কিন্তু শুধুই কি রাসুর?
কুঞ্জর কোন ছেলেটার বা কি হয়েছে? পাঠশালায় গিয়ে অনাসৃষ্টি অনাসৃষ্টি খেলা উদ্ভাবন করা ছাড়া মাথা আর খেলতে দেখা যায় না রাসুর কোনো ভাইটারই। রাসু তো তবু ছাত্রবৃত্তি পাস করেছে, টোলেও পড়েছে কিছুদিন, তাছাড়া চেহারাটা সুকান্তি আর বেশ মার্জিত ভাব।
অনেকটা কাকার ধাচের রং-গড়ন তার। তাই সমানে দাঁড়ালে একটা মানুষের মত দেখতে লাগে। আরগুলো তো তাতেও না।
তাছাড়া কবরেজী বিদ্যে মাথায় না ঢুকুক, অনেক ব্যাপারেই রাসু রামকালীর ডান হাত।… এই যে দীনতারিণীর শ্রাদ্ধের অত বড় কাণ্ডটা, রাসু সামনে না থাকলে রীতিমত বেগ পেতে হত না কি রামকালীকে? কারণ স্বপাক হবিষ্যান্ন, ত্রিসন্ধ্যা স্নান, ইত্যাদি করে বহুবিধ নিয়মের পাকে বাঁধা থাকায় নিজে তো ঠিক মুক্তজীব ছিলেন না।
রাসু কাজকর্মের ব্যাপারে যথেষ্ট পারগ।
দানসাগর করলেন রামকালী মাতৃশ্রাদ্ধে, সেই সমারোহে সত্য এল। নবকুমারও এল।
রাসুই আনতে গেল।
ঠাকুরমা মারা যাওয়ার খবরে সত্যর প্রাণটা আকুলিব্যাকুলি করছিল, রাসুকে দেখে যেন স্বর্গের চাঁদ দেখল। এ সময় যে বাবা রাখু কি গিরি তাতিনীকে পাঠান নি, খুব ভাল করেছেন।
সাড়ে তিন বছর পরে এই প্রথম বাপের বাড়ি যাওয়া।
কিন্তু সত্যর দেহের অন্তঃপুরে তখন যে আর এক ‘প্রথম’ সম্ভাবনার সূচনা দেখা দিয়েছে, সে কি সত্য জানত না? না বুঝতে পারে নি?
তা সত্য না পারুক, সদু পেরেছিল বুঝতে। কিন্তু রণচণ্ডী মামীকে এই সূচনা মাত্রতেই জানাতে সাহস করে নি সদু। ভেবেছিল যাক আর গোটাকতক দিন, তেমন প্রবল লক্ষণ ধরা পড়লে আপনি জানবে বুড়ী।
এই সময় দীনতারিণীর বার্তা।
সদু ভয় পেল। এ সময় এই!
ভাবল, মামীকে বলি কি না বলি।
কিন্তু বলা আর হয়ে উঠল না।
বলতে দিল না তার মমতা। এ খবর শুনে যদি এলোকেশী আবার বৌয়ের যাত্রায় বাদ সাধেন!
আহা বেহারা এই এতদিন এসেছে, একনাগাড়ে আছে। আপন বুদ্ধির দোষেই হোক আর যার দোষেই হোক আছে তো! এই ছুতোয় যেতে পারে তো যাক। ভগবান ভালই করবেন।
তবে যাত্রাকালে চুপি চুপি সাবধান করে দেয় সত্যকে, বাপেরবাড়ি যাচ্ছিস, দীর্ঘকাল পরে যাচ্ছিস, কিন্তু সাবধান, বাধা-গরু ছাড়া পাওয়ার মত লাফঝাঁপ করিস নে। আমার বাপু সন্দ হচ্ছে–
সত্য একটু ভাবনার মত তাকিয়ে অস্ফুটে বলে ফেলেছিল, কি?
এই দেখ! পষ্ট করে না বললে হবে না বুঝি? এদিকে তো পাকা গিনী! সন্দ হচ্ছে পেটে বাচ্ছা কাচ্চা কিছু এসেছে, বুঝলি? সাবধানে থাকা দরকার।
ভয় না আহ্লাদ? ভয়, ভয়, সম্পূর্ণ ভয়! তবে এক অদ্ভুত ভয়!
