সত্য চুপ করে। ঠিক সেই মুহূর্তে যেন কথা কইবার শক্তি নেই। অগত্যা পুণ্যিও চুপ।
অনেকক্ষণ কাটার পরে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সত্য বলে, আশ্চয্যি দেখেছিস পুণ্যি, সবাই বদলে গেছে, সবই বদলে গেছে, অথচ এই তুচ্ছ জিনিসগুলো অবিকল আছে!
পুণ্যিও নিঃশ্বাস ফেলে, সত্যি, যা বলেছিস!
সত্য আস্তে আস্তে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে, এই উনুনটা পুঁটির, এটা খেদির, এটা টেপির, এটা গিরিবালার, এটা সুশীলার, এটা তোর– তাই না?
নিজের কথাটা আর বলে না।
পুণ্যি বলে সে কথা, এইটে তোর ছিল, দেখ ভাঙা হাঁড়িকুঁড়িগুলোও রয়েছে পাঁশকুড়ে!
হ্যাঁ, খেলাঘরের পাঁশকুড়ও একটা ছিল বৈকি। সবই তো থাকা প্রয়োজন। পাঁশকুড়, পুকুরঘাট, গোয়াল, চেঁকিঘর– অনুষ্ঠানের ত্রুটি হবে কেন? বড়রা যে খেলাঘর নিয়ে মত্ত, ওরা তো তারই নিখুঁত অনুকরণ করবে। ওদের মাটির আর কাঠের পুতুলগুলোও ঘাটে বাসন মেজেছে, ক্ষার কেচেছে, চেঁকিতে পাড় দিয়েছে, বেঁধেছে, কুটনো কুটেছে, বাটনা বেটেছে, ছেলে ঘুম পাড়িয়েছে, কর্তব্যে তিলমাত্র ফাঁকি দিতে পায় নি। তাদের কাজের ছুতোয় মুখর হয়ে উঠেছে এই বুড়ো বটতলা।
বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় সত্য।
বলে, চ পুণ্যি, আর দেখতে ইচ্ছে করছে না, বুকের ভিতরটা কেমন মুচড়ে উঠছে।
তা পুণ্যির মধ্যেও সেই মোচড় পড়ছিল, সেও বলে, চ আর মায়া করা বিড়ম্বনা। যেদিন পরগোত্তর করে দূর করে দিয়েছে, সেদিন থেকেই তো সব ঘুচেছে। মেয়ে জন্মটাই ছাই।
সত্য আর একবার বড়সড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, মেয়ে জন্মটাই ছাই নয় রে পুণ্যি, আমাদের বিধেন দাতারাই ছাই। পরগোত্তর করে দিয়ে জন্মের শোধ পর করে নেড়ু দেবার হুকুম ভগবান দেয় নি। এই যে তুই আমার চিরকালের বন্ধু, তোর বিয়েতে আসা হল না, এ দুঃখু কি মলেও যাবে? যাবে না। তবু তো এলাম না। এসব কি ভগবান বলেছে?
তা নিঃশ্বাস ফেলেছে বলে যে হাসছে না, গল্প করছে না, পাড়া বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে না, সেকথা ভাবলে ভুল হবে, সেটা যথারীতিই চলছে। গল্পের সমুদ্র, কথার পাহাড়। পাড়ার কোন মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি গেছে, কোন্ মেয়েটা বাপেরবাড়ি আছে তার তল্লাস করে বেড়ানো আর গল্পে মুখর হয়ে ওঠা, এটা প্রবল প্রবাহেই চলেছে। নিঃশ্বাসটা নিভতে।