নিজের মধ্যে কী এক অজ্ঞাত রহস্য বাসা বেঁধেছে, একথা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
.
গরুরগাড়ির ভিতরে বসে ঘোমটার মধ্যে থেকে বার বার নবকুমারকে দেখে সত্য আর মানুষটাকে যেন নতুন মনে হয়।
এ খবর ও পেলে?
কী না জানি হবে সেই অবস্থাটা!
গরুরগাড়িতে বেশ ঝাঁকুনি লাগছিল।
একসময় তাই বলেও ফেলে চুপি চুপি, পালকি আনলে না কেন বড়দা?
রাসু অপ্রতিভ মুখে বলে, খুব কষ্ট হচ্ছে, না রে? আমি বলেছিলাম, খুড়োকাকাই বললেন, একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলে রাসু, বললেন, কাজের বাড়িতে চারিদিক থেকে আত্মকুটুম্ব আসবে, সবাইকে তো আর পালকি যোগানো যাবে না! আমি তাও অবিশ্যি বলেছিলাম, সব আর জামাই তো সমান নয়? তাতেও বললেন, জামাইও তো বাড়িতে একটি নয় রাসু, ওকে আর কে বোঝাবে বল?
সত্য অন্যমনস্কে চুপি চুপিটা ভুলে বেশ স্পষ্ট গলাতেই বলে ওঠে, তা এর আর বোঝবার আছে বড়দা, সত্যিই তো! জামাই সবাই সমান! নিজের জামাইটি বলে সারপর করলে চলবে কেন বরং পুণ্যির নতুন বিয়ে হয়েছে– কথা শেষ না করেই নবকুমারের উপস্থিতি স্মরন করে জিভ কেটে চুপ করে।…
কিন্তু সমুদ্রে বালির বাঁধ কতক্ষণ? আবার এক সময় কথা কয়ে ওঠে সে।
কত প্রশ্ন, কত ঔৎসুক্য!
এই সাড়ে তিনটে বছরে কত ঘটনা ঘটেছে, কত জন্ম-মৃত্যুর লীলা-খেলা হয়েছে, কত ছোট্ট মানুষ বড় হয়েছে, কত আইবুড়োর বিয়ে হয়ে গেছে, সেই সব তথ্যগুলো তো কম মূল্যবান নয় জানতে হবে না সে সব?
তুমি কিন্তু একটুও বদলাও নি বড়দা!
সহাস্য মুখে বলে সত্য।
আর নবকুমার বিগলিত বিস্ময়ে সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিস্ময়? তা বিস্ময় বৈকি! সত্যর এই মুখ সে কবে দেখেছে? সত্যর মুখটা যে হেসে উঠলে এমন অপূর্ব লাবণ্যময় দেখায় সে কথাই বা কবে জেনেছে?
তা সত্যর সেই প্রশ্নে রাসুও হেসে উঠে বলে, আমি আবার এই কদিনে বদলাবো কি?
কদিন!
সত্যর যে মনে হচ্ছে কত যুগ-যুগান্তর পার হয়ে গেছে। সেকথাই বলে সে বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে, কদিন? বল কি বড়দা, সাড়ে তিনটে বছর– কদিন হল?
সাড়ে তিন বছর! রাসু আবার হেসে ওঠে, বলে, সাড়ে তিন বছর হয়ে গেল এর মধ্যেই তা ওই শুনতেই সাড়ে তিনটে বছর, কোথা দিয়ে কেটে গেছে!
সত্য নিঃশ্বাস ফেলে বলে, তা তোমাদের আর না কাটবে কেন? স্বাধীন সুখী মানুষ। আমাদেরই মনে হচ্ছে যেন আর একটা জন্ম পেরিয়ে এলাম!
.
তা বাপের ভিটেয় পা দিয়েও ঠিক সেই কথাই মনে হয় সত্যর। যেন আর একটা জন্ম পার হয়ে এল।
কিন্তু কোথায় এল?
ঠিক যে জায়গাটা থেকে চলে গিয়েছিলে, সেই জায়গাটায় কি? সেটা কি এখনো তেমনি পড়ে আছে? ফাঁকা, খালি?
